Mountain View

সোনারগাঁওয়ে ঘরে ঘরে চলছে জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ

প্রকাশিতঃ জুন ২১, ২০১৬ at ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ

কাপড়ে সুতা তোলা, রঙ করা, শাড়ি বুনন ও নকশার কাজে সময় কাটাচ্ছেন সোনারগাঁওয়ের জামদানি শাড়ির কারিগরেরা। কেউ সুতা কাটছেন অথবা ব্যস্ত হাতে তাঁত টানছেন, কেউবা সহযোগিতা করছেন অন্যজনকে। সবাই ব্যস্ত। আসছে পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় জামদানি কারিগর ও শিল্পীরা শাড়ি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বেশি আয়ের আশায় জামদানি শিল্পীরা নানা রকম ডিজাইনের জামদানি শাড়ি তৈরি করছেন।

জানা গেছে, সোনারগাঁও উপজেলার চারটি ইউনিয়নে চার সহস্রাধিক জামদানি তাঁত রয়েছে। এর মধ্যে মুছারচর, শেকেরহাট, বাসাবো, তিলাব, বস্তল, উত্তর কাজিপাড়া, চেঙ্গাইন, খালপাড় চেঙ্গাইন, কলতাপাড়া, কাহেনা, মালিপাড়া, সাদিপুর, বাহ্মণবাওগাঁ, খেজুরতলা, কাজিপাড়া, চৌরাপাড়া, গণকবাড়ি, ওটমা, রাউৎগাঁও, নয়াপুর, ভারগাঁও, কান্দাপাড়া, ফিরিপাড়া, বাইশটেকি, আদমপুর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লী এলাকাগুলো উল্লেখযোগ্য। ঈদকে সামনে রেখে এসব গ্রামের তাঁতি পরিবারের সবাই জামদানি তৈরিতে ব্যস্ত। এখানকার জামদানি তাঁতিদের অধিকাংশই শিশু ও মধ্য বয়স্ক। তবে কম বয়সী ও নারী তাঁতিরাই জামদানি শিল্পের সাথে জড়িত বেশি। তাদের হাতের নিখুঁত শৈল্পিকতায় তৈরি হয় জামদানি।

বিশ্বে বাংলাদেশ জামদানি শিল্পের একমাত্র দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে জামদানি শিল্পের সোনালী দিন এখন আর নেই। সম্ভাবনা যতটুকু আছে তাও যেন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। দিনদিন এ শিল্পে ধস নামতে শুরু করেছে। জামদানি উৎপাদন কারী শিল্পীরা হতাশাগ্রস্ত। তারা দাম পাচ্ছেন না। অধিকাংশ তাঁতিই মহাজনদের কাছে দেনার দায়ে বাঁধা।মহাজনদের দাদন গুনছেন, পাচ্ছেন শুধু মজুরি। সরাসরি তারা শাড়ির বাজারে নামাতে পারছেন না। তাঁতিরা মহাজনদের কাছ থেকে সুতা নিয়ে যান, তাদের দেয়া নকশা অনুযায়ী শাড়ি তৈরি করে আনেন। শাড়িপ্রতি মজুরি পান কম। ফলে শিল্পীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন জামদানি তৈরিতে।

জানা যায়, এই জামদানিই বাংলার হারিয়ে যাওয়া মসলিনের বিকল্প প্রতিরূপ। অতীতের মসলিনের মতোই, আজকের জামদানি শাড়ির শিল্প সৌন্দর্যের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কেবল দেশের বাজারেই নয় বিশ্ববাজারেও জামদানির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে সোনারগাঁওয়ে বিভিন্ন এলাকায় জামদানি শিল্পী ও কারিগরদের বাড়িতে গেলে দেখা মেলবে জামদানি তৈরির কাজের কী গতি। তারা এখন সবাই ব্যস্ত। কারিগরদের আয়ও বেড়েছে। এসব শাড়ি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। কেউ সরাসরি কাপড় উৎপাদনে, আবার কেউ কাপড় রফতানির কাজে জড়িত। বলা যায়, সোনারগাঁওয়ে প্রতি পরিবারেই গড়পরতা দুয়েকটা তাঁত রয়েছে। তাঁতিরা সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। ঈদ উপলে বিপুল বিক্রির ল্য নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও শাড়ি বুননের কাজ করছেন।

