ঢাকা : ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, শনিবার, ৪:৫১ অপরাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

জহুরার গল্পটা একটু ভিন্ন

প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে জহুরা সবে পা রেখেছিল হাইস্কুলে। এক সপ্তাহ আগেই তার প্রিয় পুতুল ‘তুলি’কে বান্ধবীর পুতুলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। এর পরের সপ্তাহে পুতুল খেলা মেয়েটির সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে গেল। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বাগবের গ্রামের জালালউদ্দিনের মেয়ে জহুরা আক্তার। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার বড় সে।

২০০৩ সালে সে স্থানীয় প্রগতি উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়স সবেমাত্র ১১ বছর। হঠাৎ তার বাবা জালাল উদ্দিন পাশের পড়শী বৌড়ারটেক এলাকার এক যুবকের সঙ্গে তাকে না জানিয়েই বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখে গায়ে হলুদের আয়োজন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাফপ্যান্ট-ফ্রক পরা মেয়েটি শরীরে বেখাপ্পা শাড়ি জড়িয়ে পৌঁছে যায় ‘শ্বশুরবাড়ি’ নামের নতুন ঠিকানায়। বন্ধ হয়ে যায় লেখাপড়া। পরের দিন থেকেই স্বামীর সংসারে বিনা মাইনের দাসীর নাম হয় জহুরা।

৬ মাসের মাথায় আদর সোহাগ শেষ। শুরু হয় যৌতুক নামের আবদার। দরিদ্র পিতার পক্ষে আবদার রাখা কঠিন বিধায় আর সকল গল্পের মতোই শুরু হয় নির্যাতন। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় হয়ে পড়ে গর্ভবতী। ১৩ বছরের কিশোরী হয়ে যায় ‘কিশোরী মা’। তবুও চলে যৌতুকের দাবি আর নির্যাতন।

১৩ শুরুর আগেই শেষ হতে পারতো জহুরার গল্পটা। মেনে নিতে পারতো সবকিছু। কিন্তু নির্যাতিত মায়ের পেটে জন্ম নিয়েছে ‘জয়িতা’ কন্যা। নিজের কন্যা জয়িতার মুখের দিকে তাকিয়ে জহুরা ভাবে, সব শেষ করে দেয়া যাবে না। শুরু করতে হবে নতুন করে, নতুনভাবে। বাঁচতে হবে তাকে, বাঁচাতে হবে মেয়েকে। তার সব প্রেরণার উৎস দুই বছরের মেয়ে জয়িতাকে সঙ্গে নিয়ে ৪ বছরের সংসার জীবনকে গুডবাই জানায় জহুরা।

এখান থেকেই শুরু তার নতুন পথচলা। কোথায় যাবে সে? বাবার বাড়ি? সেখানেও সর্বোচ্চ নিরাপদ নয়। সুরক্ষিত নয় তার মেয়ে। সে জানে অন্যের বোঝা হয়ে থাকা জীবন কখনোই  প্রকৃত জীবন না। তাই নিজে কিছু করবো প্রত্যয় দৃঢ় হয় তার অন্তরে। এরপর থেকেই বাবার বাড়ির পাশে একজনের বাড়িতে ভাড়ায় থেকে শুরু করে তার সংগ্রামী জীবন।

সেলাই কাজ থেকে শুরু করে কাঁথায় নকশি করা, টুপি তৈরি, খামারিসহ হাতের কাজের বিচিত্র সব পেশায় জড়িয়ে তার কর্মজীবনে জহুরা এনেছেন বৈচিত্র্য। অবশেষে স্থানীয় এনজিও কর্মী সাবিলা আফরোজের বদৌলতে জহুরা খুঁজে পান তার সফলতার গল্প লেখার উপকরণ।

ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি প্রোগ্রামের ইইপি প্রকল্পের অধীনে বিউটি পার্লারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন জহুরা। প্রশিক্ষণের পরপরই নিজের থাকার ঘরে পার্লারের কাজ শুরু করেন তিনি। কম সময়ে পরিচিতিও পান। শুরু হতে থাকে বিউটিশিয়ান জহুরার বিউটিফুল জীবন। তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বহুগুণ। জায়গা স্বল্পতার কারণে ও চাহিদার কথা বিবেচনা করে দুজন সহকারী নিয়ে বাগবের বাজারে ‘জয়িতা’ বিউটি পার্লার খুলেন। নিয়মিত করেন তার পড়াশোনা, পাশাপাশি মেয়েকে তো সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে কঠিন সংকল্প আগেই করে রেখেছেন।

বাগবের বাজারের ‘জয়িতা’ বিউটি পার্লারে বসে আত্মপ্রত্যয়ী জহুরা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি শোনান তার জীবনকে পাল্টে দেয়ার গল্প।

তিনি জানান, বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হয় তার। এদিকে, তার এ কাজে উৎসাহী হয়ে বাগবের এলাকার আফরোজা, কেয়ারিয়া এলাকার শিউলি, সুমি, আঁখি, ইছাপুরা এলাকার শিমু, টানমুশুরি এলাকার বৃষ্টি রানী পার্লারের কাজ শুরু করেছেন। বর্তমানে তারাও আছেন ভালোই।

জহুরা আরো বলেন, শ্বশুরবাড়ি যখন যমেরবাড়ি মনে হচ্ছিল তখন নির্ভরতার আশ্রয়স্থল বাবার বাড়ির লোকেরাও বোঝা ভেবেছিল তাকে। এখন তিনি নিজেই বাড়ি মালিক। আছে নিজস্ব ব্যবসা, নিজে পড়াশোনা করছেন মুড়াপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। মেয়ে তার নবম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী।

জহুরা এখন নিজেকেসহ মেয়েকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি আরেকটি কাজ করে বেড়ান। বাল্যবিয়ের দুর্বিষহ জীবন সম্পর্কে স্কুলে ঘুরে ঘুরে কিশোরী মেয়েদের সচেতন করেন। নিজের জীবনের উদাহরণ টেনে সকলকে বোঝান স্বাবলম্বী হলে কিভাবে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। জহুরার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন পার্লারের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ব্যবসার পাশাপাশি একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করবেন। যেখানে অসহায় আর থেমে যাওয়া মেয়েরা তার মতো করে আবার জীবন শুরু করবে।

সূত্র: মানবজমিন

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহত্যা বিশ্ব এভাবে বসে বসে দেখতে পারে না:মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ওআইসি ও জাতিসংঘের উদ্দেশ্যে করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বলেছেন, ‘দয়া করে কিছু …

Mountain View

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *