ঢাকা : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬, শুক্রবার, ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

কংক্রিটের জঙ্গলের মাঝে ‘সবুজের রমনা’

romna


রমনা আর্ট ‘সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর।’ ধারণাটি প্রথম ঢাকায় নিয়ে আসেন শীর্ষস্থানীয় মোগল সেনাপতি ইসলাম খান। ১৬১০ সালে তিনি তৈরি করেন রমনা উদ্যান। পলাশীর যুদ্ধে বিপর্যয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে মোগল ঐতিহ্যের রমনা উদ্যান অযত্ন-অবহেলায় বিশাল জঙ্গলে পরিণত হয়। পরে উনবিংশ শতকে ঢাকার নবাবদের সহায়তায় ব্রিটিশ শাসকরা রমনা উদ্যান পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন

 

রাজধানী ঢাকায় চোখ খুললেই কংক্রিটের জঙ্গল। এখানে সবুজের দেখা পাওয়া যায় না। তবে নগরবাসীর দম নেয়ার একটি জায়গা রয়েছে রমনা পার্ক। সবুজের ছোঁয়া পেতে মানুষ এখানে ছুটে আসে। রমনাকে বলা হয় রাজধানীর ফুসফুস। রমনা উদ্যান আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ব্যস্ত নগরীর মাঝখানে সবুজের রমনা কারখানা। এখানে রয়েছে শিশুদের বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা। প্রতিদিন মানুষ সকাল-বিকাল এখানে হাঁটাহাঁটি করতে আসেন। পার্কে রকমারি প্রজাতির গাছপালা সুদীর্ঘ সময়ের ফসল।

 

পেছনে ফেরা

 

রমনার অতীত ঐতিহ্যে মোড়ানো। মোঘল আমলের এবং ঢাকার নবাবদের নিসর্গ পরিকল্পনার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে রমনা পার্ক। ‘রমনা’ শব্দের অর্থ ইংরেজিতে ল’ন (Lawn)। তবে রমনা শব্দটি ফার্সি। এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৬১০ সালে মোঘল সেনাপতি ইসলাম খান। রমনা শব্দের অর্থ ‘সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর’।

 

রমনা শুরুতে বর্তমান পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শুরুতে রমনার অবস্থান ছিল পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত। এটি মোঘলদের তৈরি বাগিচা বাগান যেটা নির্মাণ করা হয়েছিল ১৬১০ সালে। ইংরেজ আমলে সেটাই ‘রমনা গ্রিন’ ও ‘রমনা পার্ক’ নামে পরিচত হয়।

 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে রমনা অযত্ন-অবহেলায় বিশাল জঙ্গলে পরিণত হয়। পরে উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসকরা ঢাকার নবাবদের সহায়তায় ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রমনা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

 

১৯০৮ সালে লন্ডনের খ্যাতনামা কিউই গার্ডেনের কর্মী ক্রাইড লকের তত্ত্বাবধানে ‘রমনা পার্কে’র পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়। পত্রপল্লবে শোভিত রমনা এ সময় ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সকালে-বিকালে এখানে মানুষের সমাগম ঘটতে থাকে।

 

শরীরচর্চা ছাড়াও রমনা ছিল নাগরিক জীবনের বিনোদনের অংশ। রমনায় সে সময় ঘোড়ার দৌড় থেকে শুরু করে অনেক সাংস্কৃতিক উত্সব হত। একসময় রমনা ভাগ করে রেসকোর্স পৃথক ভাবে শুরু করা হয়, যেটা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। ঢাকার মানুষেরা সকাল বা সান্ধ্য ভ্রমণে বের হয়ে রমনায় আসতেন।

 

সংস্কৃতির অংশ

 

রমনার দিনলিপি কেবল সকাল বা সান্ধ্য ভ্রমণে বের হওয়া মানুষের কলকাকলিতে সীমিত থাকেনি। পাকিস্তান আমলে নতুন রূপে হাজির হয় রমনা। নতুনভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে রমনার বটমূলে। ষাটের দশক থেকে রমনার বটমূল আমাদের সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক স্থান। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে এখানে প্রথম বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছায়ানটের স্বেচ্ছাসেবীরা জায়গাটি পরিচ্ছন্ন করে। বটগাছের নিচে সেই গানের আসর বসে। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন।

 

রমনার টুকিটাকি

 

গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রমনার আয়তন ৬৮ দশমিক ৫০ একর। ১৯৪৯ সালে এখানে উদ্ভিদ প্রজাতি ছিল ৭১টি। এরপর ক্রমেই তা বেড়েছে। বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজাতি ২১১টি। এর মধ্যে ফুল ও  শোভাবর্ধক প্রজাতির সংখ্যা ৮৭টি, ফলজাতীয় উদ্ভিদ ৩৬টি, ঔষধি প্রজাতি ৩৩টি, কৃষি বনায়নের উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি, বনজ উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি, জলজ উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি ও মশলা উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি। পার্কটিতে একটি লেক রয়েছে। স্থানভেদে ৯  থেকে ৯৪ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত লেকটি  লম্বায় ৮১২ মিটার।

 

বৃক্ষের রাজ্য

 