জামদানি কারখানার মালিকেরা জানান, আগে জামদানি শিল্পীরা শুধু শাড়ি তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। বর্তমানে জামদানি শিল্পে এসেছে নতুনত্ব। শাড়ি তৈরির পাশাপাশি থ্রি পিস, ওড়না, পাঞ্জাবি, পর্দার কাপড়ও তৈরি হচ্ছে এখানে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানি শাড়ির চাহিদা বেড়ে গেছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এবার আরো নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করছেন কারিগররা।

জামদানি কারিগর লোকমান, জয়নাল, শরফুদ্দিন জানান, একটি শাড়ি তৈরিতে এক সপ্তাহ থেকে দুই-তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সময় আর কাজের ওপর নির্ভর করে শাড়ির দাম। এ বস্ত্রের জমিন একাধিক রঙের হয়। জামদানি তাঁতিদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিা নেই। তাদের রয়েছে বংশানুক্রমিক হাতে-কলমে অর্জিত জ্ঞান। এ শাড়ি যে কেউ তৈরি করতে পারেন না। ভারতসহ পাশের দু-একটি দেশ বহুবার চেষ্টার পরও এ শিল্প রপ্ত করতে পারেননি। দিন দিন জামদানি শিল্পীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শাড়িগুলো তৈরি করছেন তারা শরীরে কখনো জড়াতে পারেন না জামদানি শাড়ি। আমরা স্বপ্ন দেখি এ শিল্প একদিন সমৃদ্ধ হবে।

জামপুরের মালিপাড়া এলাকার জামদানি কারিগর নাহিদ, সুলতান, মোতাহার, শান্ত মিয়া বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁতিরা জামদানি উৎপাদন বন্ধ করে দেননি। তারা বিভিন্ন ডিজাইনের জামদানির ইঞ্চি পাইড়, করলা পাইড়, চালতা পাইড়, ইন্দুরা পাইড়, কচু পাইড়, বেলপাতা, কলকা, দুবলাডংয়ে নানা ধরনের ডিজাইনের জামদানি তৈরি করছেন। এসব ডিজাইন বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। তারা বলেনÑ এখানে ১২০০-১৫০০ টাকার নিচে কোনো জামদানি শাড়ি তৈরি হয় না। সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা দামের শাড়িও এখানে তৈরি হয়। তবে এখন এই দামে অর্ডার পাওয়া যায় না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জামদানি শিল্প দেশের রফতানি খাতে বিশেষ অবদান রাখতে পারত।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কারুপল্লীতে জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ করছেন আবু তাহের, ওসমান মিয়া ও ইব্রাহিম। তারা বলেন, এখন জামদানি কারিগররা আর ভালো নেই। নানা সমস্যা জামদানি কারিগরদের। জানা গেছে বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রফতানি হচ্ছে। এ রফতানির সাথে জড়িত জামদানি শাড়ির ব্যবসায়ীরা। তারা তাঁতিদের কাছ থেকে শাড়ি কিনে এনে রফতানি করেন। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা তাঁতিদের ঘরে ওঠে না। চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের হাতে। প্রতি বছর এ দেশ থেকে প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি রফতানি হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোর ও ইউরোপে প্রতি বছর জামদানি মেলা বসে। নানা অনিয়মের কারণে বর্তমানে জামদানির রফতানি প্রায় বন্ধ। ফলে ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এ শিল্পটি। সুতা, জরি, রঙের দাম তদুপরি সাগরেদদের বেতন-খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাদ দিলে লাভের মুখ দেখা যায় না।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View