Mountain View

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘দুঃসময়ের ভরসা’

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

babu-1
মাশরাফি বিন মুর্তজার কাছে ‘বাবু ভাই’ আপন বড় ভাইয়ের মতো। হাবিবুল বাশারের মতে মানুষটি আবার বাংলাদেশ ক্রিকেটের নি:স্বার্থ সহচর, সত্যিকারের সুহৃদ। কখনও পরিচয় না হওয়া দলের নবীন ক্রিকেটারও তাকে ভাবেন আপন কেউ। নেই কোনো পদ-পদবী বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব। অফিসিয়ালি ক্রিকেটের কেউ নন, তবু একরাম বাবু বাংলাদেশ ক্রিকেটের ঘনিষ্ঠ একজন!

অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসী একরাম বাবু সম্প্রতি দেশে এসেছিলেন মায়ের সঙ্গে কটা দিন কাটিয়ে যেতে। এর মাঝেই কদিন আগে মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে সময় দিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে। শোনালেন আড়ালে থেকেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের খুব কাছের একজন হয়ে ওঠার গল্প।

শুরুর গল্প

সাবেক ক্রিকেটার হাবিবুল বাশার, সানোয়ার হোসেনদের কাছের বন্ধু একরাম বাবু। একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছেন তারা। স্বীকৃত কোনো পর্যায়ে না হলেও টুকটাক ক্রিকেট খেলেছেন বাবুও। ২০০০ সালে চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়। থিতু হন মেলবোর্নে।

ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক বলতে তখনও কেবল কাছের বন্ধুরা। ২০০৩ সালে একদিন দেশ থেকে সেই সময়ের পরিচিত এক বিসিবি কর্তা খন্দকার জামিলউদ্দিনের ফোন পেলেন, “আমাদের একজন ক্রিকেটার ইনজুর্ড। মেলবোর্নে একজন ডাক্তার আছে, ডেভিড ইয়াং। ওকে তার কাছে পাঠাতে চাই। সার্জারির খরচটা শুধু আমরা দিতে পারব। বাকিটা তোমার ম্যানেজ করতে হবে।”

সেই ক্রিকেটারের নাম মোহাম্মদ শরীফ। তখন শরীফ অমিত সম্ভাবনাময় এক পেসার। খুব বেশি না ভেবেই রাজি হয়ে গেলেন বাবু। দেশের জাতীয় একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার বলে কথা। ড. ডেভিড ইয়াংয়ের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখলেন। চোট ও অস্ত্রোপচারের ধরণ জেনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলেন, অস্ট্রেলিয়ায় মাস তিনেক থাকতে হবে শরীফকে। হাসপাতালে প্রতিদিন থাকার খরচ ১ হাজার ডলার করে।

নিজের করণীয়টা বুঝে ফেললেন বাবু। শরীফ গিয়ে উঠলেন বাবুর বাসাতেই। ডাক্তারের সঙ্গে আগেই কথা বলা ছিল। অস্ত্রোপচারের পর দিনই আবার শরীফকে নিয়ে ফিরলেন বাসায়। শুরু হলো বাবুর লড়াই। পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে করতে পারেন সব কিছু।

“আমি তখনও ব্যাচেলর। ৬-৭ জন মিলে থাকতাম। শরীফকে নিয়ে এলাম। ওর ইনজুরিটা ছিল গ্রোয়েনে। অপারেশনের পর নিজে কিছুই করতে পারত না। বাথরুমে যেতে বা কিছু করতে হলে কোলো তুলে নিয়ে যেতাম, মুখে তুলে খাইয়ে দিতাম। প্রায় সাড়ে তিন মাস আমরা এভাবেই দেখভাল করেছি ওর।”

বাবুর তখনও ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করার কারণ নেই, সেটি ছিল কেবলই শুরু। ধারণাও করতে পারেননি, শরীফকে দিয়েই বাধা হবে অদ্ভুত এক গাঁটছড়া, যেটি চলতে থাকবে বছরের পর বছর!

