Mountain View

চট্টগ্রামের হিমুকে কুকুর লেলিয়ে হত্যা, পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশিতঃ আগস্ট ১৪, ২০১৬ at ১০:৫২ অপরাহ্ণ

himu

মাদক সেবনের প্রতিবাদ করায় কুকুর লেলিয়ে দিয়ে মেধাবী ছাত্র হিমাদ্রি মজুমদার হিমুকে হত্যার দায়ে পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।আজ (রোববার) ১৪ আগস্ট)চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নূরুল ইসলাম এ রায় দিয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হল, শাহ সেলিম টিপু ও তার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ এবং রিয়াদের তিন বন্ধু শাহাদাৎ হোসাইন সাজু, মাহাবুব আলী খান ড্যানি এবং জাহিদুল ইসলাম শাওন।

এদের মধ্যে শাহ সেলিম টিপু, শাহাদাৎ হোসাইন সাজু ও মাহাবুব আলী ড্যানি বর্তমানে কারাগারে আছেন। অপর দুই আসামি রিয়াদ ঘটনার পর থেকে এবং শাওন জামিনে গিয়ে পলাতক আছে।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ও অতিরিক্ত মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট অনুপম চক্রবর্তী বলেন, সকল আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় আনা অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে। আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচারের রায় শুনতে ওই আদালতে ভিড় জমে যায়। বিকেল ৪টায় বিচারক এজলাসে উঠেন। বিপুল সংখ্যক আইনজীবী, সাংবাদিক এবং হিমুর স্বজনদের উপস্থিতিতে পিনপতন নীরবতার মধ্যে রায় ঘোষণা করেন আদালত।

দু’শ পৃষ্ঠারও বেশি লিখিত রায়ের মধ্যে মাত্র তিন মিনিটে সারসংক্ষেপ পাঠ করে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক।এদিকে ঘোষিত রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আসামিদের আইনজীবী ও চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, কুকুর দিয়ে হত্যার যে কথা বলা হচ্ছে সেটি রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি।

আসামিদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রমাণ হয়নি। তারপরও যে রায় হয়েছে তাতে আসামিরা ন্যায়বিচার পাননি বলে আমি মনে করি। আমরা উচ্চ আদালতে যাব। আশা করি সেখানে আসামিরা বেকসুর খালাস পাবেন।

এলাকায় মাদক ব্যবসা ও সেবনের প্রতিবাদ করায় ২০১২ সালের ২৭ এপ্রিল নগরীর পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ‘ফরহাদ ম্যানশন’ নামের ১০১ নম্বর বাড়ির চারতলায় হিমুকে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দিয়ে নিমর্মভাবে নির্যাতন করে সেখান থেকে ফেলে দেয় অভিজাত পরিবারের কয়েকজন বখাটে যুবক।

গুরুতর আহত হিমু ২৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২৩ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।  হিমু পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ইংরেজি মাধ্যমের সামারফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিল।

এ ঘটনায় হিমুর মামা প্রকাশ দাশ অসিত বাদি হয়ে পাঁচলাইশ থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। আসামিরা হলেন, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শাহ সেলিম টিপু, তার ছেলে জুনায়েদ আহমেদ রিয়াদ এবং রিয়াদের তিন বন্ধু শাহাদাৎ হোসাইন সাজু, মাহাবুব আলী খান ড্যানি এবং জাহিদুল ইসলাম শাওন।

২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পাঁচলাইশ থানা পুলিশ ওই মামলায় এজাহারভুক্ত পাঁচজন আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। ১৮ অক্টোবর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।

এরপর অভিযোগ গঠনের জন্য আদালত সময় নির্ধারণ করলেও চারবার তা পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ এসএম মজিবুর রহমান এ মামলায় পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু মামলায় ছয় জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয়ার পর ২০১৪ সালের ২১ জুলাই এক আসামির করা আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলায় ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও জাফর আহমদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। ওই স্থগিতাদেশের অনুলিপি ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম আদালতে পৌঁছালে মামলাটির বিচার কাজ থেমে যায়।

এরপর ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট উচ্চ আদালতের একই বেঞ্চ তাদের দেয়া ছয় মাসের ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে করে। সেই আদেশের অনুলিপি ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম আদালতে এসে পৌঁছায়।

এরপর ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক রেজা তারিক আহমেদের আদালতে আবার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্রে উল্লেখিত ২১ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হওয়ায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আগে ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ মামলাটি চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর হয়ে যায়। ওই আদালতে বিচারক পদ ছিল শূণ্য। পাঁচ মাস পর ২০১৫ সালের ২৭ আগস্ট ওই আদালতে নতুন বিচারক যোগ দেন। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর হিমু হত্যা মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষ।

পাঁচটি নির্ধারিত দিনে যুক্তি উপস্থাপন করে ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়।

এরপর ১ নভেম্বর আসামি শাহ সেলিম টিপুর আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। সর্বশেষ গত ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ৩২ কার্যদিবস যুক্তি উপস্থাপন করেন মামলার পাঁচ আসামির আইনজীবী। ১৬ জুলাই মামলার রায় ঘোষণা করতে ২৮ জুলাই সময় নির্ধারণ করেন আদালত।

কিন্তু ওইদিন বিচারক ছুটিতে থাকায় রায় ঘোষণা করা হয়নি। এরপর ১১ আগস্ট রায় ঘোষণার দ্বিতীয় দিন ধার্য করা হয়। ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম আদালতে ‘ফুল কোর্ট রেফারেন্স’ থাকায় রায় ঘোষণা করা হয়নি। এরপর ১৪ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন আদালত।

এ সম্পর্কিত আরও