Mountain View

আশ্রম থেকে ইউরো জয়ের নায়ক

প্রকাশিতঃ জুলাই ১৩, ২০১৬ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ

ডিফেন্ডার পেপে নাকি ফরোয়ার্ড এডার? কারও
চেয়ে কারও অবদান মন নয়। গোলরক্ষক প্যাটট্রিসিও যেমন অবিশ্বাস্য কিছু আক্রমণ রুখে দিয়েছেন তেমন ডিফেন্ডার পেপে প্রতিপক্ষের আক্রমণ একের পর এক নস্যাৎ করে গেছেন। আর ফরোয়ার্ড এডার একটি গোল দিয়ে কাজের কাজটি করেছেন। ম্যাচ শেষে গোলের নায়ক তিনি-ই।দুইদিন আগেও এই এডার ছিলেন অপরাচিত। ফুটবলবিশ্বে তাকে চেনা মতো মানুষ খুব কমই ছিল। কিন্তু এখন সবার মুখেমুখে তার নাম। এক ম্যাচের ৪৩ মিনিটে গড়ে ফেলেছেন ইতিহাস।অথচ জীবনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এডারের জীবনটা নাটকীয়তায় ঠাসা। ছোটবেলা কাটে কঠিন আর্থিক দুর্দশায়। গবীর এক পরিবারে জন্ম তার।ছেলের মুখে তিনবেলা ভালমতো খাবার তুলে দেয়ার সামর্থও ছিল না তার বাবা-মায়ের। বাধ্য হয়ে তারা তাকে রেখে আসেন এক আশ্রমে। সেই আশ্রমে বেড়ে ওঠেন এডার। সেই আশ্রমথেকেই এখন ইউরো জয়ের নায়ক।পুরো নাম এডারজিতো অ্যান্তনিও মার্সেডোলোপেজ। জন্ম ১৯৮৭ সালে আফ্রিকার
দ্বীপরাষ্ট্র গিনি-বিসাওতে। সেখানে তার বাবা-
মায়ের সংসারে অভাব অনটন। সুদিনের আশায় তারা দুই বছর বয়সী এডারকে নিয়ে পর্তুগালে পাড়ি জমান।গিনি-বিসাও এক সময় পর্তুগালের কলোনি ছিল।পর্তুগালে গিয়েও তাদের ভাগ্য বদলায়নি। আর্থিক অনটনের কারণে সন্তানকে ভালমতো খাবারও দিতে পারতেন না তার বাবা। এতে কুইমব্রার সানফ্লাওয়ার আশ্রমে ৮ বচল বয়সী এডারকে রেখে আসেন তারা। সেখানেই বেড়ে ওঠেন এডার। ওই সময় ফুটবলের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল তার। রাস্তা-ঘাটে,বাড়ির উঠানে, অলিতে-গলিতে খেলতেন ফুটবল।ফুটবলের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ও প্রতিভা দেখে স্থানীয় একটি ফুটবল একাডেমি তাকে নিয়মিত ফুটবল খেলার সুযোগ করে দেয়।আশ্রম থেকে এবার গিয়ে ওঠেন একাডেমিতে।
ফুটবলে পথচলা শুরু সেই তখন থেকে। ২০০৬
সালে তার ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু হয় পর্তুগালের তৃতীয় শ্রেণির ক্লাব অলিভেইরা হসপিটালে। ২০১২ সালে স্পোর্টিং ব্রাগায় যোগ দিয়ে নজরে আসেন।২০১৫-১৬ মৌসুমে যোগ দেন ইংলিশ ক্লাব সোয়ানসি সিটিতে। সেখানে ১৫ ম্যাচ খেলেও কোনো গোল করতে পারেননি। এরই মধ্যে পড়েন মারাত্মক ইনজুরিতে। তাকে ভাড়ায় (লোন) বিক্রি করে দেয়া হয় ফরাসি ক্লাব লিলের কাছে। এখনও সেই ক্লাবটিতে তিনি আছেন।
পর্তুগালের হয়ে তিনি খেলছেন ২০১২ সাল
থেকে। এবারের ইউরোতে তার জায়গা হয়
একেবারে শেষ দিকে। ফাইনালে তার খেলার কথাই ছিল না। ক্রিস্টিয়ানো রোনলদো ইনজুরিতে না পাড়লে তাকে হয়তো বেঞ্চেই কাটাতে হতো।ফাইনালের আগে ইউরোর এবারের আসরে মাত্র ১৩ মিনিট খেলেন। গ্রুপপর্বে আইসল্যান্ড ও। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সামান্য সময়ের জন্য বদলি হিসেবে তাকে মাঠে নামানো হয়। আর ফ্রান্সের বিপক্ষের ফাইনালে তাকে রেনাতো সানচেজের বদলি হিসেবে মাঠে নামানো হয় ৭৮ মিনিটে। বলদি হিসেবে নেমেই বাজিমাত করেন এডার। ফাইনালে এডারের নৈপুণ্য নিয়ে পর্তুগালের কোচ ফারনানদো সান্তোসের মূল্যায়ন, ‘মাঠে নামলো কুৎসিত হাসের বাচ্চা। আর গোল করে ফিরলো সুন্দর রাজহাস হয়ে’। ম্যাচ শেষে এডার প্রশংসায় ভাসান অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে।ম্যাচের আগেই নাকি রোনালদো তাকে বলেছিলেন যে, তিনি ফাইনালে গোল করবেন।তবে ফাইনালের গোলটি তিনি রোনালদো নয়, উৎসর্গ করলেন একজন নারীকে। তিনি সুসানা তুহিস।এডারের মেন্টর। বলেন, ‘লিগামেন্ট ছিড়ে যাওয়ায় আমার খেলা ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছিল।সেখান থেকে আমাকে নতুন জীবন দেন মনোবিদ সুসানা। তাকেই এই গোলটি উৎসর্গ করছি।’পর্তুগালের ক্লাব স্পোর্টিং ব্রাগায় থাকা অবস্থায় লিগামেন্ট ছিড়ে যায় এডারের। পাঁচ মাস পর মাঠে ফিররেও আত্মবিশ্বাস ছিল একেবারে তলানিতে।সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে এডার বলেন,‘অনুশীলনে শট মারার আগে ভয় পেতাম। শটটা গোলের দিকে যাবো তো! এমন মানসিক অবস্থার মধ্যে এক বন্ধুর মাধ্যমে সুসানার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমার মানসিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেন। তার কল্যাণেই আমি ফুটবলে ফিরতে পেরেছি।’

এ সম্পর্কিত আরও