দৃশ্যপটে মাশরাফি

শরীফ থাকা অবস্থায়ই আবার দেশ থেকে খন্দকার জামিলউদ্দিনের ফোন পেলেন বাবু। আরেকজন তরুণ ফাস্ট বোলারকে মেলবোর্ন পাঠাতে হবে অস্ত্রোপচারের জন্য। যথারীতি বিসিবি শুধু অস্ত্রোপচারের খরচই দিতে পারবে।

মাশরাফির চোটের খবর ততদিনে জানতেন বাবু। শুরুতে মাশরাফি কদিন ছিলেন তার এক মামার কাছে। এরপরই উঠলেন বাবুর বাসায়। মাশরাফি যাওয়ার সাত দিন পর দেশে ফিরলেন শরীফ।

যথারীতি একই প্রক্রিয়া। ডেভিড ইয়াংয়ের সঙ্গে সবকিছু চূড়ান্ত করা। অস্ত্রোপচারের ঠিক আগে বাবু পড়লেন ভয়াবহ সমস্যায়। এতদিন পর সেই অভিজ্ঞতা মনে করে হাসলেন বাবু।

“মাশরাফির অপারেশন হওয়ার কথা ছিল এক হাঁটুতে। অপারেশনের আগে এমআরআই দেখে ডাক্তার বলল, ওর তো অন্য হাঁটুর অবস্থা বেশি খারাপ! এর আগে ভারতে যে অপারেশন হয়েছিল ওর, সেখানে ডাক্তার একটু বড় মাপের স্ক্রু লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ইয়াং দুই হাঁটুতেই অপারেশন করতে চান!”

“আমি তখন ঘামছি, এতবড় সিদ্ধান্ত! মাশরাফি তখন অলরেডি অপারেশন থিয়েটারে, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়েছে। বোর্ডের মাহবুব ভাইকে (এখন সহ-সভাপতি মাহবুব আনাম) ফোন করলাম। উনি বললেন, ‘তুমি যা ভালো বোঝো করো’। আমি পরে ভাবলাম যে এক হাঁটুতে করা মানেও শুয়ে থাকা, দুই হাঁটুতে করাও তাই। দুটিতেই করতে বললাম। সকাল বেলা মাশরাফি উঠে দুই পা-ই নড়াতে পারেনা। সে কী অবস্থা ওর!”

যথারীতি মাশরাফিকেও হাসপাতাল থেকে নিজের বাসায় নিয়ে এলেন বাবু। শুরু হলো আরেকটি লড়াই। এবার আরও কঠিন!

“মাশরাফির অবস্থা শরীফের চেয়েও খারাপ ছিল। দুই হাঁটুতেই অপারেশন। নড়তেও পারত না। ওকে কোলে করে টয়লেটে বসানো, নিয়ে আসা, কাপড় বদলে দেওয়া…সব আমরা করতাম। দুই সপ্তাহ পর ও খুব হোমসিক ফিল করতে শুরু করল, দেশে ফিরে আসতে চায়। তখন দেশ থেকে ওর বাবাকে আনা হলো মেলবোর্নে।”

মাশরাফিও সেই দফায় থাকলেন মাস তিনেক।

এবং আরও অনেকে!

“এরপর সেই যে শুরু হলো, চলতেই থাকল…!” বলতে বলতে হাসেন বাবু। সেই হাসিতে বিরক্তির ছাপ নেই, বরং তৃপ্তি আর ভালো লাগার প্রতিফলন।

মাশরাফির কদিন পরই গেলেন বাবুর বন্ধু হাবিবুল বাশার। সেই সময়ের বাংলাদেশ অধিনায়কের অস্ত্রোপচার ছিল বুড়ো আঙুলে। এরপর আরও ৪ দফায় গিয়েছেন মাশরাফি। শরীফ ও হাবিবুল ছাড়াও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনে নানা সময়ে বাবুর বাসাকে ঠিকানা বানিয়েছেন তামিম ইকবাল, নাজমুল হোসেন, দু দফায় আবুল হাসান রাজু। সবশেষ গত বিশ্বকাপের সময় এনামুল হক। বাবু অবশ্য ততদিনে মেলবোর্ন থেকে থিতু হয়েছে পার্থে। তবে এনামুলকে ঠিকই রেখেছিলেন মেলবোর্নে নিজের শ্বশুড়ের বাসায়।

বিসিবির আর্থিক দৈন্য দূর হয়েছে অনেক আগেই। মেলবোর্নে পাঁচ তারকা হোটেলে ক্রিকেটারদের লম্বা সময় রাখা এখন এমন কিছু নয় বোর্ডের জন্য। কিন্তু ক্রিকেটাররা চোখ বন্ধ করে বেছে নেন বাবুর বাসা, বোর্ডও আপত্তি করে না। কেন? একটু লজ্জা পেয়ে বাবু নিজেই বললেন কারণটা।

“আমি না থাকলে হয়ত ওরা হোটেলে থাকত, বা এখন থাকতে পারে। কিন্তু বাসার যত্ন ওরা হোটেলে পেত না, পাবে না। এজন্য সবসময়ই মনে হয়েছে এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব, ছেলেগুলোকে সম্ভব সেরা পরিবেশ দেওয়া।”

“দলের কেউ চোট পেলে, যখন মিডিয়ায় দেখতাম যে সার্জারি লাগবে, তখনই আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যেতাম। জানতাম যে দেশ থেকে ফোনকল পাবো। আমি জানি যে নেক্সট স্টেপটা কি, ডেভিড ইয়াংকে কল করতে হবে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে, কি কি করতে হবে সব আমার জানা। ইয়াংও আমার এসএমএস পাওয়া মাত্র দুনিয়ার যে প্রান্তে থাকুক, সম্ভব কম সময়ে চলে আসবে।”

বাবু কাজ করেন অস্ট্রেলিয়ান ট্রেড কমিশনের ইন্টারন্যাশনাল হেলথে। তার একটি সেক্টর স্পোর্টস হেলথ। সেই সূত্রেই পরিচয় অন্যতম সেরা অর্থোপেডিক সার্জন ডেভিড ইয়াংয়ের সঙ্গে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামলানোর পথচলায় আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে দুজনের সম্পর্ক। ইয়াং নিজেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের বন্ধু, অনুসারী।

নি:স্বার্থ ভালোবাসা

ছেলেবেলা থেকেই দুরন্ত মাশরাফি। ছুটোছুটি-লাফালাফি করে, চিত্রা নদীতে দাপাদাপি করে কাটত সময়। বন্ধুদের বিশাল বহর ছাড়া চলতে পারেন না এক কদম। সেই ছেলেটিই বন্দি বিছানায়। বাবু জানতেন সবই। প্রাণবন্ত মাশরাফিকে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে দেখতে চাননি তিনি।

“ওর যাতে খারাপ না লাগে, সেজন্য সব চেষ্টাই করতাম। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আসা, নানা ভাবে সঙ্গ দেওয়া, মানসিকভাবে চাঙা করা। ফোন কার্ড কিনে দিতাম, দেশে নানা জনের সঙ্গে কথা বলত। সিনেমা নিয়ে আসতাম।, হই-হল্লা করতাম, প্রায়ই বন্ধুদের ডেকে নিয়ে আসতাম আড্ডা দেওয়ার জন্য। যতভাবে পারা যায়, মজা করতাম।”
মাশরাফি একটু বেশিই আড্ডাপ্রিয়, মজাপ্রিয় বলে তার জন্য এত আয়োজন। তবে গল্পটা হাবিবুল বা তামিম, বা সবার জন্যই কম-বেশি একই। ক্রিকেটারদের অপারেশন পরবর্তী যন্ত্রণার দিনগুলো যতটা সম্ভব আনন্দময় করতে, কষ্টগুলি ভুলিয়ে দিতে সম্ভব সবকিছু করেছেন বাবু। ক্রিকেটারদের বেদনা সমানভাবে যেন ছুঁয়ে যায় তাকেও।

“সুমন (হাববুল) যে বার এল, ওর অপারেশনটা ছোট্ট ছিল, বুড়ো আঙুলে। তবে ওই ছিল সবচেয়ে ভীতু। ব্যথায় ওর যে কী কান্না! সপ্তাহ দুয়েক ছিল, তার পরও বউ-বাচ্চার জন্য কান্না…!”

