ঢাকা : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬, বুধবার, ৬:২৪ অপরাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

মুস্তাফিজের সাতক্ষীরায় ক্রিকেট জোয়ার

fiz


গ্রামের নাম মুন্সীগঞ্জ। দুই পা বাড়ালেই চুনা নদী। নদী পার হলেই সুন্দরবন। ও পারে বাঘ, এ পারে শেষ মনুষ্যবসতি। বসতির সব জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি সভ্যতার ছোঁয়া, পৌঁছায়নি বৈদ্যুতিক আলো।

বিদ্যুত্ না থাকলেও টেলিভিশনের অভাব নেই। মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে ব্যাটারি কিংবা সৌর বিদ্যুতে চলে টেলিভিশন। বিকাল হলেই হাতে চায়ের কাপ নিয়ে লোকে ভিড় জমায় টেলিভিশনের সামনে। এই কদিন আগেও টেলিভিশনগুলো দখলে ছিল শাকিব খান, অনন্ত জলিল কিংবা কয়েক মাইল ওপাশের ভারতীয় কোনো নায়কের অনুষ্ঠানে।

সেই চিত্র বদলেছে। টেলিভিশনে বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীর আধিপত্যের দিন শেষ।

বিকাল হলেই এখন সুন্দরবনের কোলে টেলিভিশনগুলোতে ব্যাট-বলের ঝনঝনানি। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে শুরু করে সিপিএল, আইপিএলের খেলার পুনঃপ্রচার চলে অনবরত। খেলা যারই হোক, লোকের ক্রিকেট দেখায় কোনো ক্লান্তি নেই। কেবল মাঝে মাঝে কোনো এক কণ্ঠ শোনা যায়, ‘আচ্ছা, আমাগো ছলডা কি খেলতিছে?’

উত্তর যাই হোক, অবিরাম ক্রিকেট অনুসরণ করে মানুষগুলো। অপেক্ষায় থাকে, তাদের ছেলেটার খেলা দেখার। হ্যাঁ, মুস্তাফিজুর রহমানের খেলা দেখার।

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এক মুস্তাফিজের কল্যাণে ক্রিকেটভক্ত হয়ে গেছে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ, তেঁতুলিয়া থেকে শুরু করে সাতক্ষীরার প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি রাস্তার মোড় এবং প্রতিটি বাসভবন। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশের দূরতম এক জেলায় ক্রিকেট খেলাটি আবিষ্কারের এই হাজার বছর পর নিজেকে খুঁজে পেয়েছে; হয়ে গেছে ক্রিকেট বিপ্লব।

সাতক্ষীরায় হয়ে যাওয়া এই ক্রিকেট বিপ্লবের স্বরূপ বুঝতে অবশ্য এতো প্রান্তে না গেলেও চলে। শহরে নেমে একটু কষ্ট করে সরকারি স্কুল বা সরকারি কলেজের মাঠে গেলেও দিব্যি বোঝা যাবে, ক্রিকেট খেলাটা এখন কোন্ জায়গায় চলে গেছে।

এ জেলাটির ক্রিকেট নিয়ে যারা অনেকদিন ধরে কাজ করছেন, তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, বছর তিনেক আগেও এখানে মাঠে ছিল ফুটবলের দাপট; ক্রিকেট অ্যাকাডেমি চালানোর মতো ছাত্র পাওয়া যেতো না। সেই সাতক্ষীরা শহরে এখন কমপক্ষে গোটা বিশেক ক্রিকেট অ্যাকাডেমি চলছে বেশ দাপটের সাথে। এর মধ্যে শীর্ষ দুটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রত্যেকের ছাত্রসংখ্যা ৮ শতাধিক করে!

জেলার প্রাচীনতম ক্রিকেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সাতক্ষীরা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি’র প্রধান ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কোচ মুফাচ্ছিনুল ইসলাম তপু তার সহকারী কোচদের নির্দেশনা দেওয়ার ফাঁকে হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘পাঁচ বছর আগে কী অবস্থা ছিল আমাদের? বিশ-বাইশ জন ছেলে পেতাম কি না সন্দেহ। বাড়ি থেকে ডেকে আনতে হতো। কোনো কোনো দিন দুজন পাওয়া যেতো কি না সন্দেহ। আমার মাঠের পাশে বাসা, তাই এখানেই থাকতাম। কাউকে পেতাম না। আর এখন আমরা সব আগ্রহী ছাত্রদের জায়গাও দিতে পারি না। মুস্তাফিজ, সৌম্য, শিপলুদের কারণে সাতক্ষীরার ব্র্যান্ডটাই চেঞ্জ হয়ে গেছে।’

হ্যাঁ, এতোক্ষণে আমরা এই মহাবিপ্লবের প্রকৃত কারণে চলে এসেছি।

বিপ্লবটা করেছেন তিনজন বিপ্লবী তিন ধাপে। ২০১৩ সালে এই সাতক্ষীরার ছেলে, ফাস্ট বোলার রবিউল ইসলাম শিপলু জাতীয় দলে ডাক পান। একটু প্রাণ তৈরি হয় জেলার ক্রিকেটে। ২০১৪ সালের শেষ দিকে মঞ্চে আসেন সৌম্য সরকার। চঞ্চল হয়ে ওঠে সাতক্ষীরার ক্রিকেট। আর ২০১৫ সালে বিস্ফোরণটা ঘটান মুস্তাফিজুর রহমান; কাটার বয় মুস্তাফিজ, রহস্যময় বোলার মুস্তাফিজ, দুনিয়া কাঁপানো দ্য ফিজ!

মুস্তাফিজের প্রভাবটা কেমন বলতে গিয়ে খুব হাসছিলেন তার প্রথম কোচ আলতাফ হোসেন, ‘খুলনা থেকে এক পরিবার তাদের ছেলে নিয়ে এসেছে সাতক্ষীরায়। আমার নাম জানে না, আমার অ্যাকাডেমির নাম জানে না। বাসস্ট্যান্ডে নেমে বললো— মুস্তাফিজের স্যারের কাছে যাবো। আমাকে এসে বলে, ছেলেকে কাটার ডেলিভারি শেখাবে। বোঝেন অবস্থা!’

কেবল খুলনা থেকে নয়, যশোর, মাগুরা, নড়াইল থেকেও ছেলেরা আসছে। এমনকি ঢাকা থেকে আসাও অন্তত তিনটি ছেলের সন্ধান পাওয়া গেলো। এরা বেশিরভাগই সাতক্ষীরায় কোনো আত্মীয়ের বাড়ি থাকছে; মেস করেও থাকছে কয়েকটি ছেলে। এখানেই স্কুলে ভর্তির চেষ্টা করছে। মূল উদ্দেশ্য একটাই, মুস্তাফিজ-সৌম্যর গুরুদের কাছে ক্রিকেট শেখা।

মুস্তাফিজের আরেক কোচ তপু একটু হিসাব দিয়েই বললেন, এই মুস্তাফিজ-সৌম্যদের প্রভাবটা। তিনি জানালেন, আগে সাতক্ষীরা জেলায় একটাই ক্রিকেট অ্যাকাডেমি ছিলো। গত দুই বছরে সেই সংখ্যাটা কিভাবে চোখের সামনে বাড়ছে, সে তো দেখাই গেলো। এমনকি অন্তত ৫টি উপজেলা পর্যায়েও ক্রিকেট অ্যাকাডেমি আছে বলে জানালেন তপু। পঞ্চাশ বা একশ’ করে ছাত্র এখন সব অ্যাকাডেমিতেই আছে; যা ঢাকা শহরের জন্যই কম ঈর্ষণীয় নয়।

কিন্তু এই যে কাতারে কাতারে ছেলেরা, বলা ভালো তাদের অভিভাবকরা মুস্তাফিজ-সৌম্য বানানোর নেশায় বাসা থেকে বের হচ্ছেন; তার কী আদৌ কোনো সুফল আছে?

প্রশ্নটা শুনে তপু একটা আপ্তবাক্য শোনালেন, ‘কোয়ানটিটি কিছুটা হলেও কোয়ালিটি তৈরি করে।’ এরপর পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝালেন। তপুর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের সবগুলো বয়সভিত্তিক জাতীয় প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন খুলনা বিভাগ এবং সেই খুলনা বিভাগের প্রতিটা বয়সভিত্তিক দলে সাতক্ষীরার কমপক্ষে ৩ জন, ওপরে ৫ জন প্রতিনিধি আছে! এ ছাড়া প্রতিটি জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে এক বা একাধিক সাতক্ষীরার ছেলে প্রতিনিধিত্ব করছে। একেবারে হাতে ধরে ডেকে এনে দেখিয়ে দিলেন, তারই অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং করতে থাকা জনাবিশেক মেয়ে ক্রিকেটারের মধ্যে তিনজন খেলছে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে!

সাফল্যের আর কী প্রমাণ চাই।

মাঠে প্রভাব পড়েছে, সংস্কৃতিতে প্রভাব পড়েছে। শহর থেকে শুরু করে একেবারে বনের বুকের গ্রামের মানুষের জীবন-যাপনে ঢুকে পড়েছে ক্রিকেট। আলতাফ হোসেন আমাদের এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘সাতক্ষীরার পরিচিতি ছিলো নেগিটিভ। একটার পর একটা খারাপ কারণে সাতক্ষীরা খবরে আসতো। ক্রিকেট সাতক্ষীরার পরিচয় বদলে দিয়েছে। এখন সাতক্ষীরা বললে লোকে মুস্তাফিজ-সৌম্য বোঝে।’ এই তো ক্রিকেট বিপ্লব!

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

সিরাজগঞ্জ প্রিমিয়ার লীগ: ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা

জুবায়ের আহমেদ: আমরা বাংলাদেশের ক্রিকেট বলতে জাতীয় দলের খেলা, বিপিএল কিংবা আইসিসি স্বীকৃত ঘরোয়া ম্যাচগুলোকেই …

Mountain View

আপনার-মন্তব্য