ঢাকা : ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, রবিবার, ১০:২২ অপরাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

তুরস্কের যত সামরিক অভ্যুত্থান

Turkey

তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের ইতিহাস দীর্ঘ। যদিও শুক্রবার রাতে সেনাবাহিনীর একাংশের এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা নসাৎ হয়ে গেছে। এটি ছিল পঞ্চম দফা সেনা অভ্যুত্থান। সামরিক নেতাদের এভাবে ক্ষমতা দখলের তৎপরতা শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। দেশের ইতিহাসে প্রথম ওই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেলাল বায়ার ও প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেস।

১৯৬০ সালের অভ্যুত্থান

তুরস্কে প্রথম সামরিক অভ্যুত্থান হয় ১৯৬০ সালে। তখন দেশটির কিছু নতুন সংস্কারের ঘটনায় চাপের মুখে ছিলেন প্রেসিডেন্ট সেলাল বায়ার ও প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেস। তুরস্কের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ১৯২০ ও ৩০য়ের দশকে কামাল আতাতুর্কের চালু করা কিছু আইন (যেমন ইসলামি আইন বাতিল, নারীদের জন্য হেজাব পরা নিষিদ্ধ করা) বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর মধ্যে ছিল হাজারেরও উপর মসজিদ খুলে দেওয়া, তুর্কি ভাষার বদলে আরবিতে আজান ও নতুন নতুন মাদ্রাসা চালুর অনুমতি। ওই সরকার তরুণদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরির সময়ও কমিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

এগুলোর পাশাপাশি সরকারের দমন-পীড়নমূলক আইন ও সমালোচনাধর্মী পত্রিকা বন্ধের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন শুরু করে বিরোধীরা। এ অবস্থায় সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতার চাপান উতোরের মধ্যে ১৯৬০ সালের ২৭ মে দেশটিতে প্রথমবারের মত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটনায় কিছু তরুণ সেনা কর্মকর্তা। অভ্যুত্থানের পর গ্রেপ্তার করা হয় প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও কয়েকজন শীর্ষ মন্ত্রীকে। ১৯৬০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পরে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন সামরিক প্রধান সেমাল কুরসেল। প্রথম এ অভ্যুত্থানের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৯৬৫ পর্যন্ত।

১৯৭১ সালের সেনা অভ্যুত্থান
অর্থনৈতিক মন্দার জের ধরে দেশটিতে দ্বিতীয়বারের মত অভ্যুত্থান হয় ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ মাসে। দেশটিতে তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছিল। ওই সময় শ্রমিক সংগঠনগুলো বেশ কয়েকটি বড় বড় প্রতিবাদ কর্মসূচি দিতে থাকে যার অনেকগুলোই সহিংস আকার ধারণ করত। পাশাপাশি ডানপন্থি দলগুলোও নানা ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। কমছিল মুদ্রার মান এবং বছরে ৮০ শতাংশ হারে বাড়ছিল মুদ্রাস্ফীতি।

এ অবস্থায় দেশে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তৎপর হন সেনাপ্রধান চিফ অব স্টাফ। তিনি ১৯৭১ এর মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুলিমান ডেমিরেলকে দেশ পরিচালনায় কামাল আতাতুর্কের দর্শন মেনে নতুন একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সরকার গড়ার জন্য ‘স্মারকলিপি’ দেন। এ অবস্থায় পদত্যাগ করেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী ডেমিরেল।

রক্তপাতহীন ওই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয় সামরিক বাহিনী। তারা প্রথমে ডানপন্থি রিপাবলিকান পিপলস পার্টির নেতা নিহাত এরিমকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান নিযুক্ত করে। দুই বছর পর দেশটির সংসদ অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ফাহরি কোরুতার্ক-কে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।

ক্ষমতাচ্যুত ডেমিরেল এ অবস্থার মধ্যেও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। যার ফলে দুই দশক পর ফের তিনি তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী হন। ডেমিরেল ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তৃতীয় সামরিক অভ্যুত্থান

