Mountain View

ব্যবসায়ীদের মুখে চওড়া হাসি

প্রকাশিতঃ জুলাই ৫, ২০১৬ at ৬:৪০ অপরাহ্ণ

sehar

ঈদ মানেই নতুন জামা আর জুতা। তবে সময়ের ব্যবধানে নতুন জামা-জুতার সঙ্গে ঈদের কেনাকাটায় সোনার অলংকার, স্মার্টফোন, টিভি, রেফ্রিজারেটরসহ নানান পণ্য যুক্ত হয়েছে। উচ্চ-মধ্যবিত্তের কেউ কেউ গাড়ি কেনেন। ঈদের ছুটি কাটাতে অনেকেই দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও দেশের বাইরে যাচ্ছেন।

দেশের সাধারণ মানুষের আয় বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ের সামর্থ্যও। ফলে কয়েক বছর ধরে ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটু একটু করে বাড়ছে। এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। সব মিলিয়ে এবার ঈদের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হয়েছে। সে জন্য অধিকাংশ ব্যবসায়ীর মুখে চওড়া হাসি। তবে গত শুক্রবার গুলশানের জঙ্গি হামলার কারণে ঈদের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় কিছু ভাটা পড়েছে বলে সেখানকার ব্যবসায়ীদের অভিমত।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের আয়বৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের ব্যয়ের ক্ষমতা, প্রবাসী আয়প্রবাহ ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং শহুরে সংস্কৃতি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

ঈদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বড় হলেও তার বিরাট অংশজুড়ে এখনো পোশাক। দেশে সাড়ে চার হাজারের মতো ফ্যাশন হাউস রয়েছে। এর ৬০ শতাংশই গড়ে উঠেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। রাজধানীর মানুষের একটি বড় অংশই দেশি ফ্যাশন বা বুটিক হাউস থেকে পোশাক কেনে। ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) তথ্য অনুযায়ী, বছরে আনুমানিক ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয় ফ্যাশন হাউসগুলোতে। সারা বছর তাদের যে ব্যবসা হয়, তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে।

ফ্যাশন উদ্যোগের সভাপতি আজহারুল হক বলেন, ‘পোশাকের ব্যবসা গত দুই-তিন বছরের চেয়ে এবার ভালো হয়েছে। আমাদের ধারণা, বেচাবিক্রি গত বছরের চেয়ে ১৫-২০ শতাংশ বেশি হবে।’ তবে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। তিনি বলেন, ব্র্যান্ডের চেয়ে নন-ব্র্যান্ডের পোশাকের বিক্রি বেশি হয়েছে। প্রায় একই তথ্য দিলেন রং বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস। তিনি বলেন, ২০১২ সালের পর এবারই ভালো ব্যবসা হয়েছে। যানজটসহ বিভিন্ন কারণে অনেক মানুষই এখন এলাকাভিত্তিক বিপণিবিতান থেকে ঈদের কেনাকাটা করেন। সে জন্য ফ্যাশন হাউসগুলো বিভিন্ন জায়গায় বিক্রয়কেন্দ্র খুলেছে। সে হিসেবে বিক্রয়কেন্দ্র বেড়েছে।

পাইকারি থান কাপড় ও পোশাকের বড় বাজার পুরান ঢাকার ইসলামপুর ও নরসিংদীর বাবুরহাট। দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা সেখান থেকেই কাপড় ও পোশাক কিনে নিজেদের দোকানে বিক্রি করেন। সে জন্য পবিত্র রমজান শুরুর বেশ আগেই ইসলামপুর ও বাবুরহাটের ঈদের বেচাকেনা জমে ওঠে। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার ঢালী গতকাল রোববার বলেন, এবার ব্যবসা ভালো হয়েছে। হিসাব করলে গতবারের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি হবে। তবে এখানকার কাপড়ের ব্যবসার একটা বড় অংশ বাবুরহাটে স্থানান্তর হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ঈদের মূল বেচাবিক্রি শেষ। এখন শাড়ি-লুঙ্গি বিক্রি হবে।

সমিতির সভাপতি জানান, ইসলামপুরে ছোট দোকানের সংখ্যাই বেশি। ঈদের আগে এসব দোকানে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেচাবিক্রি হয়। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য চার হাজার। সমিতির বাইরেও হাজার পাঁচেক দোকান আছে। তার মানে, নয় হাজার দোকান আছে এখানে। আর সমিতির সভাপতির হিসাব আমলে নিলে ঈদের আগে ইসলামপুরে কমপক্ষে ৪৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে।

বাবুরহাটে সাধারণত শুক্র ও শনিবার হাট বসে। তবে ঈদের আগে বৃহস্পতিবার থেকে হাট শুরু হয়। এখানে বড় দেড় হাজার ও ছোট প্রায় সাত হাজার দোকান আছে। প্রতিটি হাটে হাজার কোটি টাকার মতো বিক্রি হয়। এমনটাই জানালেন বাবুরহাট বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, খুব ভালো ব্যবসা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বললে গতবারের চেয়ে এবার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে।

ঈদে পোশাকের পর সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে পাদুকার। পছন্দসই স্যান্ডেল, জুতা, কেডস ছাড়া যেন ঈদই হয় না। বিষয়টি মাথায় রেখেই নিত্যনতুন নকশা নিয়ে আসে পাদুকা প্রস্তুতকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ঈদ সামনে রেখে নতুন বিক্রয়কেন্দ্র চালু করে প্রতিষ্ঠানগুলো। অ্যাপেক্স, বাটা, বে, ফরচুনার মতো ব্র্যান্ডের পাদুকায় শহর এলাকার মানুষের আগ্রহ বেশি। তবে স্বল্প আয়ের মানুষের চাহিদা মেটায় নন-ব্র্যান্ডের পাদুকা।

পাদুকা ব্যবসায়ীরা জানান, বছরে দেশে আনুমানিক ২০ কোটি জোড়া পাদুকা বিক্রি হয়, যার আনুমানিক মূল্য চার হাজার কোটি টাকা। তবে সারা বছরের চাহিদার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় এই ঈদুল ফিতরে। সংখ্যায় কম হলেও ঈদের সময় উচ্চ-মধ্যবিত্তরা গাড়ি কেনেন। বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি আবদুল হামিদ শরীফ বলেন, ঈদের মাস খানেক আগে বাজেট ঘোষিত হয়েছে। সে জন্য যাঁরা ঈদে গাড়ি কিনতে চেয়েছিলেন, তাঁরা আগেই কিনে ফেলেছেন। তিনি জানান, অন্য সময়ের চেয়ে ঈদে গাড়ি বিক্রি ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

কয়েক বছর ধরে ঈদসহ অন্য ছুটির সময় মানুষ দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যান। লম্বা ছুটি হলে এই প্রবণতা আরও বাড়ে। এবার ঈদে সরকারি ছুটি নয় দিনের। এ সময়ে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বেড়াতে যাচ্ছেন অনেকে।
জানতে চাইলে টুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সহসভাপতি মো. রাফিউজ্জামান বলেন, পর্যটনের মৌসুম এখন না হলেও ঈদের ছুটিতে প্রচুর মানুষ কক্সবাজারসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাবেন। ইতিমধ্যেই ১২ জুলাই পর্যন্ত সব মোটেল বুকিং হয়ে গেছে। তা ছাড়া এবার ঈদে লম্বা ছুটি হওয়ায় দুই-তিন লাখ মানুষ দেশের বাইরে যাবেন। অবশ্য তাঁদের একটি বড় অংশ সড়কপথে ভারতে যাবেন।

ঈদ আপ্যায়নের অন্যতম অনুষঙ্গ সেমাই। ঈদুল ফিতরে দেশে সব মিলিয়ে আনুমানিক ৭০ লাখ কেজি সেমাইয়ের চাহিদা থাকে। কয়েকজন সেমাই ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীতে এখনো শতাধিক কারখানায় সেমাই তৈরি হয়। কিছু কারখানা নানা কারণে বন্ধ হলেও ভালো মানের নতুন কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে বড় বড় প্রতিষ্ঠান সেমাই তৈরিতে এগিয়ে এসেছে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আধুনিক লেনদেন ব্যবস্থা মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এ জন্য সহজে ব্যয় করার প্রবণতা বেড়েছে। এসব বিষয় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View