প্রচুর ঘাস, লতাগুল্ম, ছোট ও মাঝারি গাছ, মৌসুমী ফুলে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী পার্ক এই রমনা। এখানে রয়েছে অতি দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ ও পাখি। রমনায় রয়েছে ১৯টি রেইন্ট্রি গাছ। এর একেকটি গাছ বড় হলে দেড় বিঘা জায়গা দখল করবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। রয়েছে ৩৫০টি মেহগনি গাছও। সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে জাম, জলপাই, হরিতকি, পেয়ারা গাছ। পার্কের উত্তর পাশ লাগোয়া হেয়ার রোডে রয়েছে পাদাউক গাছ। পার্কে অসংখ্য গাছপালার ভিড়ে কিছু ফল এবং ঔষধি গাছও দেখা যায়। সবচেয়ে পুরনো মহুয়াগাছটি পার্কের প্রায় মাঝখানে অবস্থিত ছিল। মহুয়াগাছের পূর্বদিকে আছে মিলেশিয়া ও গুলাচ। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে আছে এক নামে পরিচিত রমনা বটমূল।

 

ফুলের মেলা

 

বৈচিত্র্য থাকায় রমনা পার্কে সারা বছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পার্কে একটি সুন্দর অশোকবীথি আছে পূর্ব পাশে। বর্ষায় ঢাকায় আর কোথাও কেয়া না ফুটলেও রমনার কেয়া ফুল একেবারেই নিয়মিত। হেমন্তে ফোটে ধারমার বা পীতপাটলা। একদিনের আকর্ষণীয় ফুল পাদাউক। বসন্তের কোনো একদিন সোনালী হলুদ রঙের ফুলে ভরে ওঠে গাছ। পার্কের উত্তর পাশে আছে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া।

 

সংগঠন

 

রমনা পার্ক ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা সংগঠন। বাহারি নামের এসব সংগঠনগুলো হলো- ক্ষণিকের মিলন, শতায়ু অঙ্গন, মহিলা অঙ্গন, রমনা ঊষা সংঘ, সুপ্রভাত, ব্যতিক্রম, বনলতা, ভোরের বিহঙ্গ, কিছুক্ষণ, অগ্নিবীণা, রমনা প্রভাতী, জাহাঙ্গীর সার্কেল এবং ক্ষণিকা। সাধারণত সকাল-সন্ধ্যায় হাঁটতে আসা মানুষরাই রমনা পার্ক ঘিরে এসব সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

 

ঐতিহ্য হারাচ্ছে

 

নানা অব্যবস্থাপনার কারণে পার্ক দিন দিন ঐতিহ্য ও আকর্ষণ হারাচ্ছে। ময়লা-আবর্জনা জমে লেকে গভীরতা কমে গেছে। আগাছায় ছেয়ে গেছে লেকের পাড়। লেকের পাশে বসার বেঞ্চ থাকলেও সেখানে বসার উপায় নেই। আশপাশেও ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এখানে একাধিক ডাস্টবিন রয়েছে। গায়ে লেখা, ‘এখানে ময়লা ফেলুন’। কিন্তু ডাস্টবিনে কোনো ময়লা পাওয়া গেল না। সব ময়লা আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। খাবারের কাগজ, পলিথিন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এখানে সেখানে। লেকের কাছে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী মানুষ লেকের পানিতে গোসল করছেন, কাপড় কাচছেন। কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে কেউ হকার, কেউ ভিক্ষুক, কেউ দর্শনার্থী। তবে তাদের মধ্যে অধিকাংশই নিয়মিত এখানে গোসল করেন। লেকের চারধার জুড়েই মানুষ গোসল করছেন। ফলে তাদের ব্যবহূত সাবানে দূষিত হচ্ছে লেকের পানি। তাছাড়া লেকের পানিতে বোতল, জুতা, খাবারের প্যাকেট, ডাবের খোল, বিভিন্ন গাছের পাতা পচে পানি কালো হয়ে গেছে।

 

পরিবেশবাদীদের উত্কণ্ঠা

 

রমনা পার্ক নিয়ে উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, বাংলাদেশের উদ্যান ও পার্ক সংরক্ষণের জন্য একটি পলিসি দরকার, প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট উদ্যান রক্ষা কমিটি গঠন। দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ রক্ষার জন্য একটি পর্যবেক্ষণ সেল, পার্ক ও উদ্যান সংরক্ষণে ‘পার্ক পুলিশ’ গঠন করতে হবে।

 

পরিবেশবিদ ডা. আব্দুল মতিন বলেন, রমনা পার্ক ঢাকা শহরের অনন্য পার্ক। হাঁটা-চলা, বেড়ানোর পাশাপাশি বৃক্ষ চেনার জন্যও এখানে অনেকে আসেন। তাই ঢাকাবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পার্কটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেই হবে।

 

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটির সুপারিশের আলোকে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে হবে। সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে রমনা পার্ক রক্ষাসহ এর ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব।

 

প্রকৃতিবিদ অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা বলেন, রমনা পার্ক রক্ষায় সরকারের সকল পদক্ষেপে আমরা সহযোগিতা করতে আগ্রহী। আমরা আশা করব একে যথাযথ সংরক্ষণের জন্য সরকার সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।

 

মন্ত্রী যা বললেন

 

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা রমনা পার্কসহ সকল উদ্যান রক্ষা করতে চাই। রমনা পার্ক সংরক্ষণে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির মতামতের ভিত্তিতে রমনা পার্ক সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়া হবে না।

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা বিশ্ব এভাবে বসে বসে দেখতে পারে না:মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ওআইসি ও জাতিসংঘের উদ্দেশ্যে করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, ‘দয়া করে কিছু …

Mountain View

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *