আজ সোহাগপুর গণহত্যা দিবস

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৫, ২০১৬ at ১:১০ অপরাহ্ণ

received_711360582336031

আজ ভয়াল ২৫ জুলাই সোহাগপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর সোহাগপুর গ্রামে পাকিস্তানী হায়েনার দল নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৭৮ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে নির্মম ভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। সকল পুরুষ মানুষকে হত্যা করায় এ গ্রামের নাম হয় ‘বিধবাপাড়া’। সেদিন স্বজন হাড়ানো গগণ বিদারী চিৎকারে সোহাগপুর গ্রামের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।

এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে; নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে সোহাগপুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিয়েছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে রাজাকার আলবদরদের সহায়তায় ১৫০ জনের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সোহাগপুর গ্রামের প্রফুল্লের দিঘি থেকে সাধুর আশ্রম পর্যন্ত এলাকা ঘিরে ফেলে।

হায়েনার দল অর্ধদিন ব্যাপী তান্ডব চালিয়ে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের আশ্রয়দাতাদের। এ সময় প্রাণের মায়া ত্যাগ এগিয়ে যায় আলী হোসেন ও জমির আলী, কিন্তু বেশী দুর এগুতে পারে নি। এক রাজাকার গুলি করে দু’জনকেই হত্যাকরে। এরপর শুরু হয় নারকীয় তান্ডব। মাঠে কর্মরত রমেন রিছিল, চটপাথাং ও সিরিল গাব্রিয়েল নামে তিন গারো আদিবাসীকে হত্যা করে। তার পর একে একে হত্যা করে আনসার আলী,লতিফ মিয়া, ছফর উদ্দিন, শহর আলী, হযরত আলী, রিয়াজ আহমেদ, রহম আলী, সাহেব আলী, বাবর আলী, উমেদ আলী, আছমত আলী, মহেজ উদ্দিন, সিরাজ আলী, পিতা-পুত্র আবুল হোসেন সহ প্রায় ১৭৮ জন নিরীহ পুরুষ মানুষকে।

স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার বৃহত্তম ময়মনসিংহের কুখ্যাত আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করায় সোহাগপুরের বিধবারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাদের করুন হাল দেখে সরকার এই বিধবাপল্লীর বেচেঁ থাকা মোট ৩২ জন বিধবার মাঝে ১৩ জন বিধবাকে বীরঙ্গনার তালিকা প্রস্তুত করেন। এদের মধ্যে ৪জনকে গত ৩০ জুন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও নগদ ৬ মাসের ভাতাবাবদ ৬০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন। স্বীকৃতিপ্রাপ্তরা হলেন, জোবেদা বেগম (৮৬), জোবেদা খাতুন (৭৪), আছিরন নেছা (৭৯) ও হাসেন বানু (৬২)। অন্য বীরঙ্গনারও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চেয়েছেন।

এব্যাপারে শেরপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধার ইউনিট কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, জেলায় প্রথম দফায় সোহাগপুর বিধবাপল্লীর ও কাটাখালী ট্রাজেডীর ৭জন বীরঙ্গনার নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্মাননা ভাতার গেজেট ভুক্ত হয়েছেন। আরো কয়েক জনেরনাম অপেক্ষমান রয়েছে।

সে দিন সকাল ৭টায় গ্রামের মানুষ লাঙ্গল জোয়াল নিয়ে রোপা আমন ধানের ক্ষেত লাগানোর জন্য মাঠে যাচ্ছিল, কেউ কেউ কাজ করছিল বাড়িতেই। সিরাজ আলী বসেছিল ক্ষেতের আইলে হঠাৎ গুলির শব্দে চমকে উঠে, তাকিয়ে দেখে বিলের ভেতর থেকে এগিয়ে আসছে ঘাতক রূপি হানাদার বাহিনী। ভয়ে সবাই দৌড়ে পালিয়ে যেতে চাইলেও হাসান আলী বললেন, তোমরা যার যার কাজ কর দৌড়ালে বরং গুলি করবে। কথা শেষ হতে না হতেই মুহুর্তেই হানাদার বাহিনী কিশোর সিরাজ আলী ছাড়া সবাইকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করে। সে দিন লাশ হলো সবাই,রক্তে লাল হলো আমন ধানের ক্ষেত।আস্তে আস্তে সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চির নিদ্রায় শায়িত হয় সোহাগপুর গ্রামের মাটিতে। এভাবে সোহাগপুর গ্রামের সকল পুরুষ মানুষকে হত্যা করা হয়।

পরবর্তী থেকে এ গ্রামের নাম হয় ‘বিধবা পাড়া’। এখানে কলাপাতা, ছেড়া শাড়ী আর মশারী দিয়ে কাফন পড়িয়ে ৪/৫ টি করে লাশ এক একটি কবরে দাফন করা হয়েছিল। আবার কোন কোন কবরে ৭/৮টি করে লাশও এক সাথে কবর দেওয়া হয়েছিল। এ নারকীয় হত্যাকান্ডের জীবন্ত স্বাক্ষী রয়েছেন অনেকেই। সময়ের পাখায় ভর করে বছর ঘুরে আসে, সামনে নিয়ে আসে পেছনে ফেলে আসা স্মৃতি। আর কতকাল ভাসবেন তারা চোঁখের জলে ? স্বাধীনতার ৪২ বছরের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় স্বামীহারা এসব বিধবারা এখনো স্বজন হাড়ানোর ব্যথা আজও বুকে চেপে ধরে আছেন।

এ সম্পর্কিত আরও