Mountain View

কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৫, ২০১৬ at ৩:৩৮ অপরাহ্ণ

received_1075999705810184

এস. এম. আব্দুল্লা আল মামুন (উজ্জল), বিডিলাইভএকুশ, কুড়িগ্রাম: বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী, উলিপুর, রৌমারী, রাজিবপুর, নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার নদ-নদীর অববাহিকার দুই শতাধিক চর ও দ্বীপচরের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। গত পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দী মানুষেরা চরম দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছেন। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট।

রাস্তা-ঘাট তলিয়ে থাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে প্রায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্যাদুর্গত এলাকার অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে উঁচু বাঁধ ও পাকা সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়ি-ঘর সরিয়ে নিচ্ছে অনেক পরিবার। উলিপুর উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি জীবন-যাপন করছেন। উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নেই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় দুই হাজার পরিবার। এই ইউনিয়নের অনন্তপুর দাগারকুঠি গ্রামে গত একমাসে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বিলীন হয়েছে প্রায় শতাধিক পরিবারের ভিটেমাটি।

গত শুক্রবার ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে এখনও অনেক পরিবার ভাঙনের মুখে পড়ে তাদের বসতি সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙনে একেবারে বিলীন হয়েছে চর গুজিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. তৈয়ব আলী জানান, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বর্তমানে বিদ্যালয়টির কোনও চিহ্ন নেই। ১৬৫ জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরও শিক্ষার্থীদের পাঠদানের বিকল্প কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যালয়হীন হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরিক্ষা বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা এখন হুমকির মুখে।

অন্যদিকে একই ইউনিয়নের অনন্তপুর দাগারকুঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে পানি প্রবেশ করায় পাঁচ দিন থেকে ১৪৭ শিক্ষার্থীর পাঠ দান বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রামদুলাল দেবনাথ। উল্লিখিত প্রাথমিক বিদ্যালয় দু’টির শিক্ষার্থীদের বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে উলিপুর উপজেলা নির্বার্হী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এ এইচ এম জামেরী হাসান এর সঙ্গে কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এদিকে বন্যায় নিমজ্জিত অনন্তপুর দাগারকুঠি গ্রামে দেখা যায়, এই গ্রামের প্রতিটি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রায় সব বাড়িতে ঘরের ভেতর পানি প্রবেশ করেছে। এই গ্রামের মকবুল হোসেন জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে পানিবন্দি জীবন যাপন করলেও এখনও কোনও ত্রাণ সহায়তা পাননি। ঘরের ভিতর হাঁটু পানি প্রবেশ করায় নিজেরা বিছানা উঁচু করে বেধে থাকছেন। বাড়ির গবাদি পশুগুলোকে পাঠিয়েছেন অন্যের বাড়িতে। নিজেদের ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে মকবুল বলেন,‘মা ও স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের ৭ জনকে নিয়ে কোনও রকমে চৌকির উপরা আছি। খাবার জোগার করায় এলা কঠিন হয়া গেইছে। বন্যার জন্যে কোনও কাজও করবার পাই না। রাইতে ঘুমাইতেও ভয় লাগে, যদি কোনও সাপে কামড়ায়!’

চর গুজিমারী গ্রামের ফুলভান (৪০) জানান,পাঁচ ছয় দিন থাকি বাড়িত পানি, বাচ্চাকাচ্চা নিয়া খুব কষ্টে আছি। ছওয়ারা পানত নামতে নামতে জ্বর শুরু হইছে, হামারও শরীর ভাল নাই। বাড়িত খাবারও নাই,ওষুধও নাই, কেমন করি বাঁচি! এই গ্রামের বন্যা কবলিতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দু‘দফা বন্যা হলেও তারা এখনও কোনও ত্রাণ পাননি। উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, আমার ইউনিয়নে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে শতাধিক পরিবার। উপজেলা পরিষদ হতে আমার ইউনিয়নে ১৮৫ ব্যাগ ত্রাণ দেওয়া হলেও শুক্রবার পর্যন্ত আমি কোনও বরাদ্দ পাইনি। ফলে অধিকাংশ পরিবার ত্রাণ বঞ্চিত রয়ে গেছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যার্তদের জন্য জেলার ৯ উপজেলায় ৫ লাখ টাকার শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে যা শুক্রবার থেকে বিতরণ করা হবে। এছাড়াও ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ৯০ মেট্রিক টন চাউল বিতরণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন করে আরও ২শ’ টন চাউল ও ২ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তিস্তার পানি অপরিবর্তিত থাকলেও বেড়েছে দুধকুমারের পানি। বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমারবিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View