“সবাই হয়ত জানতে পারে যে অমুক ক্রিকেটারের অপারেশন হলো, এতদিন লাগবে ফিরতে…ব্যস। কিন্তু ওই সময়টায় ক্রিকেটারদের যে কতটা মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। অপারেশনের ব্যথা, মাঠের বাইরে থাকার কষ্ট, আপনজন থেকে দূরে। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের ধরণটা এরকম যে সামান্য জ্বর হলেও আপনজনদের পাশে চাই। সেখানে এই বয়সের ছেলেগুলো একা একা এত কষ্ট করছে, সেই সময়টায় ওদের চাঙা রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমি চেষ্টা করেছি সাধ্যমত।”

নিজের ব্যস্ততার চাকরি, প্রবাস জীবনের হাজারটা ঝামেলা সামলে দিনের পর দিন ক্রিকেটারের সেবাযত্নে লেগে থাকার ব্যপারটি সহজ ছিল না। বাবু কখনও অসুস্থতার কথা বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন; কখনও তার বার্ষিক ছুটির অনেককটা দিন চলে গেছে মাশরাফি-তামিমদের পেছনে। নিজের অনেক কিছুর সঙ্গে আপোস করে, অনেক ঝামেলা সয়ে দিনের পর দিন ক্রিকেটারদের সেবা করে গেছেন ক্লান্তিহীনভাবে।

শুরুর কয়েক বছর বন্ধুদের নিয়ে বাবু সামলাতেন সব। পরে পাশে পেয়েছেন জীবনসঙ্গীকে। নিজের সংসারে বাইরের একজনের দিনের পর দিন থাকা, তাকে নিয়েই দিন-রাত ব্যস্ত থাকা, এ সবকে কখনোই বাড়তি ঝামেলা মনে করেননি বাবুর স্ত্রী। বরং স্বামীর চেয়ে বেশি উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাশরাফি-তামিমদের সেবায়। বাবু হাসতে হাসতে বলেন, “কেউ ইনজুরিতে পড়েছে খবর পেলেই বউকে বলতাম, ‘গেট রেডি!’ বউও মানসিকভাবে তৈরি হয়ে যেত!”

‘অতিমানব’ মাশরাফি

একেকটি চোট, অস্ত্রোপচার ও প্রবল দাপটে ফিরে আসা, ‘সংশপ্তক’ মাশরাফির গল্প শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেটে নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। মাশরাফির সেই লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছেন বাবু। বলা ভালো, সবচেয়ে কঠিন সময়টা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন তিনিই। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারকে চোটের সময় কাছ থেকে দেখেছেন, ডেভিড ইয়াংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আর স্পোর্টস হেলথ তার নিজের পেশার একটি সেক্টর বলে, এসব সম্পর্কে জানাশোনার কমতি নেই বাবুর। জানেন বলেই বাবু বুঝতে পারেন, মাশরাফি কতটা আলাদা, কতটা ভিন্ন ধাতুতে গড়া।

“মাশরাফির মত আমি কাউকে দেখিনি, শুনিনি। অবিশ্বাস্য একটা চরিত্র সে। প্রথম অপারেশনের সময় বেশ ভীতু ছিল। বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে সেই ছেলেটিই ভীষণ শক্ত হয়ে উঠল।”

“দ্বিতীয় অপারেশনের পর ওর পা ফুলে যেত। মোটা ইনজেকশন দিয়ে রক্ত বের করতে হতো। আমি দেখে হার্টফেল করার মত অবস্থা। কিন্তু মাশরাফি নিজেই সেসব ভিডিও করত; চিন্তা করতে পারেন! ওর মতো মানুষ দেখি নাই। একটা মানুষের কতটুকু মানসিক দৃঢ়তা থাকলে এটা পারে!”

