Mountain View

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে পিছিয়ে দিয়েছিলেন “চ্যাপেল”

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৬ at ৯:০৫ অপরাহ্ণ

‘চ্যাপেল’ নামটা শুনলেই অন্য রকম এক মাদকতা পেয়ে বসে ক্রিকেট-রোমান্টিকদের। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চ্যাপেলের নাম। তবে সেই চ্যাপেল ইয়ান বা গ্রেগ নয়; চ্যাপেল ভাইদের সবার ছোটজন—ট্রেভর চ্যাপেল। বড় দুই ভাইয়ের মতো বিখ্যাত নন। বরং এক কুখ্যাত ঘটনায় জড়িয়ে আছে নাম। ১৯৮১ সালে ত্রিদেশীয় বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিরিজে বল গড়িয়ে দিয়েছিলেন, যেন আর যা-ই হোক ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি না পায়। যদিও এ ঘটনার মূল দায় তাঁর নয়। অধিনায়ক ও মেজ ভাই গ্রেগের নির্দেশেই এই কাণ্ড করেছিলেন।

ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এক ঘটনার জন্ম দেওয়া ট্রেভর বাংলাদেশের ক্রিকেটেও কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে গেছেন। অনেকের চোখেই, বাংলাদেশের ক্রিকেট পিছিয়েই দিয়েছিলেন এই সাবেক অস্ট্রেলিয়ান। ২০০১ সালের শুরুর দিকে এডি বারলো অসুস্থ হয়ে ফিরে গেলে হন্যে হয়ে নতুন কোচ খুঁজছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। চ্যাপেল পরিবারের একজন হিসেবেই ট্রেভরের ওপর হয়তো আস্থা রেখেছিল তারা। ২০০১ সালের এপ্রিলে বিদেশের মাটিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে ট্রেভরকে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বিসিবি। ২০০১ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে সফরটা সহজ ছিল না বাংলাদেশের জন্য। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, হিথ স্ট্রিকদের সেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা সেই সময়টায় বাংলাদেশের জন্য খুব বড় প্রেরণাদায়ী হতে পারেননি ট্রেভরও। বন্ধুর মতো আপন হতে পারেননি। আদর্শ কড়া হেডমাস্টার নয়। কখনো কখনো বুক পেতে শিষ্যদের আড়াল করার বদলে ব্যর্থতার বলি হিসেবে তাদেরই ঠেলে দিয়েছেন সামনে। হতে পারেননি অভিভাবকও। এমনও বলেছিলেন, তাঁর ভাষাই নাকি বুঝতে পারে না ইংরেজি না-জানা ক্রিকেটাররা। অথচ এই ‘ভাষা সমস্যা’ নিয়ে ঠিকই বাকি কোচরা ঠিকই কাজ করেছেন। তা ছাড়া ট্রেভরের সময়ের সিনিয়র ক্রিকেটাররা প্রায় সবাই ভালো ইংরেজি বলতে ও বুঝতে পারতেন। দু-একজন নবীন খেলোয়াড়ের সমস্যা থাকতে পারে। সেখানে কোচ এই ভাষার বাধাকেই কী করে বড় করে দেখেন! ২০০১ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে সফর দিয়ে তাঁর শুরু। বাংলাদেশের কোচ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ সালের মার্চ- এপ্রিল পর্যন্ত। এই এক বছরে বাংলাদেশ খেলেছে তিনটি সিরিজ। ঘরের মাঠে দুটি আর বিদেশে একটি। এই তিনটি সিরিজেই দলের বাজে অবস্থা দেখে বিসিবি ট্রেভরের চুক্তি না বাড়ানোর সিদ্ধান্তই নিয়েছিল। ট্রেভরের সময়ের বড় ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এখনকার প্রাণপুরুষ মাশরাফি বিন মুর্তজার আবির্ভাব। মাশরাফিকে আবিষ্কার কৃতিত্ব তাঁর তো নেই–ই, উল্টো তাঁকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারা; অতিব্যবহারে তাঁকে ইনজুরিপ্রবণ ক্যারিয়ারের দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় তাঁরও ওপর বর্তায়। ট্রেভর টেস্ট যুগের শুরুতে দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ঠিকমতো ব্যবহার তো করতেই পারেননি বলেও অভিযোগ ওঠে। সে সময় দলের দুই সেরা ও অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান আকরাম খান ও আমিনুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে টেস্ট দলের বাইরে ঠেলে দেওয়ার জন্য অনেকেই তাঁকে দায়ী করেন। অভিজ্ঞদের হারিয়ে ফেলার কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের ভিত্তিটা শক্ত জমিনে গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশে প্রধান কোচ হয়ে আসার আগে শ্রীলঙ্কার ফিল্ডিং কোচ ছিলেন ট্রেভর। খেলোয়াড়ি জীবনে একজন তুখোড় ফিল্ডার হিসেবে খ্যাতিমান ট্রেভর যে বাংলাদেশের জন্য কিছুই করেননি, সেটা বলা বোধ হয় অন্যায়ই। তাঁর সময় গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ের অনেক উন্নতি হয়। দলের খেলোয়াড়দের সার্বিক ফিটনেসের মানও বাড়ে। ‘অ্যাথলেটিসিজম’ ব্যাপারটি দৃশ্যমান হয় বাংলাদেশ দলে।

খেলোয়াড়ি জীবনে বড় দুই ভাইয়ের মতো প্রতিভাবান তিনি ছিলেন না। মাঝারি মানের খেলোয়াড়ি জীবনের মতো তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারও খুব সমৃদ্ধ নয়। বাংলাদেশের পর অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই টেস্ট ক্রিকেটার কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় যে চাকরিটি করেছেন, সেটা সিঙ্গাপুরে। ২০১৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুর জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সেভাবে এগিয়ে দিতে তো পারেননি, কেউ কেউ মনে করেন, ট্রেভর না থাকলেই বোধ হয় ভালো হতো বাংলাদেশের জন্য!

এ সম্পর্কিত আরও