Mountain View

রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনেসকোর আপত্তি

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬ at ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে দেশে-বিদেশে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনসহ সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক সে সময় এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে আপত্তি জানাল ইউনেসকোও। এ বিষয়ে গত ১১ আগস্ট সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে ৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাটি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তারা বলেছে, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান ও সর্ববৃহৎ শ্বাসমূলীয় জলাবন (ম্যানগ্রোভ) সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপাল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সরকারকে পরামর্শও দিয়েছে তারা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকার যে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করেছে, সেটিকেও অসম্পূর্ণ বলে অভিহিত করেছে ইউনেসকো। প্রতিবেদনের বিষয়ে আগামী ১১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারের মতামত চেয়েছে সংস্থাটি।

 

প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছেন ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক ম্যাকটিল্ড রোসলার। তাতে বলা হয়েছে, সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে নির্মাণ হতে যাওয়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগামী মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪০তম অধিবেশনে আলোচনা হবে। ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর ওই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

 

১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি। এ কমিটি গত বছর জুলাইয়ে তাদের ৩৯তম অধিবেশনেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে, সে সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিল ইউনেসকো। ইউনেসকোর আগে জাতিসংঘের আরেক সংস্থা রামসার সেক্রেটারিয়েটের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া গত মাসে বিশ্বের ১৭৭টি সংস্থা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করতে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছিল। সুন্দরবনের পাশে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন হয়েছে।

 

তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অনড় অবস্থানে আছে সরকার। এরই মধ্যে এ প্রকল্পে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তিও করে ফেলেছে সরকার।

 

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দেশি-বিদেশিসহ বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র আপত্তি ওঠায় সুন্দরবন ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় ইউনেসকো। গত বছর জার্মানির বনে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৩৯তম সেশনে এ সিদ্ধান্ত হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ ইউনেসকোর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এক

 

 

সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) প্রতিনিধি নাওমি ডোয়াক, মিজুকি মুরাই ও বিশ্ব ঐতিহ্য সেন্টারের ফানি অ্যাডলফাইন ডাউবিরি। সফরকালে বিশেষজ্ঞদল বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। প্রতিনিধিদলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে পরিবেশ ও সুন্দরবনের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিরূপণ করা। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদলের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেটি আর হয়নি। প্রতিনিধিদলটি ২৯ মার্চ বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পাঁচ মাস পর এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে পাঠিয়েছে ইউনেসকো।

 

সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থান হিসেবে ঘোষণা দেওয়ারও আভাস মিলেছে ইউনেসকোর প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নামের একটি সংস্থাকে দিয়ে। কিন্তু ওই ইআইএ আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। তাতে সঠিক চিত্র উঠে আসেনি। ইউনেসকো মনে করে, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সেখানকার ইকোসিস্টেমের ওপর ব্যাপক হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রামপালে প্রস্তাবিত স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করার পক্ষে মত দিয়ে সংস্থাটি কেন্দ্রটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে বলেছে। ইউনেসকোর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল সুন্দরবনকে ঘিরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে ভবিষ্যতে আশপাশে আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।

 

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে ভাটিতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে সমস্যায় পড়ছে।

এ সম্পর্কিত আরও