ঢাকা : ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, শনিবার, ২:৫১ অপরাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই

f72055abc6bc15824595891af9438927-army

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে এমন এক মাত্রায় উঠেছে যে মনে হচ্ছে, এই বুঝি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এটা নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশি জনতার একটা অংশের মধ্যে বেশ কৌতূহল লক্ষ করা যাচ্ছে। যেন ক্রিকেটের এক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই কেউ কেউ ভারতবিদ্বেষী ও পাকিস্তানবিদ্বেষী তালি বাজাতে লেগেছে। অনেকে এর সঙ্গে বাংলাদেশকেও টেনে আনার চেষ্টা করছে। কদিন আগে আমাদের রৌমারী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে এক বাংলাদেশি নাগরিক মারা গেলে ফেসবুকে কেউ কেউ তির্যক ভাষায় লিখলেন, ভারতীয়রা পাকিস্তানিদের কাছে মার খেয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে বাংলাদেশিদের ওপর। আরও নানা রকমের বালখিল্য কথাবার্তার মধ্য দিয়ে যেসব মনোভাবের প্রকাশ ঘটছে, তাতে যুক্তি-বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনার স্বাক্ষর নেই। আছে সংকীর্ণ জাত্যভিমান, পরশ্রীকাতরতা এবং পৃথিবীটাকে শুধু শত্রু ও মিত্রে বিভক্ত করে দেখার মানসিকতা। কোনো দায়িত্বশীল ও বিবেচক সমাজের শিক্ষিত নাগরিকদের মানসিকতা এ রকম হয় না।

দক্ষিণ এশিয়ার দুর্ভাগ্য, প্রায় ১৭৫ কোটি মানুষের এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই পাকিস্তান ভারতকে শত্রুজ্ঞান করে এসেছে, ভারতও পাকিস্তানকে কখনো বন্ধু মনে করেনি। তারা সব সময় পরস্পরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে এসেছে। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে উভয় পক্ষের লাভবান হওয়ার চেষ্টা না করে তারা বৈরিতাকেই তাদের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতির প্রধান অগ্রাধিকার করেছে। শুধু এ কারণেই তারা তাদের সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে চলেছে। তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু এমন কিছু ধনী দেশ তারা নয়; তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের তুলনায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যয় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি। অথচ উভয় দেশেই কোটি কোটি শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, শিশুমৃত্যু ও প্রসূতিমৃত্যুর হার আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর প্রায় কাছাকাছি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই এমন মানুষের সংখ্যাও পৃথিবীর অন্য অনেক এলাকার তুলনায় বেশি।

সব মিলিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধপ্রস্তুতি তাদের নিজ নিজ জনগণের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।

১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মোট চারবার যুদ্ধ হয়েছে। সব যুদ্ধেই ক্ষতি হয়েছে উভয় পক্ষের, কারও কোনো লাভ হয়নি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ হয়েছে। পাকিস্তান তার পূর্বাংশের ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার চিরতরে হারিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের সেই হারানো ভূখণ্ডটি ভারত পায়নি। এই ভূখণ্ড তারপর থেকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে ভারতের পাকিস্তান ভাঙার খায়েশ পূর্ণ হয়েছে—এমন কথা পাকিস্তানিরা বলে। তারা কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হারানোর প্রতিশোধ নিতে চায়—এমন কথাও হরহামেশাই শোনা যায়।

কিন্তু এগুলো কোনো কাজের কথা নয়। আসলে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিকভাবে লাভবান হওয়ার কিছু নেই। উভয় দেশ এখন পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের মালিক। পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একবার যুদ্ধ হয়েছে। ১৯৯৯ সালের মে-জুলাই মাসে সংঘটিত সেই কারগিল যুদ্ধই এ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভারের মালিক দুটি দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের প্রথম দৃষ্টান্ত। যুদ্ধবিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ লিখেছেন, কারগিল যুদ্ধের ‘পারমাণবিক পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার অত্যন্ত বাস্তব ঝুঁকি’ ছিল। সেই ঝুঁকি দূর হওয়ার কোনো কারণ ঘটেনি। আসলে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধে সেসব অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি সব সময়ই থেকে যায়। কোনো পক্ষের লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে না।

অবশ্য সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের ফলে উভয় পক্ষের কিছু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর লাভ হয়। প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক সরকারের নির্ভরশীলতা বাড়ে, বাড়ে প্রতিরক্ষা বাজেট। আমি একবার ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরিতার অবসান কেন ঘটে না? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, অবসান ঘটে না, কারণ ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই এমন কিছু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আছে, যারা বৈরিতা টিকিয়ে রেখে লাভবান হয়। তা ছাড়া ভারতে পাকিস্তানবিদ্বেষ আর পাকিস্তানে ভারতবিদ্বেষ রাজনৈতিক স্বার্থেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়।

আসলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনার প্রশমন ঘটাতে পারে উভয় দেশের নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সমাজ—এককথায় সর্বস্তরের জনসাধারণ। তাদের উচিত যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে আন্দোলন শুরু করা, নিজ নিজ সরকারকে জানিয়ে দেওয়া যে তাঁরা যুদ্ধ চান না। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। উভয় দেশের সংবাদমাধ্যম নিজ নিজ সরকারের পক্ষে বাগ্‌যুদ্ধে ইন্ধন জোগাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেলে বিশ্বের কোন দেশ কার পক্ষ নেবে—এসব জল্পনা-কল্পনাও উৎসাহের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে।
আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি সম্প্রতি ভারত সফরে গেলে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় সাংবাদিকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান কী? উত্তরে তিনি তাঁদের বলেছেন, ‘ভারত যখন আক্রান্ত হবে, তখন নিশ্চয়ই আমরা ভারতের সঙ্গে থাকব।’ দেশে ফিরে আসার পরে আমাদের সাংবাদিকদের কাছেও তিনি এ কথা বলেছেন।

প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত ছিল কূটনৈতিক পন্থায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া। তিনি বলতে পারতেন, বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। তিনি বলতে পারতেন, দিল্লি ও ইসলামাবাদ আলোচনায় বসে উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুক।

আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল চেতনা হলো, আমরা সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না। আমাদের সংবিধানের ২৫(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা—এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি।’
ভারত ও পাকিস্তানের সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, উত্তেজনা প্রশমনের জন্য আলোচনায় বসুন। উভয় দেশের জনগণের প্রতি আমাদের আহ্বান, আপনারা নিজ নিজ সরকারকে যুদ্ধংদেহী মনোভাব পরিত্যাগে বাধ্য করুন। দক্ষিণ এশিয়া আর কোনো যুদ্ধ সইতে চায় না। বাংলাদেশ আপনাদের পাশে আছে। আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে চাল আর কলা নেবে

বাংলাদেশ থেকে চাল আর কলা নেবে মালয়েশিয়া। গতকাল শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) পুত্রাজায়ায় এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে …

Mountain View

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *