Mountain View

হালুয়াঘাটে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে ভাতা আত্মসাৎ

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৬, ২০১৬ at ৮:১৪ অপরাহ্ণ

14627734_1105456816235284_543071836_nময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় সহজ সরল আদিবাসী গারো পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে ভুয়া মুক্তিযযোদ্ধা সাজিয়ে প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে একটি অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে। নানা মিথ্যে কথার জালে জড়িয়ে উদ্ভট গল্প সাজিয়ে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের খেটে খাওয়া নিরিহ গারোদেরকে নকল মুক্তিযযোদ্ধা সাজানো হয়েছে।

বলা হয়েছে অন্যান্য মুক্তিযযোদ্ধার মতো তারাও সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন। ভুয়া মুক্তিযযোদ্ধা সাজার ফাঁদে পড়া সুভাস মারাক, প্রত্যুষ সাংমা ও মনেষ সাংমা জানান, তাদেরকে মৃত মুক্তিযযোদ্ধার নামে ভাতা উত্তোলনের কার্ড করে ব্যাংকে নিয়ে যান কমান্ডার আমানউল্লাহ।

অত:পর প্রতিজনের নামে প্রথম কিস্তি ৩৬হাজার টাকা করে উত্তোলন করেন। অতঃপর তাদেরকে মাত্র ৫০০ টাকা করে দিয়ে বিদায় করে দেন। পরে আর কোনদিন টাকা পাননি। প্রথম কিস্তিতেই প্রতিমাসের ২ হাজার টাকা করে মোট ১৮ মাসের ৩৬হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন হালুয়াঘাট মুক্তিযযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আমানউল্লাহ।

একই রকম ভাবে বেতকুড়ি গ্রামের সিমন মাঝি (৫০), উত্তর বাঘাইতলা গ্রামের লুটিস রংদি (৫২) ও ফরিদ রিছিল (৫৫), গাজিরভিটার ঝাটাপাড়া গ্রামের সেকেন ঘাগ্রা(৪৫), উত্তর খয়রাকুড়ি গ্রামের নেপারসন রংদি (৫৫), আচকিপাড়া গ্রামের মানুয়েল স্নাল (৩৫), আমিরখাকুড়া গ্রামের পলিনুস সাংমা (৪৫), দক্ষিন খয়রাকুড়ি গ্রামের কাঠমিস্ত্রি গনেশ সুত্রধর(৫০)কে দিয়েও টাকা ওঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদের নামে নকল ও প্রক্সিমুক্তিযযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন এর কার্ড করা হয়েছিল। এরা সকলেই সত্যতা স্বীকার করেন। সাজানো মুক্তিযযোদ্ধার স্ত্রী অনলা ঘাগ্রা বলেন, আগে তুলছে, মিছা কথা কইতনা। মুক্তিযযোদ্ধা পংকজ ও কমান্ডার আমানউল্লাহ তার স্বামীকে নকল মুক্তিযযোদ্ধা বানিয়েছেন বলে তিনি জানান।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করলে বের হয়ে আসে নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর নানা কাহিনী। যে সমস্ত মুক্তিযযোদ্ধার নামে এদেরকে ভাতা উত্তোলনের কার্ড করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই প্রকৃত মুক্তিযযোদ্ধা। কিন্তু এদের কেউ মারা গেছেন, আবার কেউ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রকৃত মুক্তিযযোদ্ধাদের নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে জালিয়াতির নীল নকশা তৈরী করে আত্মসাৎ করা হয় সরকারী অর্থ।

সুত্রে জানা যায়, প্রকৃত মুক্তিযযোদ্ধা উত্তর বাঘাইতলা গ্রামের ধরনি রিছিল (ভারতীয় কল্যাণ ট্রাস্ট নং ৮৮৬৪) এর স্থলে নকল মুক্তিযযোদ্ধা সাজানো হয় বেতকুড়ি গ্রামের সুবাস মারাকে, নিকুলাস মারাক (ভারতীয় ক:ট্রা: নং ৮৮২৫)এর স্থলে নকল মুক্তিযযোদ্ধা বেতকুড়ি গ্রামের সীমন মাঝি ওরফে বাবরি রিছিল, সুরুজ রেমা (ভারতীয় কল্যান ট্রাস্ট নং ৮৭৯৯)এর স্থলে উত্তর বাঘাইতলার লুটিস রংদি, কুমারগাতি গ্রামের প্রদীপ সাংমা (কল্যাণ ট্রাস্ট নং ৯০০১)এর স্থলে উত্তর বাঘাইতলা গ্রামের ফরিদ রিছিল, সুজিত মারাক (কল্যানট্রাস্ট নং ৮৭৬১)এর স্থলে ঝাটাপাড়া গ্রামের সেকেন ঘাগ্রা ওরফে সুজিত ঘাগ্রা, লিলিশ রংদি (কল্যাণ ট্রাস্ট নং৮৮৫৩)এর স্থলে উত্তর খয়রাকুড়ি গ্রামের নেপারসন রংদি, জখমকুড়া গ্রামের সন্তোষ মারাকের স্থলে সংড়া গ্রামের মনেষ সাংমা, জয়ুরামকুড়া গ্রামের তড়ক মানখিন ( কল্যাণ ট্রাস্ট নং ৮৯৯০)এর স্থলে পলাশতলা গ্রামের প্রত্যুষ সাংমা, ভাষনপাড়া গ্রামের টস মারাক (কল্যানট্রাস্ট নং৮৯৪০)এর স্থলে আচকিপাড়া গ্রামের মানুয়েল স্নাল, ওপেন মারাক (কল্যানট্রাস্ট নং ৯০০৬)এর স্থলে আমিরখাকুড়া গ্রামের পলিনুস সাংমা, নাগলা গ্রামের অভিনাস চন্দ্র দাস(কল্যাণ ট্রাস্ট নং ৮৯১৬)এর স্থলে দক্ষিন খয়রাকুড়ি গ্রামের গনেশ চন্দ্র সুত্রধর কে নকল মুক্তিযযোদ্ধা সাজিয়েছেন।

