Mountain View

লটারিতে মেতেছে মৌলভীবাজার মগ্ন খেটে খাওয়া দিনমজুরও

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৫, ২০১৬ at ১০:০৭ অপরাহ্ণ

lotari

ইমন খান, মৌলভীবাজার, বিডিটোয়েন্টিফোরটাইমস:  মাথাই নষ্ট মামা কিংবা ‘উঠাও বাচা নাড়িয়া ছাড়িয়া একটা।’ দিনের বেলায় মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় দেড় শতাধিক গাড়িতে মাইকযোগে এমন আওয়াজে জেলার ৭টি উপজেলায় বিক্রি হচ্ছে লটারি। আর রাত ১০টায় (এমসিএস) টেলিভিশন পর্দায় দেখছেন একই আওয়াজে নানা ভঙ্গিমার বর্ণনায় দিনের বেলায় ক্রয়কৃত লটারির ফলাফল।

রাত দিন লটারি কিনে লাখপতি হওয়ার এমন স্বপ্নে বিভোর এখন এ জেলার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। আজ লাগেনি লাগতে পারে কাল। নিজের ভাগ্যকে এমন পরীক্ষায় ফেলে প্রতিদিনই হতাশ হচ্ছেন তারা। আবারও সেই অবৈধ লটারির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন এ জেলার সাধারণ মানুষ।

গাড়ি দিয়ে মাইক যোগে জেলার নানা স্থানে ২০ টাকা মূল্যের লটারি বিক্রেতাদের নানা ভঙ্গিমায় হাঁকডাক আর ওই গাড়ির ওপরে রাখা পুরুস্কারের মোটরসাইকেল আকৃষ্ট করছে যে কাউকে। রিকশা ও ভ্যানযোগে মৌলভীবাজারে শহরের অলিগলিতে। আর সিনএনজি চালিত অটোরিকশা ও পিক্যাপ ভ্যানে শহরের বাহিরে উপজেলার শহরের গ্রাম গঞ্জ ও পাড়া মহল্লাতে।

একযোগে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলার পর বন্ধ হয় লটারি বিক্রি কার্যক্রম। এরপর ৭ উপজেলায় গাড়ি নিয়ে ছড়ি ছিটিয়ে লটারির টিকিট বিক্রেতারা জড়ো হন শহরের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে। বিক্রিকৃত লটারি কুপনের জমাকৃত লটারি স্তূপ থেকে ভাগ্যবান ৩০-৪০ জন খুঁজতে কাপড় দিয়ে শিশুর চোখ বেঁধে তার হাত দিয়ে ওখান থেকে উঠানো হয় লটারির কুপন।’

স্টেডিয়ামে লটারি বিক্রেতাদের তৈরি করা অস্থায়ী মঞ্চে এমন নানা রঙের টিকেটের নানা ঢঙে কৌতুকরসপূর্ণ বর্ণনায় স্থানীয় মৌলভীবাজার ক্যাবল সিস্টেম সার্ভিসের (এমসিএস) চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার হয় বিক্রিকৃত লটারি ফলাফল ঘোষণার কার্যক্রম। আর নিজের ভাগ্য যাচাই করতে প্রতিদিনের লটারি ক্রেতারা এসময় কাজ কর্ম বন্ধ রেখে টিকেট হাতে জটলা বেঁধে টেলিভিশনের সামনে বসে তা উপভোগ করেন।

প্রায় দুই সপ্তাহ থেকে চলা এমন লটারি ব্যবসায় জেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে লটারি ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিনই প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন রমরমা লটারি বাণিজ্য হলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসন রয়েছে নির্বিকার। লোভনীয় নানা পুরস্কার পাওয়ার নেশায় ফতুর হচ্ছেন নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন লটারির টাকা যোগানে তারা মরিয়া। একেকজন ১০ থেকে ১শ লটারিও কিনছেন। একদিন ১০টি কিনলে পরের দিন কিনছেন তার দ্বিগুণ। লটারি ক্রেতাদের মধ্যে চলছে এমন অদ্ভুত প্রতিযোগিতা।

এতে করে পুরো জেলায় চুরি ডাকাতি ছিনতাইসহ নানা অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জনগণ। জানা যায় মৌলভীবাজারের এম সাইফুর রহমান স্টেডিয়ামে আন্তঃকলেজ ফুটবল প্রতিযোগিতা উপলক্ষে ক্রীড়া উন্নয়নের নামে জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে দৈনিক আশার আলো র‍্যাফেল ড্র নামক ২০ টাকা মূল্যের লটারি।

লটারি ক্রেতাদের অভিযোগ প্রতিদিনই প্রায় ১২-১৫ লক্ষ টাকার লটারির টিকিট বিক্রি হলেও ১-২টি মোটরসাইকেল ছাড়া দায়সারা কয়েকটি পুরস্কার দিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণায় মাধ্যমে ওই চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অংকের টাকা।

লোভনীয় পুরুস্কারের আশায় লটারি ক্রয় করে নিঃস্ব হচ্ছে জেলার শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। লটারির টিকিট বিক্রির জন্য জেলার সবকটি উপজেলা শহরে দেড় শতাধিক গাড়ি মাইক যোগে লটারি বিক্রির কার্যক্রমে মারাত্মক শব্দ দূষণে অতিষ্ট শহরের জনজীবন। সামনে পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসিসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শ্রেণীর বার্ষিক ফাইনাল পরীক্ষা।

এরই মধ্যে প্রতিনিয়তই রাত দিন লটারী বিক্রেতাদের মাইকযোগে লটারি বিক্রির হাঁকডাক মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ উঠেছে লটারি বিক্রির কারণে স্টেডিয়াম এলাকার আশপাশে সন্ধ্যার পর থেকে উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকরা নেশা সেবন করে মাতলামি করে।

লটারী বিক্রি শুরু থেকেই ওখানে ওরা নিরাপদ মাদক সেবন ও বিক্রয় এলাকা হিসেবে বেঁচে নিয়েছে। লটারি বিক্রি শুরুর পর থেকে ওই এলাকার বাসিন্দারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন রয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে (সদ্য যোগদানকারী) জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান লটারি বিক্রির বিষয়টি তিনি জানার পর এ বিষয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদককের কাছে জানতে চাইলে তিনি তাকে অবগত করেছেন সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান থাকাকালীন সময়ে লটারি বিক্রির বিষয়ে নাকি একটি রেজুলেশন হয়েছিল। তিনি তাকে ওই নথিপত্রগুলো দেখানোর জন্য বলেছেন। জেলা প্রশাসক জানান বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View