বাবু ক্রমেই বুঝতে পেরেছেন মাশরাফি আসলে আমাদের চেনা জগতের বাইরের কেউ বা কিছু!

“এক দিন আমরা খেলা দেখছি। বাংলাদেশের অবস্থা খারাপ। হঠাৎ মাশরাফি বলল, ‘বাবু ভাই, সবচেয়ে বেশি কষ্ট কিসে জানেন?’ আমি ভাবলাম হয়ত ফোলা বা ব্যথার কথা বলবে। ও বললো, ‘এই যে খেলতে পারছি না! আমি এখন থাকলে হয়ত দলের এই অবস্থা হতো না’।”

“ভেবে দেখুন, খেলাটার প্রতি, নিজের দেশের প্রতি কতটা মমত্ব থাকলে নিজের ওই অবস্থায় এমনটা ভাবতে পারে! প্রতিটি অপারেশনের পর দেখা যেত ওর অবস্থা খারাপ। কিন্তু সবসময়ই বলতো, ‘আমি মাঠে ফিরবই।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একবার ইনজুরিতে পড়ল সম্ভবত নাসের হুসেইনকে বল করতে গিয়ে। আমাকে বলল, ‘আমি আবার ওকেই বল করব।”

“ডা. ডেভিড ইয়াং অনেকবার বলেছেন, ক্রিকেট, ফুটবল, রাগবি, রুলস ফুটবলসহ বিশ্বের অনেক খেলার নামকরা অনেক ক্রীড়াবিদকে উনি দেখেছেন, চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু মাশরাফির মত এতটা শক্ত মানসিকতার আর কাউকে দেখেননি। মাশরাফি আসলে একটা অতিমানব।”

বাবু অবিশ্বাস্য: হাবিবুল

ছেলেবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, হাবিবুল বাশার খুব ভালো করে চেনেন-জানেন বাবুকে। সাবেক অধিনায়ক ও এখনকার নির্বাচক তারপরও প্রিয় বন্ধুকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের আপনজন হিসেবে। হাবিবুল শোনাচ্ছেন সেই গল্প।

“বিদেশে গেলে একজন হেল্পিং হ্যান্ড লাগেই। বিশেষ করে যখন আমরা সার্জারির প্রয়োজনে যাই। সার্জারি মানে কিন্তু শুধু অপারেশন থিয়েটার নয়, আগে-পরেই থাকে বেশি কাজ। পেইন ম্যানেজমেন্ট করা, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া…সবকিছু ঠিকঠাক মেইনটেইন করা। সার্জারির পর কেয়ার করায় অনেক সময় দিতে হয়। আত্মরিকতা দিয়ে পাশে থাকতে হয়। বাবু সব করে।”

“সেই সময়টায় বাবু যেভাবে সাপোর্ট দেয়, সেটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। এমন সব মানুষের জন্য করে, যাদের সঙ্গে ওর এমন কোনো সম্পর্ক নেই, পরিচয় নেই। কিন্তু ও সেসব ভাবেই না। সে শুধু ক্রিকেটারদের পাশে থাকতে চায়।”

“২০০৪ সালে আমার অপারেশনটা খুব ছোট ছিল। তার পরও অনেক ব্যথা ছিল। আমি তো বসে বসে কাঁদতাম। বাবু আমার পাশে বসে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নানাভাবে চিয়ার আপ করার চেষ্টা করত।”

“আমি না হয় বন্ধু, আমার জন্য করতেই পারে। কিন্তু বাকি ছেলেদের জন্য যেভাবে যা করে, সেটা আসলে অবিশ্বাস্য। আমরাই মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করি, তুই কিভাবে এতটা করিস! কিন্তু ব্যাপার হলো, সে এসব আলাদা করে বড় কিছু মনেই করে না। নিজের মনে করেই সবার জন্য করে।”

“মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো, কিছু করলে কিছু পেতে চায়। কিন্তু বাবুর ব্যাপারে আমি এটা দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, সে এত কিছু করে আমাদের ক্রিকেটারদের জন্য, বিনিময়ে কখনোই কিছু চায়নি। এমনকি দেশে থাকলে খেলা দেখার টিকেটের জন্য আমার কাছে ঘোরাঘুরি করে। অথচ বাংলাদেশের ক্রিকেটে ওর যে অবদান, এসব সে এমনিতেই পেতে পারে। ও কিছু চায় না।”

‘অমূল্য অবদান’
চিকিৎসা-অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনেই পাঁচবার বাবুর আতিথ্য নিয়েছেন মাশরাফি। যোগাযোগ হয় প্রতিনিয়ত। ক্রিকেট-ক্রিকেটার, রোগির সেবা বা দায়িত্ব-কর্তব্য ছাড়িয়ে মাশরাফির সঙ্গে বাবুর সম্পর্কটি অনেক আগেই ছুঁয়েছে জীবনের সীমানা।

“বাবু ভাইকে নিয়ে বলে শেষ করা যাবে না। আমার আপন বড় ভাইয়ের মত। বা তার চেয়েও বেশি কিছু। অস্ট্রেলিয়া গিয়ে উনার কাছে থাকার মাধ্যমে সম্পর্কের শুরু। দিনের পর দিন সম্পর্কটা সেখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গেছে। জীবনের অনেক কিছুই উনার সঙ্গে শেয়ার করি। এখন উনি আমার চোখের দিকে, আমি তার দিকে তাকালেই বুঝতে পারি কে কি বলতে যাচ্ছি।”

“আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের পেছনে আমার বাবা-মা, স্বজনদের যতটা অবদান, বা ক্রিকেটের ক্ষেত্রে আমার কাছের যারা, সবসময়ই নানাভাবে থাকছেন পাশে, তাদের যতটা অবদান, ততটা অবদান বাবু ভাইয়েরও। আমার ক্যারিয়ার ও জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো উনি সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন এবং সামলেছেন, যেটা আমার বাবা-মাও দেখেননি।”

“সেই পরিস্থিতিগুলোও কেমন, রাত দুটোর সময় হয়ত পায়ে ব্যথা শুরু হয়েছে। উনি ভোর ৫টাতেই আমাকে নিয়ে ছুটেছেন ডাক্তারের কাছে। উনার কাজ ফেলে, ছেলেকে বেবিসিটারের কাছে ফেলে আমার সঙ্গে লেগে থেকেছেন। কোলে করে আমাকে বিছানা থেকে নামাতেন, গাড়িতে তুলে দিতেন, নামাতেন। বাথরুমে যেতে পারতাম না। উনি কোলে করে নিয়ে বসিতে দিতেন, আবার বের করতেন।”

“দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থাকার দিনগুলোতে আমার যেন খারাপ না লাগে, এজন্য সবকিছু করেছেন। অফিস ফেলে বা ফাঁকি দিয়ে, অন্য সব কিছু ফেলে আমার সঙ্গে লেগে থাকতেন। এক সময় যখন অফিসে না যাওয়ার আর উপায় ছিল না, তখন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। উনার অফিসের পাশে একটা রুম ছিল। আমাকে সেই রুমে রাখতেন। টিভি ভিসিডি ছিল, প্রতিদিনই রাজ্যের সব সিনেমা এনে রাখতেন। আমি দেখতাম।”

“একবার ডাক্তার বললেন, অপারেশনের দুই দিন পর থেকে সাইক্লিং শুরু করবে। ডাক্তার সকালে বলেছেন, উনি বিকেলেই সাইকেল নিয়ে হাজির। সময় কাটানোর জন্য ক্যারম বোর্ড কিনে এনেছেন। আমি আড্ডা দিতে পছন্দ করি। উনি উনার সার্কেলের সবাইকে ধরে এনেছেন আড্ডা দিতে। আমাকে একটু ভালো রাখার জন্য সম্ভব সব কিছুই করেছেন।”

“আমার ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার জন্য উনার অবদান বলে শেষ করা যাবে না। হয়ত বারবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আমি কোথাও না কোথাও থাকতাম ঠিকই। তবে আমি যে উৎফুল্লতা নিয়ে থেকেছি, নিশ্চিন্তে থাকতে পেরেছি, এটা উনার কাছে না থাকলে হতো না। মনে হতো আপন কারও কাছেই আছি। আমার একটা মানসিক ব্যাপার আছে, যেখানে বুঝতে পারি যে ততটা আন্তরিকতা নেই, সেখানে থাকতে পারি না। বাবু ভাই আমাকে সেই স্বস্তির জায়গাটা দিয়েছেন।”

“শুধু বাবু ভাইয়ের কথা বললে অন্যায় হবে। ভাবি আরও তিন গুণ বেশি ভালো। বাবু ভাইয়ের বিয়ের পর আমি অস্ট্রেলিয়া গেলাম চেক আপের জন্য। সেবার গিয়ে শুরুতে আর উনার কাছে উঠিনি, হোটেলে উঠেছিলাম। ভাবলাম নতুন জীবন তার। পরে ভাবি এসেই আমাকে নিয়ে গেলেন। দেখলাম অন্যরকম আন্তরিকতা।”

“ভাবি অসাধারণ অমায়িক একজন। আমার জন্য তিনিও কম করেননি। ভোর ৫টায় অফিসের জন্য বের হয়ে সন্ধ্যা ৭টায় ফিরে কাপড় বদলেই আমার যত্নে লেগে যেতেন। উনারা আসলে তুলনাহীন। এছাড়াও বাবু ভাইয়ের বন্ধু মতিন ভাই, শণক দা, ইকবাল ভাই, উনাদের সবার নামই বলা উচিত।”

“বাংলাদেশ ক্রিকেটে উনার অনেক বড় অবদান। একদম সরাসরি বললে অনেক অনেক টাকা বেঁচেছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো ব্যয়বহুল জায়গায় একটা লম্বা সময় থাকা-খাওয়া, ট্যাক্সি সার্ভিস, সেবা-যত্নের জন্য লোক রাখা এসব অনেক টাকার ব্যাপার। বাবু ভাই না থাকলে ক্রিকেটারের সঙ্গে অন্তত একজনকে পাঠাতে হতো, সেটাও প্রয়োজন পড়েনি।”

“টাকার চেয়ে বড় হলো উনাদের আন্তরিকতা, যত্ন, ভালোবাসা। এই যে আজও শরীফ খেলে যাচ্ছে, তিনশ ফার্স্ট ক্লাস উইকেট নিয়েছে, বাবু ভাই না থাকলে হয়ত অনেক আগেই ক্যারিয়ার শেষ হতে পারত।”

“বলতে পারেন, উনি তো সরাসরি ক্রিকেটে অবদান রাখেননি। কিন্তু যতজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার বাঁচাতে বাবু ভাই সরাসরি অবদান রেখেছেন, সেটা কোনো মূল্য দিয়েই বিচার করতে পারবেন না।”

‘প্রকৃত বন্ধু’
“এই যে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এত কিছু করে আসছেন, কেন করছেন?”

প্রশ্ন শুনে যেন অথৈ জলে পড়ে গেলেন বাবু। হয়তো কখনো এভাবে ভাবেনওনি। খানিকটা ভাবলেন; প্রশ্নের উত্তর নয়, বরং ভাষা দেওয়ার চেষ্টা করলেন নিজের অনুভূতিগুলোকে।

“আমার কাছে এতটুকু করতে পারা একটা বড় সম্মান। এই ছেলেগুলো দেশের ক্রিকেটের জন্য খেলে, ওদের জন্য কিছু করতে পারা মানে দেশের জন্য কিছু হলেও করতে পারা। এটা অন্যরকম অনুভূতি।”

“আমার কাছে থেকে, কিছুটা যত্ন পেয়ে যখন ছেলেগুলো আবার মাঠে ফিরে, সেটা দেখার যে অনুভূতি, এটা বলে বোঝানোর জন্য। আমি তো মাঠে খেলতে পারি না বা ক্রিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। তবু মনে হয় যে কিছু একটা করতে পেরেছি। বড় নয়, তবে সামান্য হলেও পেরেছি!”

এত কিছুর বিনিময়ে কিন্তু কখনাই কিছু চাননি বাবু। পাদপ্রদীপের আলোয় কখনোই আসতে চান না। কোনো স্বীকৃতি বা তেমন কিছু তো বহু দূর, ক্রিকেটারদের বা বিসিবির কাছে কখনও তার কোনো দাবি বা চাওয়া নেই। দেশে আসলে খেলার টিকেটের জন্য হাবিবুল বা সানোয়ারদের কাছে ঘুরঘুর করেন, সেটা বন্ধু বলেই। কখনোই বিসিবির কাছে চান না।

“ওদের (ক্রিকেটারদের) কাছ থেকে যে সম্মান ও ভালোবাসা পাই, সেটা তো অনেক বড় প্রাপ্তি। একটা নতুন ছেলে বা আমার সঙ্গে পরিচয় নেই, এমন অনেক ছেলেই আমাকে আপন বলে ভাবে। দেখা-পরিচয় হলে পরম আন্তরিকতায় কথা বলে। ওদের সবার কাছ থেকে যে ভালোবাসা পাই, সেটা অকল্পনীয়।”

মাশরাফির ছোটখাটো কোনো সমস্যা হলেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন বাবুকে। ডাক্তার-ফিজিওর চেয়ে বাবুর ওপর তার আস্থা কোনো অংশে কম নয়।

“পাগলা (মাশরাফি) তো ছোট একটা ব্যথা পেলেও আমাকে ফোন করে। আমি কিছু বললে তবেই শান্তি পায়। আবার একটু সিরিয়াস কিছু হলে আমি ডেভিড ইয়াংকে জানাই। ইয়াং কিছু বলে, সেটা ওকে জানাই।”

এসবই শুধু নয়। অস্ত্রোপচার-শুশ্রূষা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরও নানাভাবে ঋণে জড়িয়ে রাখছেন বাবু। মাশরাফির চালিকাশক্তি হয়ে থাকা নিক্যাপগুলো তিনিই পাঠান মেলবোর্ন থেকে। ভালো কোনো অনুশীলনের সরঞ্জাম, ওষুধপত্র বা জরুরি প্রয়োজনীয় কিছু আনানো দরকার? জানাও বাবুকে, কাজ হয়ে যাবে! বিপিএলে দলগুলির অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার দরকার? জোগাড় করে দেবেন বাবু।

২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে ফেরার সময় বাংলাদেশ দল বিমানবন্দরে এসে বিপাকে পড়ল। নানারকম অনুশীলন সরঞ্জাম, ওষুধপত্র, টেপ-ব্যান্ডেজ মিলিয়ে অনুমোদিত ওজনের চেয়ে দেড়শ কেজি বেশি ওজন। উপায় কি? বাবু আছে না! সব ফেলে আসা হলো তার কাছে। তিনি সেসব আবার প্যাকেট করে কুরিয়ারে পাঠালেন দেশে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে এভাবেই তিনি আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। যদিও ক্রিকেটে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় বা পদবী; সে সব তিনি চানও না। তবু নিজের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে তার পরিচয় যদি খুঁজতে বলা হয়?

একটু ভেবে আবারও বাবুর মুখে লাজুক হাসি, “শেষ ভরসা বলতে পারেন…বাংলাদেশ ক্রিকেটের দুঃসময়ের ভরসা।”

কে না জানে, দুঃসময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু!

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View