ব্যাংকের হিসাব মতে জানা যায়, নকল মুক্তিযযোদ্ধা যথাক্রমে সুবাস মারাক, সিমন মাঝির নামে জুলাই/২০১০ থেকে ডিসেম্বর /১৪ পর্যন্ত প্রত্যেকের নামে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। লুটিশ রংদি, ফরিদ রিছিল, মনেশ সাংমা, প্রত্যুষ সাংমা, মানুয়েল স্নাল, পলিনুস সাংমা, গনেশ সুত্রধর এদের প্রত্যেকের নামে জুলাই/১০ থেকে সেপ্টেম্বর/১৪ পর্যন্ত ১লক্ষ ২৩ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। সেকেন ঘাগ্রা জুলাই/১৩ থেকে ৬৬ হাজার টাকা, নেপারসন রংদি জুলাই/১৩ থেকে সেপ্টেম্বর /১৪ পর্যন্ত ৫১ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। এভাবে সর্বমোট ১১ জন ভুয়া মুক্তিযযোদ্ধার নামে মোট ১২লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা সরকারি রাজস্ব খাত থেকে প্রতারনাপুর্বক উত্তোলন করেন। নকল মুক্তিযযোদ্ধাদের অভিযোগ তাদের প্রত্যেককে প্রথম কিস্তিতে মাত্র ৫০০ টাকা দেয়া হয়েছে এবং বাকি টাকা সাবেক কমান্ডার আমানউল্লাহ নিয়ে গেছেন।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক কমান্ডার আমানউল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,যারা আমাকে দোষার“প করছে, তারা মিথ্যা বলছে। প্রক্সি ও নকল মুক্তিযোদ্ধাদের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, এদেরকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক পরিচয়পত্র দেখেই মুক্তিযযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন এর সুপারিশ করেছিলাম। সাজানো মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ব্যাংক থেকে নিজে টাকা উত্তোলন করেছেন এমনটি অস্বীকার করে বলেন, এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে, তিনি জড়িত নন। এদেরকে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে চিনেন না বলেও জানান। অভিযুক্ত মুক্তিযযোদ্ধা পংকজ বলেন, আমরা সাধারণ মুক্তিযযোদ্ধা, ভুয়াদের বিষয়ে সাবেক কমান্ডার আমানউল্লাহ জড়িত।

এ বিষয়ে হালুয়াট মুক্তিযযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার বীর মুক্তিযযোদ্ধা কবিরুল ইসলাম বেগ বলেন, আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর ৩৬টি ভাতা উত্তোলনের বই ভুয়া সন্দেহে আটক করা হয়। পরে যাচাই বাছাই করে কিছু বই ছেড়ে দেয় হয়। সকল ভুয়া ও প্রঙ্খিাওয়া নকল মুক্তিযযোদ্ধা করার পিছনে তিনি সাবেক কমান্ডার আমানউল্লাহকেই দায়ি করেন। তিনি বলেন যে, কমান্ডার আমানউল্লাহ ইতিমধ্যে ভুয়া মুক্তিযযোদ্ধা সাজিয়ে ৪০ লক্ষাধিক টাকা আত্বসাৎ করেছেন। তিনি মামলা করবেন বলেও জানান। এ ঘটনায় মুক্তিযযোদ্ধা সংসদের সাবেক আহবায়ক আব্দুল গনি, সদস্য সচিব ভাবু ভদ্র, মুক্তিযযোদ্ধা সুশিল ঘাগ্রা, সুকাশ স্নাল, কাজিমউদ্দিনসহ হালুয়াঘাটের বিভিন্ন স্তরের লোকজন নিন্দা জানিয়ে তদন্তপূর্বক বিচার দাবী করেন। এ নিয়ে উপজেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জেলা প্রশাসক বরাবরে একাধিক অভিযোগ দাখিল করে ছিলেন, মরহুম মুক্তিযযোদ্ধা আব্দুল ওয়াহাবসহ কয়েকজন মিলে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View