Mountain View

যে সকল কারণে ব্যর্থ তুরস্কের সেনা অভ্যুত্থান

প্রকাশিতঃ জুলাই ১৭, ২০১৬ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ

Turkey

তুরস্কের সেনাদের একটি বিদ্রোহী দল শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য দেশটির প্রধান দুই শহর আঙ্কারা এবং ইস্তাম্বুলের প্রধান কয়েকটি স্থান দখল করে রেখেছিল। বিদ্রোহীরা যখন তুরস্কের বিভিন্ন ভবন এবং গণমাধ্যমগুলো দখলে নিচ্ছিল তখন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ঠিক কোথায় ছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না।

তবে অভ্যুত্থান সফল করা বিদ্রোহীদের জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। তাদের একদিকে প্রয়োজন ছিল জনগণের সমর্থন। অপরদিকে দরকার ছিল সেনাবাহিনীর বৃহত্তর অংশের সহযোগিতা।

অভ্যুত্থান চেষ্টার শুরুতেই দেখা গেল তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম তা প্রতিরোধের চেষ্টা শুরু করেছেন। কিন্তু তুরস্কের বেশিরভাগ মানুষ জানে, প্রকৃত ক্ষমতা আসলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের হাতে। ক্ষমতার প্রয়োগ বা অন্যকিছু করতে হলে তাকেই করতে হবে।

অভ্যুত্থান সফল করতে হলে ষড়যন্ত্রকারীদের দরকার ছিল এরদোয়ানকে দৃশ্যপটের বাইরে নিয়ে যাওয়া। তবে তা করা সম্ভব হয়নি। বরং পরে এরদোয়ান নিজেই বলেছেন, ‘আমিই প্রধান নেতা।’

কয়েক ঘণ্টা ধরে এটা অস্পষ্ট ছিল যে এরদোয়ান কোথায় আছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় মার্মারিস অবকাশ কেন্দ্রেস ছুটি কাটাচ্ছেন। তবে যে হোটেলে ছিলেন সেখানে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে এরদোয়ান সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ফলে সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

প্রেসিডেন্ট যখন ইস্তাম্বুলের কামাল আতাতুর্ক বিমানবন্দরে এসে নামেন এবং সংবাদ সম্মেলন করেন তখন পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। এরদোয়ান ইস্তাম্বুলের মাটি স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যাচ্ছিল, নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে গেছে এবং তার পেছনে জ্যৈষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের সমর্থনও রয়েছে। সেখানে তিনি কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এটা ‘বিশ্বাসঘাতক এবং বিদ্রোহীদের’ কাজ। তুরস্কের নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই।

আংকারার নিয়ন্ত্রণ অবশ্য তখনো বিদ্রোহীদের হাতেই। কিন্তু ইস্তাম্বুল তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। আর এ কারণেই ইস্তাম্বুলকে সংবাদ সম্মেলনের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেঁছে নেন তিনি।

এদিকে এরদোয়ানের ডাকে সাড়া দিয়ে হাজারো মানুষ তখন ইস্তাম্বুল আর আঙ্কারার রাস্তায় নেমে এসেছে। বিমানবন্দরে যেসব সেনা অবস্থান নিয়েছিল তাদের ঘেরাও করে পুরো বিমানবন্দর দখল করে নেয় জনতা।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টিআরটি থেকে বিদ্রোহীরা বেশ কিছু ঘোষণা প্রচার করে। তারা জানায়, ‘পিস কাউন্সিল’ ক্ষমতা দখল করেছে এবং কারফিউ জারি করা হয়েছে।

তুরস্কের সেনাবাহিনী আঙ্কারা এবং ইস্তাম্বুলের বেশকিছু রাস্তা এবং বসফরাস প্রণালি দখলে নিলেও তাদের এই অভ্যুত্থান চেষ্টার সঙ্গে ছিলেন না সেনাপ্রধান জেনারেল গুল হুলুসি আকার। তুরস্কের সবচে বড় নগরী ইস্তাম্বুলের সেনা ডিভিশন ও তার অধিনায়কও এই অভ্যুত্থান সমর্থন করেননি। নৌবাহিনী প্রধান এবং বিশেষ বাহিনীর প্রধানও অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করেন। এছাড়া এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান থেকে অভ্যুত্থানকারীদের অবস্থানে বিমান হামলাও চালানো হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজ’র ফাদি হাকুরা বলেন, ‘মূলত শুরু হওয়ার আগেই এই অভ্যুত্থান চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এটা ছিল খুবই অপেশাদার ধরনের চেষ্টা এবং এতে বৃহত্তর কোনো সামরিক সমর্থনও ছিল না।’

বিদ্রোহীদের পেছনে না ছিল রাজনৈতিক সমর্থন, না ছিল জনগণের সমর্থন। তুরস্কের জাতীয়তাবাদী ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদল সিএইচপি সরকারকে সমর্থন জানায়। তারা বলে, তুরস্কে বিভিন্ন সময়ে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে। তুরস্ক বারবার এ সঙ্কট দেখতে চায় না।

সেনাবাহিনীর একটি ছোট অংশ এই অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করে। ইস্তাম্বুলই মূলত তাদের ঘাঁটি। ফাদি হাকুরা বলেন, এরা সেনাবাহিনীর বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে না।

তাদের ব্যর্থতা এটাও প্রমাণ করে যে তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থানের পক্ষে আর সমাজের বেশিরভাগ অংশের কোন সমর্থন নেই। এরদোয়ানও অবশ্য এর আগে বহুবার সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে এরদোয়ান তার সাবেক মিত্র ফেতুল্লাহ গুলেনকে অভিযুক্ত করেছেন। ফেতুল্লাহ গুলেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অভিযোগ অবশ্য বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে ফেতুল্লাহ গুলেনের দল গুলেন মুভমেন্ট। অভ্যুত্থান চেষ্টাকে তারা ‘অদ্ভূত’ বলে অভিহিত করেছেন।

তবে এরই মধ্যে গুলেন সমর্থক বলে পরিচিত এমন পাঁচ জেনারেল এবং ২৯ কর্নেলকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করেছে তুরস্ক সরকার।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View