অর্ধশতকের যুদ্ধের অবসানচেষ্টায় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের নোবেল

colombianpresidentjuanmanuelsantosপাঁচ দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে ফার্ক গেরিলাদের সঙ্গে কলম্বিয়া সরকারের করা ‘ঐতিহাসিক’ শান্তিচুক্তি গণভোটে প্রত‌্যাখ‌্যাত হলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস।

নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পঞ্চম কাচি কুলমান শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে চলতি বছরের পুরস্কার ঘোষণা করে বলেন, ৫২ বছরের যে যুদ্ধ অন্তত দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে, সেই যুদ্ধের অবসানে ‘দৃঢ় অবস্থানের জন‌্য’ প্রেসিডেন্ট সান্তোসকে দেওয়া হচ্ছে এ পুরস্কার।

বিবিসি জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সান্তোস (৬৫) তার এ পুরস্কারকে উৎসর্গ করেছেন কলম্বিয়ার দীর্ঘ যুদ্ধে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষের প্রতি। বলেছেন, শান্তি সন্নিকটে, শান্তি সম্ভব। পুরো জাতিকে নিয়ে তিনি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তুলবেন।

শান্তি চুক্তির অপরপক্ষ বামপন্থি গেরিলা দল দ্য রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (ফার্ক) নেতা রডরিগো লনডনোকে (যিনি তিমোশেনকো নামে বেশি পরিচিত) এ পুরস্কারে অন্তর্ভুক্ত করেনি নোবেল কমিটি।

প্রেসিডেন্ট সান্তোসকে অভিনন্দন জানিয়ে তিমোশেনকো এক টুইটে বলেছেন, কেবল একটি পুরস্কারই তারা প্রত‌্যাশা করেন। তারা চান, কলম্বিয়ায় সামাজিক ন‌্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে; যেখানে কোনো প‌্যারামিলিটারি বাহিনীর দাপট থাকবে না, প্রতিশোধ থাকবে না, মিথ‌্যা থাকবে না; রাজপথে থাকবে শান্তি।

কিউবা আর নরওয়ের মধ‌্যস্থতায়, ভেনেজুয়েলা ও চিলির সহযোগিতায় চার বছর আলোচনার পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর ফার্ক নেতা তিমোশেনকো ও কলম্বিয়ার মধ্য-ডানপন্থি সরকারের প্রধান হুয়ান সান্তোস ওই চুক্তিতে সই করেন।

কিন্তু এক সপ্তাহের মাথায় ২ অক্টোবর কলম্বিয়ার জনগণ ঐতিহাসিক ওই চুক্তি প্রত‌্যাখ‌্যান করে; চুক্তির বিপক্ষে পড়ে ৫০.২৪ শতাংশ ভোট।

সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে নোবেল কমিটি বলেছে, বিপক্ষে ভোট দেওয়ার মানে শান্তির বিরোধিতা করা নয়। যারা বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন, তারা অন‌্য কোনো চুক্তি চান।

“প্রেসিডেন্ট সান্তোস এখন শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর সংলাপের উদ‌্যোগ নিচ্ছেন। আর এ বিষয়টিকেই নোবেল কমিটি গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি যারা ওই শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করেছে, তাদেরকেও এই সংলাপে স্বাগত জানানো হয়েছে। নোবেল কমিটি আশা করছে, সব পক্ষ তাদের দায়িত্ব পালন করবে এবং গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসন্ন শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে,” বলেন কাচি কুলমান।

# ১৯৫১ সালের ১০ অগাস্ট বোগোটার এক প্রভাবশালী পরিবারে জন্ম।

# সান্তোসের পূর্বসূরি আলভারো উরিবে ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে অবিরাম লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৬ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সান্তোস ছিলেন সেই সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

# প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে সান্তোসের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ফার্ক গেরিলাদের হাতে অপহৃত একজন জ‌্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও তিন মার্কিন নাগরিক মুক্তি পায়। গেরিলাদের বিপক্ষে বেশ কয়েকটি অভিযানে সাফল‌্য পায় কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী।

# কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনী বেসামরিক মানুষ হত্যা করে তাদের বিদ্রোহী বলে চালাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠায় কেলেঙ্কারির মধ‌্যে ২০০৯ সালে উরিবের শাসনের অবসান হয়। পরের বছর কলম্বিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট হন সান্তোস।

# প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পূর্বসূরির নীতি থেকে সরে আসেন সান্তোস। ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকারের সঙ্গে বৈরীতার অবসান ঘটান।

# কিউবার মধ‌্যস্থতায় ২০১২ সালে ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে গোপনে শান্তি আলোচনা চালানোর কথা প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট সান্তোস। এই অবস্থান বদলে কয়েকজন মিত্রকে হারাতে হয় তার।

# শান্তিচুক্তি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন সান্তোস।

তথ‌্যসূত্র: বিবিসি

মধ‌্য-ডান সরকারকে উৎখাত করে মার্কসবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ‌্য নিয়ে ১৯৬৪ সালে ম‌্যানুয়েল মারুলান্ডার নেতৃত্বে গঠিত হয় দ্য রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া, সংক্ষেপে ফার্ক। দুই বছর পর তারা কমিউনিস্ট পার্টি অব কলম্বিয়ার সামরিক শাখা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

শুরুতে তেমন জোর না থাকলেও ১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে মাদক চোরাকারবারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে গেরিলা দলটি। নিজেদের সেরা সময়ে তারাই ছিল লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় ও সুসজ্জিত গেরিলা বাহিনী।

১৯৭৭ সালে ফার্ক যোদ্ধারা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি মিশনের তিন স্বেচ্ছাসেবীকে অপহরণ করে। আড়াই লাখ ডলার মুক্তিপণের বিনিময়ে তিন বছর পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার পর ১৯৮৪ সালে অস্ত্রবিরতিতে গেলেও পরের বছর কলম্বিয়ায় বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় ফার্ক গেরিলারা। তাদের চাঁদাবাজির কারণে তেল কোম্পানি শেল কলম্বিয়ার মাগালেয়া এলাকা থেকে ব‌্যবসা গুটিয়ে নেয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এক প্রার্থী খুন হওয়ার পর সরকারের সঙ্গে ফার্কের অস্ত্র্রবিরতির অবসান ঘটে।

১৯৯১ সালে দ্বিতীয় দফায় শান্তি আলোচনা শুরু হলেও এক বছরের মধ‌্যে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালে ফার্ক কলম্বিয়া সেনাবাহিনীর ৬০ জন সদস‌্যকে অপহরণ করে। ১৯৯৯ সালে ফের আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ২০০২ সালে ফার্ক গেরিলারা তখনকার প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস পাস্ত্রানাসহ ২৪ জন আরোহীকে বহনকারী অভ‌্যন্তরীণ রুটের একটি বিমান ছিনতাই করলে সেই আলোচনারও অবসান ঘটে।
অপহরণ করে। ছয় বছর পর আরও ১৪ জন জিম্মিসহ তাকে উদ্ধার করে কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী।

২০০৩ সালে বোগোটার একটি ক্লাবে ফার্ম গেরিলাদের হামলায় ৩৬ জনের মৃত‌্যু হয়। ২০০৫ সালে একটি নৌ ঘাঁটিতে তাদের হামলায় নিহত হয় ১৬ জন। কিন্তু এরপর শুরু হয় তাদের পিছু হটার পর্ব।

২০০৮ সালে ফার্ক প্রতিষ্ঠাতা ম‌্যানুয়েল মারুলান্ডা হৃদরোগে মারা গেলে নেতৃত্বে আসেন আলফানসো কানো। ২০১১ সালে সেনাবাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন। এরপর ফার্কের দায়িত্ব নেন বর্তমান প্রধান তিমোশেঙ্কো।

এক বছরের মাথায় সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সালে মাদকের কারবার থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয় ফার্ক।

ধাপে ধাপে অগ্রগতির পর চলতি বছর জুনে আসে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা; সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট সান্তোসের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে সই করেন ফার্ক নেতা তিমোশেনকো, যার মধ‌্য দিয়ে ৫২ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটে।

এই শান্তি চুক্তির যারা বিরোধিতা করছেন, তাদের নেতৃত্বে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আলভারো উরিবে। তার ভাষায়, এই চুক্তি অনেক বেশি গেরিলাদের পক্ষে গেছে।

শান্তি চুক্তিতে বলা হয়, দীর্ঘ সংঘাতের দিনগুলোতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন‌্য বিশেষ ট্রাইব‌্যুনাল গঠন করা হবে। যারা অপরাধ স্বীকার করে নেবে, তাদের লঘুদণ্ড হবে, জেল খাটতে হবে না।

২০১৮ ও ২০২২ সালে কলম্বিয়ার নির্বাচনে কংগ্রেসের দশটি আসনের নিশ্চয়তাও ফার্ককে দেওয়া হয়েছে চুক্তিতে।

গণভোটে কলম্বিয়ার জনগণ ওই চুক্তিকে ‘না’ বলে দিলেও প্রেসিডেন্ট সান্তোস শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারের কথা বলেছেন। ফার্কের সঙ্গে আলোচনার জন‌্য সরকারি প্রতিনিধিরা এরইমধ‌্যে কিউবার রাজধানী হাভানায় ফিরে গেছেন।

পুরস্কারের ঘোষণার পর টেলিফোনে নোবেল কমিটিকে সান্তোস বলেন, “এই খবরে আমি আবেগ ধরে রাখতে পারছি না। এটা এমন এক খবর যা আমার দেশের জন‌্য, আমার দেশের ‍যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত মানুষের জন‌্য চিরদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে থাকবে।”

তবে ‘বিভেদ ভুলে ঐক‌্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন’ আর ‘যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন‌্য সুবিচার নিশ্চিত করা’- এই দুইয়ের মধ‌্যে ভারসাম‌্য খোঁজার চেষ্টা যে একটি বড় চ‌্যালেঞ্জ হবে, নোবেল কমিটিও তা স্বীকার করেছে।

নোবেল কমিটি বলেছে, “কলম্বিয়ার সংঘাত আধুনিক সময়ের অন‌্যতম দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ঘটনা। দুই আমেরিকার মধ‌্যে কেবল কলম্বিয়াতেই এতোদিন সশস্ত্র সংঘাত জিইয়ে ছিল। নোবেল কমিটি বিশ্বাস করে, গণভোটের রায় বিপক্ষে গেলেও প্রেসিডেন্ট সান্তোস সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পেরেছেন।”

শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার এই প্রচেষ্টা আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেলের উইলে বর্ণিত পুরস্কারের যোগ‌্যতার সঙ্গে সামঞ্জস‌্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন নোবেল কমিটির প্রধান।

>> এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নের তালিকায় রেকর্ড ২২৮ জন ব্যক্তি ও ১৪৮টি সংগঠনের নাম জমা পড়ে।

>> সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল সিরিয়ার উদ্ধারকর্মীদের দল ‘হোয়াইট হেলমেটস’, ইরানের পরমাণু চুক্তি এবং অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়া গ্রিক দ্বিপ লেসবস।

>> এছাড়া জার্মানির চ‌্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল, পোপ ফ্রান্সিস এবং ফার্ক নেতা তিমোশেঙ্কোর নামও ছিল মনোনয়নের তালিকায়।

পুরস্কার বাবদ একটি সোনার মেডেল ও ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার) পাবেন প্রেসিডেন্ট সান্তোস। আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে এ পুরস্কার।

‘জেসমিন বিপ্লবের’ পর গৃহযুদ্ধের দুয়ারে থাকা তিউনিসিয়াকে শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংলাপের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে গতবছর শান্তিতে নোবেল পায় আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী চার সংগঠন।

তিউনিসিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী সেই চার সংগঠন হল- তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (ইউজিআইটি); দি তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডিক্র্যাফটস (ইউটিআইসিএ); তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগ (এলটিডিএইচ) এবং তিউনিসিয়ান অর্ডার অব ল’ইয়ারস।

এ সম্পর্কিত আরও

Leave a Reply