Mountain View

বরইতলা গণহত্যা দিবস আজ

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৩, ২০১৬ at ১২:৪৭ অপরাহ্ণ

baroitolaআজ ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের বরইতলা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে কিশোরগঞ্জে সংগঠিত হয় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। সদর উপজেলার বরইতলা গ্রামে পাকিস্তানিবাহিনী একসঙ্গে হত্যা করে ৩৬৫ জন নিরীহ মানুষকে। সেই ভয়াল দিনটির স্মৃতিচারণ করে আজও শিউরে ওঠেন এলাকার প্রবীণরা। দেশের জন্য জীবন দিলেও, ওইসব হতভাগ্য লোকজন স্বাধীনতার অনেক বছর পরও পাননি শহীদের মর্যাদা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বজনদেরও দেওয়া হয়নি কোনও স্বান্তনা। শহীদদের স্মরণে এলাকায় একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হলেও,অযন্ত ও অবহেলায় সেটিও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব এ বঙ্গে ! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে’- স্মৃতিসৌধের ফলকে খোদাই করা কবিতার এ দুটি লাইন, বেদনাময় সেই রক্তাক্ত দিনটির কথা মনে করিয়ে দেয়। একাত্তরের ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের বড়ইতলা গ্রামে পাকিস্তানিবাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের মদদে নির্মমভাবে হত্যা করে কয়েকশ গ্রামবাসীকে। স্মৃতিস্তম্ভের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রেল লাইন ও আশপাশের এলাকায় চলে ইতিহাসের নির্মম এ হত্যাযজ্ঞ। এইসব শহীদের নাম সুউচ্চ দুটি স্তম্ভের পাথরে লেখা হলেও তা মুছে গেছে অনেক আগেই। মূল স্মৃতিসৌধটির অবস্থাও নাজুক। পাথরে লেখা শহীদদের নাম মুছে গেলেও, সেই বিভিষিকাময় দিনটির কথা মন থেকে মুছে যায়নি কারও।

একাত্তরের ১৩ অক্টোবর সকালে পাকিস্তানি সেনাদের একটি ট্রেন এসে থামে বরইতলা গ্রামের কাছে। তারা এলাকাবাসীকে নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচার-প্রচারণামূলক একটি সভার আয়োজনের চেষ্টা করতে থাকে। তখন পথ হারিয়ে ফেলায় এক পাকিস্তানি সেনা দলছুট হয়ে পড়ে। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে স্থানীয় রাজাকাররা গুজব রটিয়ে দেয়, গ্রামবাসীরা পাকিস্তানি সেনাকে গুম করেছে। এ খবরের সত্যতা যাচাই না করেই তারা গ্রামবাসীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বরইতলা, চিকনিরচর ও দামপাড়াসহ আশপাশের এলাকার পাঁচ শতাধিক লোককে ধরে এনে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেল লাইনের পাশে জড়ো করে তারা। এক পর্যায়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় ৩৬৫ জনকে। এ সময় আহত হয় দেড় শতাধিক ব্যক্তি।

পুরো বরইতলা ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক গণকবর। প্রতিটি পরিবারই হারিয়েছে কোনও না কোনও স্বজনকে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পূর্বচিকনিরচর গ্রাম। এখানকার বহু মানুষকে হত্যাসহ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পুরো গ্রামটিকে।

কিন্তু স্মৃতিস্তম্ভে গণহত্যার শিকার লোকজনকে শহীদ উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তাদের দেওয়া হয়নি শহীদের মর্যাদা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেওয়া হয়নি কোনও ধরণের সহায়তা। এসব নিয়ে আক্ষেপ, ক্ষোভ ও হতাশার শেষ নেই এলাকাবাসীর। তারা গণহত্যায় মদদদাতা স্থানীয় রাজাকারদের বিচারও দাবি করেছেন।

গণহত্যায় স্বজন হারানো স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কালু মিয়া বলেন ,সাড়ে তিনশ’র বেশি মানুষকে নির্মমভাবে সেদিন হত্যা করা হলেও আজ পর্যন্ত সেই পরিবারগুলো শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি ।এখনও অনেক পরিবার নি:স্ব অবস্থায় আছে । আমার মামা ও মামাতো ভাই এখানে শহীদ হয়েছে। আমাদেরকে শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করছি।

আরেক স্বজনহারা আব্দুর সাত্তার শহীদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে জমি দিয়েছেন আর সেই জমির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান স্মৃতিসৌধটি।

আব্দুস সাত্তার বলেন, বর্তমানে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে কিন্তু ইতিহাসের নৃশংসতম এ গণহত্যার পেছনে যে স্থানীয় রাজাকারদের ইন্ধন ছিল তাদের বিচারে কোনও উদ্যেগ নেওয়া হচ্ছে না।

আমি জোড়ালোভাবে সরকারের কাছে আবেদন জানাই যেন এ গণহত্যায় জড়িতদের বিচার করা হয়।

কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহ বলেন, আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবো যেন স্মৃতিসৌধটি রক্ষণাবেক্ষণে এগিয়ে আসে । নাম ফলকে শহীদদের নামগুলোও মুছে যাচ্ছে । স্মৃতিসৌধটিতে বড় আকারের ফাটল দেখা দিয়েছে যেকোনও সময় ধসে পড়তে পারে।

গণহত্যায় শিকার লোকজনকে শহীদের মর্যাদা, তাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধটির পরিপূর্ণ সংস্কার ও স্থানীয় রাজকারদের বিচারে নেওয়া হবে কার্যকর পদক্ষেপ, সেই সঙ্গে দিনটিকে পালন করা হবে যথাযোগ্য মর্যাদায়- এমনটায় আশা করছে কিশোরগঞ্জবাসী।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View