Mountain View

প্রাণবন্ত আড্ডায় জেগে থাকে ঢাবি ক্যাম্পাস

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৮, ২০১৬ at ১১:১২ অপরাহ্ণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। নামটি শুনলেই স্মৃতিতে ভেসে উঠে একঝাঁক তরুন-তরুণীর প্রাণবন্ত স্থান। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যবসায় ছাড়াও আড্ডাবাজি আর আনন্দ বিনোদনে জমজমাট থাকে পুরো ক্যাম্পাস। তারুণ্যের এ আড্ডা থেকে বেরিয়ে আসে সৃজনশীল নানা কর্ম। সেই ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই আড্ডা চলে আসছে। আর এই আড্ডাপ্রবণ মানুষগুলোই এক সময় জীবনের প্রয়োজনে হারিয়ে যায়।

এদিকে, সন্ধ্যার একেকটা চত্বরে জমে উঠে জীবনের গল্প। হাকিম চত্বরে কড়ই গাছের নীচে মোহন বাঁশির সুর, গণতন্ত্রের সূতিকাগার মধুর ক্যান্টিন, ডাকসুতে এক টাকায় এক কাপ চা, ত্রিমোহনার কেন্দ্রস্থল ভিসি চত্বর, মুক্তিযোদ্ধার আবক্ষ মূর্তি অপরাজেয় বাংলা, প্রাণবন্ত টিএসসি যেন ক্যাম্পাসের হাজারো স্মৃতির নীরব স্বাক্ষী হয়ে আছে। শিক্ষার্থীদের আনাগোনায় সকাল-সন্ধ্যায় মুখরিত থাকে এ চত্বরগুলো।

রাজনীতির সূতিকাগার মধুর ক্যান্টিন:
বাংলাদেশের রাজনীতির সূতিকাগার বলা হয় মধুর ক্যান্টিনকে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক বড় বড় ঘটনার নীরব সাক্ষী এ ক্যান্টিন।

মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরা থেকে কালক্রমে প্রতিষ্ঠিত মধুর ক্যান্টিন নামটিই যেন একটি ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের পাশে মধু দা’র দায়িত্বে ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠিত হয়। চারদিকে দেয়ালঘেরা এ ভবনটি নবাবদের একটি বিশ্রামাগার হিসাবে ব্যবহার করা হতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ঢাকা মেডিক্যাল থেকে স্থানান্তর করে বর্তমান ভবনে আনা হলে মধু দা এখানে চলে আসেন। মধু দা’র বন্ধুসূলভ আচরণ ও সততার জন্য তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। ক্রমেই ক্যান্টিনটি পরিণত হয় ছাত্ররাজনীতির মূল ঘাঁটিতে।

মধুর ক্যান্টিনে উঠতি লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় ছিল সবসময়। অনেকেই দাম মেটাতেন, কেউ কেউ লিখে রাখতে বলতেন। মধুদার হিসেবের খাতাটি নিয়েও রঙ্গ-রসিকতার কম ছিল না।

খাতাটির শিরোনাম ছিল ‘না দিয়া উধাও’। ওই খাতায় এককালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজ, শামসুর রহমান, আহমদ ফজলুর রহমানসহ অনেক কৃতি ব্যক্তিত্বের নাম ছিলো। ষাটের দশকের অনেকেই ‘না দিয়া উধাও’ খাতায় স্থান করে নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম বলেন, মধুর ক্যান্টিনের গৌরবোজ্জল ইতিহাস আছে। কিন্তু সেটি আর দেখা যাচ্ছে না। এখন ছাত্রলীগের একক আধিপত্যের প্রভাব চলে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা সচরাচর সেখানে যায় না। তারাই সব সময় মধুর ক্যান্টিনে থাকে।

ডাকসুর এক কাপ চা:
ডাকসুতে এক কাপ চায়ের দাম মাত্র ১ টাকা! অবাক হওয়ারই কথা। কারণ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে যেখানে জীবন যাত্রা কোনঠাসা, সেখানে এক কাপ চায়ের দাম মাত্র ১ টাকা কি করে হয়? অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে এক কাপ চায়ের দাম নূন্যতম- ৫ টাকা। আর সেটা হলো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ক্যাফেটেরিয়াতে। প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী দল বেঁধে ডাকসুর এই ক্যাফেটেরিয়াতে চায়ের আড্ডায় মেতে উঠে। প্রতিষ্ঠালগ্নের পর থেকে বহু বছর ধরে এই চা ১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই চা খেয়ে অসংখ্য খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, অধ্যাপক, রাজনীতিবিদসহ সফল ব্যক্তিদের জন্ম দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে আসার এক অদম্য প্লাটফর্ম ছিলো এই ডাকসু।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসাইন বলেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ বাহির থেকে সখ করে এখানে আসেন শুধুমাত্র এই চা খাওয়ার জন্য। শুধু তাই নয়, সাবেক কিংবা বর্তমান অনেক ছাত্র/শিক্ষকরাও মাঝে মাঝে খেতে আসেন এই চা। কারণ এই চায়ের সাথে মিশে আছে হাজারো স্মৃতি, আড্ডা, হাসি, গান, গল্প আর ভালোবাসা।

টিএসসির গল্প:
ঢাকা শহরের যানযট ঠেলে আসা তরুণ-তরুণীদের হল জীবনের একঘেয়ে মুহুর্ত কাটানো শিক্ষার্থীদের আড্ডায় প্রাণবন্ত স্থান টিএসসি। ৩.৭০ একর জায়গা নিয়ে ১৯৬১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৬৮ সালের দিকে এর কার্যক্রম শেষ হয়। এ তিনতলা ভবনের প্রতিটি তলায় বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন বাঁধন, স্কাউট, ডিইউডিএস, আইটি সোসাইটি, ডিইউফিএস, সাংবাদিক সমিতি, সংবৃতা, থিয়েটার, মুক্তধারা, নাট্যদ্বীপ প্রভৃতি নামে বিভিন্ন নাট্যদলের অফিস রয়েছে। পহেলা বৈশাখ, বসন্তবরণ, থার্টিফাস্ট নাইট, বইমেলাসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে টিএসসি হাজারও মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় সকালের নাস্তা, দুপুরের লাঞ্চ, আর রাতে ডীনারের টেবিলে এক সাথে মানুষগুলো চলতে চলতে একসময় খুব আপন হয়ে যায়।

কথা হয় টিএসসির কর্মকর্তা মুহিউদ্দিনের সাথে। তিনি বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিএসসি এলাকা লোকে লোকারণ্য থাকে। বিকেল বেলায় অনেকেই কবিতা পাঠের আসর জমায়। আবার বিভিন্ন দিবসগুলিতে এখানে মানুষের জনস্রোত তৈরি হয়।

চারুকলার বকুলতলা:
পহেলা বৈশাখ, বসন্ত বরণ, শরৎ উৎসবসহ বিভিন্ন উৎসবে তরুণ তরুণীদের উচ্ছাসে ভাসে চারুকলার বকুল তলা। সংগীত, নিত্য ও আবৃতির মধ্যদিয়ে চায়ানটেন শিল্পীরা দিবসগুলো স্বাগত জানায়। নানা বয়সী মানুষ তাদের অনুষ্ঠান দেখতে সেখানে ভিড় জমায়। শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদীনের হাত ধরেই চারুকলার পথ চলা শুরু। ১৯৪৮ সালে এর নাম ছিলো গভর্নমেন্ট আর্ট ইনিস্টিটিউট। এখানে ভাবের দেশের সওদাগরদের হাট বসে যারা কেবলই সৃষ্টি করে তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে।

চারুকলার শিক্ষার্থী ফরিদ উদ্দিন বলেন, বিশেষ দিবসগুলো ছাড়াও চারুকলায় সব সময় তরুণ-তরুণীদের আড্ডা থাকে।

শহীদুল্লাহ হলের পুকুর পাড়:
শহীদুল্লাহ হলের পুকুরকে বলা হয় ‘রহস্যময়’ বা  ‘ভৌতিক’ পুকুর। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, এখানে ডাইনি বুড়ি আর রাক্ষসের বসবাস। চারপাশে লম্বা লম্বা নারকেল ও পাম গাছের সারি পুকুরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। পুকুরের দুই পাড়ে বড় বড় তিনটি শানবাধা ঘাট আছে। বিকালে নারকেলে গাছের ছায়ায় ঘেরা সবুজ ঘাসের উপর ও সিঁড়িতে বসে গল্প ও আড্ডায় মেতে ওঠেন শিক্ষার্থী ও দল বেঁধে বেড়াতে আসা বন্ধু-বান্ধব ও অতিথি দর্শনার্থীরা। জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গল্পের পাশাপাশি তাদের আড্ডায় ঠাঁই পাই এই পুকুরকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিভিন্ন উপকথা।

মিলনমেলা হাকিম চত্বর:
এই চত্বরটির প্রত্যেকটি জায়গা রয়েছে ইতিহাসের সাথে বর্তমানের সংযোগ। মিশে আছে এদেশের প্রত্যেকটি আন্দোলান সংগ্রামের সাথে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অবসর সময় কাটানোর জনপ্রিয় একটি স্থান। কৌতুক, অভিনয় ও উল্লাসে সরগরম থাকে। ১৯৬৭ সালে যখন হাকিম ভাই তার বাবার হাত ধরে ক্যাম্পাসে চায়ের দোকানে আসেন, তখন তার বয়স ছিলো ১৫ বাছর। সে দিনের সেই কিশোর ছেলেটি চার-চারটি দশক ক্যাম্পাসে কখনও ভাই, কখনও বন্ধু, কখনও অভিভাবক আবার কখনও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেমের দূত হিসেবে কাটিয়ে দেন। অবশেষে ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর চলে যান না ফেরার দেশে।  হাকিম ভাই দেশের প্রতিটি অধিকার আদায়ে ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী। তাই হাকিম ভাইয়ের নামেই গড়ে উঠেছে এই চত্বরটির নাম।

অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে ভাস্কর্যটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নারী পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরে। দেশ-সমাজ- রাজনীতির নানা বিষয়ের প্রতিবাদের সমাবেশস্থল এই অপরাজেয় বাংলা। ১৯৭৩ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে উদ্বোধন হয় ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর।

এর পাদদেশেও বসে দেশসেরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা।

ভিসি চত্বর:
ক্যাম্পাসের যে মোহনায় দাঁড়িয়ে দক্ষিণে ফুলার রোডে ব্রিটিশ কাউন্সিল, পূর্বদিকে টিএসসির রাস্তা আর পশ্চিমে নীলক্ষেতের দিকে সেই মোহনার নাম ভিসি চত্বর। এখানে ১৯৫২ সাল থেকে ৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে পোড়ামাটির ফলকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৯৫ সালের ২৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতি ফলক উন্মোচন করা হয়। ভিসির বাস ভবনের পশ্চিম পাশেই এর অবস্থান।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View