১৯৭১ সালে দেশের অস্থির পরিস্থিতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলেও পরবর্তী সরকার দেশে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খুব কমই সফল হয়েছিল। দ্বিতীয় দফা অভ্যুত্থানের পর গত আট বছরে ১১ জন প্রধানমন্ত্রী বদল করে তুর্কি পার্লামেন্ট। ক্রমাগত অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে বাম-ডান দলগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষে তুরস্কের রাস্তাগুলো তখন পরিণত হয়েছিল রক্তের সমুদ্রে। ওই দশকেই গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছিলেন হাজারেরও উপর নাগরিক। এ অবস্থায় ফের অভ্যুত্থান ঘটনাতে তৎপর হয়ে ওঠে সেনাবাহিনী। ৮০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা দখল করে নেয় সেনাবাহিনী। ডেমিরেলের স্থলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন নৌবাহিনীপ্রধান এডমিরাল বুলেন্ত উলুসু। ওই অভ্যুত্থানের পর তুরস্কে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসেলেও নির্বিচার ধরপাকড়, ফাঁসি ও নির্যাতনের কারণে দেশ জুড়ে গণ অসন্তোষ বিরাজ করছিল। যার প্রেক্ষিতে ফের নতুন অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে থাকে।

১৯৯৭ সালের অভ্যুত্থান

১৯৯৫ সালে ইসলামপন্থি ওয়েলফেয়ার পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতা আসার পর থেকেই নতুন করে অসন্তোষ দানা বাধতে থাকে। সরকার রাষ্ট্রে ‘মৌলবাদী নীতি’ প্রয়োগের চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ এনে সরকারকে কয়েকটি প্রস্তাব দেয় সেনাবাহিনী। এগুলোর উল্লেখযোগ্য ছিল মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে সবার জন্য বাধ্যতামূলক আট বছরের শিক্ষা কার্যক্রম চালু এবং ইউনিভার্সিটিতে হিজাব নিষিদ্ধ করা।

ইসলামপন্থি সরকার সেনাবাহিনীর দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়। তবে সেনাবাহিনীর ক্রমাগত চাপের মুখে দলটির পক্ষে দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেকমেতিন এরবাকান।

পরের বছর তুরস্কে ওয়েলফেয়ার পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এরবাকানের ওপর। সরাসরি অভ্যুত্থান না করেও সরকার বদলের এ ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ‘উত্তরাধুনিক ক্যু’ হিসেবে অভিহিত করেন।

নিষিদ্ধঘোষিত ওই ওয়েলফেয়ার পার্টির অনেক সদস্য পরে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এ কে) পার্টিতে যোগ দেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানও ওই দলেরই একজন।

তুরস্কের শেষ অভ্যুত্থান

গতকাল ১৫ জুলাই, শুক্রবার ফের সামরিক অভ্যুত্থান দেখল তুরস্ক। প্রধানমন্ত্রী রেসেপ তায়েপ এরদোয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই এই অভ্যুত্থানটি করার একটি চেষ্টা চালিয়েছিল বিমান বাহিনীর সদস্যরা। শুক্রবার রাতে ইস্তাম্বুল সংলগ্ন বোসফরাস সেতুটি দখল করে নেয় কয়েকটি সামরিক ট্যাঙ্ক।

এরপর সেখাসে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। আঙ্কারা শহরের আকাশে উড়তে থাকে সামরিক হেলিকপ্টার। শহরের সড়কগুলোতে টহল দিতে দেখা যায় সেনাদের। এরপরই এক বিবৃতিতে অভ্যুত্থানকারীরা দেশের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শনিবার সকালেই জনসমক্ষে হাজির হয়ে অভ্যুত্থানের দাবি অস্বীকার করেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

এ ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসীদের কাজ’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত ৫০ সেনা আত্মসমর্পণ করেছে। গোটা দেশ থেকে আটক করা হয়েছে আরো ১৫৬৩ সেনাকে। তবে অভ্যুত্থান সংঘর্ষে ২৬৫ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো এক হাজার।

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

casto

ফিদেল কাস্ত্রোকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল

সদ্যপ্রয়াত কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছেন দেশটির হাজারো নাগরিক, সঙ্গে …

Mountain View

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *