Mountain View

নিখোঁজ তালিকার ২৫ জন ফিরে এসেছে, সন্ধান কয়েকজনের

প্রকাশিতঃ জুলাই ২১, ২০১৬ at ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ

নিখোঁজের তালিকায় থাকা ২৬১ জনের মধ্যে কেউ জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত কি-না, তা খতিয়ে দেখছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের ব্যাপারে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিখোঁজদের খুঁজে বের করার চেষ্টাও চলছে। তালিকায় নাম থাকলেই তিনি জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত_ এমন ভেবে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে র‌্যাব। কারণ, সব ধরনের ঘটনায় নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জন ফিরেও এসেছেন। আরও কয়েকজনের সন্ধান মিলেছে।

তবে গোয়েন্দাদের ধারণা, তালিকার একটি বড় অংশ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের কারও কারও নাম এরই মধ্যে সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে গণমাধ্যমে এসেছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিখোঁজ ২৬১ জনের মধ্যে ৭২ জনই ঢাকার বাসিন্দা। নিখোঁজ ১৬৮ জনের তথ্য জানিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন স্বজনরা।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতী মাহমুদ খান বলেন, তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ পেতে ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। তারা কী কারণে বা কীভাবে নিখোঁজ হয়েছেন, বর্তমানে তাদের অবস্থান কোথায়_ তা জানার চেষ্টা চলছে। কেউ ফিরে এলেও খতিয়ে দেখা হবে, তিনি এত দিন কোথায় ছিলেন এবং কী করেছেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, গুলশানের রেস্তোরাঁয় হামলাকারীরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ ছিলেন_ এমন তথ্য প্রকাশের পর বেরিয়ে আসে আরও অনেকের নিখোঁজ থাকার খবর। এ সময় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে নিখোঁজদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। মঙ্গলবার মধ্যরাতে সেই তালিকা প্রকাশ করে র‌্যাব। নিখোঁজদের ব্যাপারে র‌্যাবের পক্ষ থেকে তথ্য সহায়তা চাওয়া হয়। এ তালিকার কেউ কেউ সাধারণ ঘটনায় বাড়ি থেকে চলে যান, পরে ফিরেও এসেছেন। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে নিখোঁজ ছিলেন, এমন ব্যক্তিও রয়েছেন তালিকায়। আবার ওই তালিকায় কণ্ঠশিল্পী তাহমিদ রহমান সাফি, মডেল নায়লা নাইমের সাবেক স্বামী চিকিৎসক আরাফাত হোসেন তুষার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাওসিফ হোসেনের নামও রয়েছে। আইএসের একটি ভিডিওতে তারা জঙ্গি হামলার হুমকি দেন বলে পরিচিতজনরা শনাক্ত করেন।

হঠাৎ করেই তারা নিখোঁজ হন :গুলশানের মানারাত কলেজের বিবিএর ছাত্র সাবি্বর হোসেন শুভ ১ জুলাই (গুলশানে হামলার দিন) সন্ধ্যায় ইফতারের পর উত্তর বাড্ডার হাজীপাড়ার বাসা থেকে বের হন। তার বাবা আসবাবপত্র ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন সমকালকে বলেন, বাইরে থেকে ঘুরে আসার কথা বলে বের হয়ে আর ফেরেনি শুভ। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। বন্ধুরাও এ ব্যাপারে কিছু জানাতে পারেনি। পরে ৪ জুলাই এ ঘটনায় বাড্ডা থানায় জিডি করা হয়। বাবার দাবি, ধার্মিক হলেও উগ্রপন্থায় জড়িত ছিলেন না শুভ। ঢাকা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র মো. ফিরোজের বাবা ডিম ব্যবসায়ী উলফত আলী বলেন, গত বছরের ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের সি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের বাসা থেকে বের হয় ফিরোজ। এর পর তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। সে খুব বেশি ধার্মিকও ছিল না। নিখোঁজের পরদিন এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় জিডি করা হয়।

গুলশান ২ নম্বর সেকশনের বাসিন্দা ও একাদশ শ্রেণির ছাত্র আহমেদ আজওয়াদ ইমতিয়াজ তালুকদার অমি ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ রয়েছে। অমি ফাঁদে পড়েছে বলেই ধারণা করছেন তার আপনজনরা।

রাজধানীর ‘ইনোভেটিভ বিডি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ রাজাও দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে কল করা হলে সহকর্মী পরিচয়ে একজন জানান, এখনও তার সন্ধান মেলেনি।

২০১৫ সালের ১৯ জুলাই বাসা থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন পাইলট মাহমুদুল আহসান রাতুল। রাজধানীর আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির ১০ নম্বর সড়কের বাসায় তার স্বজনরা এখনও প্রতীক্ষায়। রাতুলের বাবা প্রকৌশলী রওশন আলী খান সাংবাদিকদের বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও তার ছেলে উগ্রপন্থি কার্যক্রমে জড়িত বলে কখনও তার মনে হয়নি।

প্রায় দেড় বছর নিখোঁজ রয়েছেন চট্টগ্রামের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারী। তার চাচা সাদিকুল্লাহ আনসারী বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সে মালয়েশিয়া থেকে নিখোঁজ হয়। মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লার দোকান কর্মচারী সাবি্বর ৩ জুলাই নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জিয়াউল হক সমকালকে বলেন, তার খোঁজ চেয়ে দেশের সব থানায় বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে খোঁজ মেলেনি। তিনি জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত কি-না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফেনীর যুবক কাজী মহিবুল ইসলামের ব্যবহৃত সর্বশেষ ফোন নম্বরে কল করা হলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি তার নাম মিলন বলে জানান। মহিবুল নামের কাউকে তিনি চেনেন না বলেও দাবি করেন। মহিবুল ২৪ মার্চ থেকে নিখোঁজ।

তালিকায় থাকা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের সামসুল হক মানসিক প্রতিবন্ধী। পেশায় রাজমিস্ত্রি সামসুল হক গত ২৯ জুন শ্বশুরবাড়ি গোয়ালপাড়া থেকে নিখোঁজ হন এবং এখনও তার সন্ধান মেলেনি বলে জানিয়েছেন জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি।

ওদের খোঁজ মিলেছে :মগবাজারের নয়াটোলার ব্যবসায়ী ছানাউল্লাহ সমকালকে বলেন, গত ৪ জানুয়ারি তিনি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ফেলে যায় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। মধ্যবর্তী সময়ে তার খোঁজ না পেয়ে স্বজনরা জিডি করেন। একই রকম ঘটনা ঘটে দামুড়হুদা উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের ক্ষেত্রে। গত বছরের ১ জানুয়ারি তিনি ঢাকা থেকে ফেরার পথে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে তিন দিন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে তার সন্ধান চেয়ে জিডি করা হয়। এখন তিনি কর্মস্থলে রয়েছেন।

র‌্যাবের তালিকার এক নম্বরে থাকা সাইদুল ইসলামও ঢাকায় তার কর্মস্থলে রয়েছেন। তিনি পল্টনে ব্যাংক এশিয়ায় অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। তালিকার ২১৫ নম্বরে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রহমত উল্লাহ কারাগারে রয়েছেন। রাবি শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যায় তাকে গ্রেফতার করা হয়।

নিখোঁজের তালিকায় থাকা মগবাজারের টিঅ্যান্ডটি কলোনির জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, তার নিখোঁজ থাকার তথ্য সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি তার স্কুলপড়ূয়া মেয়ের খোঁজ না পেয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি জিডি করেছিলেন। পরে মেয়ে ফেরত আসে। ২২ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজমিস্ত্রি বাদশা আলীর অবস্থান জানতে পেরেছেন তার স্বজনরা। তার ভাই ওয়াহাব জানান, ৭ জুলাই ফোন করে বলেছেন, তিনি ভারতে আছেন। পারিবারিক বিরোধের কারণে তিনি ঘর ছাড়েন বলে জানিয়েছেন। তালিকার এস এম তাহসানের মা জাহানারা বেগম জানান, ৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজের এক সপ্তাহ পরই তিনি ছেলের সন্ধান পান। তাহসান পারিবারিক বিরোধের জের ধরে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কলাবাগানের তরুণ মাহমুদুর রহমান কাজল ও আদনান গত মার্চে আলাদাভাবে নিখোঁজের একদিন পর ফিরে আসেন বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।

এদিকে নিখোঁজ কয়েকজনের স্বজনকে মোবাইল ফোনে কল করা হলে তারা সাড়া দেননি এবং কারও কারও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া অনেকের নিখোঁজের আগে ব্যবহৃত ফোন নম্বরে কল করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

রিকশাচালক থেকে পাইলট :২৬১ জনের নিখোঁজ তালিকার মধ্যে অন্তত ১০ পেশার মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে রিকশাচালক বা রাজমিস্ত্রি যেমন আছেন, তেমনি চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও পাইলটও রয়েছেন। এ ছাড়া দোকানি, পোশাককর্মী ও শিক্ষার্থীও রয়েছেন। তাদের সবারই বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তালিকায় বিভিন্ন জেলার মানুষ থাকলেও শুধু ঢাকারই ৭২ জন আছেন। এর বাইরে চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, কুমিল্লা, যশোর ও নোয়াখালীর বাসিন্দা বেশি রয়েছেন।

ছবি নিয়ে বিভ্রাট :তালিকায় থাকা নাহিদ রেজা তুষার নামের এক তরুণের বাবা আবুল কালাম আজাদ গতকাল সমকাল কার্যালয়ে ফোন করে জানান, তার ছেলে নিখোঁজ হননি। এমনকি নিখোঁজের তালিকায় তার ছেলের ছবির সঙ্গে নাম দেওয়া হয়েছে হোসাইন তুষার, যা সঠিক নয়। বাসার ঠিকানা ও বাবার নামও ভুল দেওয়া হয়।

জিলানী নিহত? :তালিকায় থাকা জিলানী ওরফে আবু জান্দাল নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে আইএসের কথিত মুখপত্র ‘দাবিক’। পত্রিকাটির দাবি, আবু জান্দাল আল বাঙালি সিরিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। তার বাবা কর্নেল মশিউর বিডিআর বিদ্রোহের সময় মারা যান বলে জানা গেছে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View