ঢাকা : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, বৃহস্পতিবার, ১০:০৪ অপরাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

এবার অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে রোগীরা বিপাকে

be9c0661b67a28609b12a0c8ccb28997-labo1478

হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স-চাপায় প্রাণহানির ঘটনার পর এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীরা অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন। গতকাল রোববার অ্যাম্বুলেন্স তো ছিলই না, রিকশা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনও ছিল না। অ্যাম্বুলেন্সচালকেরা অবশ্য হাসপাতালের আশপাশেই ছিলেন। দুপুরের পর সুযোগ বুঝে তাঁরা বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সচালকদের ওপর চড়াও হন বলে অভিযোগ ওঠে।

গত শনিবার ‘মানবসেবা’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপা দেয় কয়েকজনকে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন গোলেনুর বেগম, তাঁর সাত বছরের ছেলে সাকিব ও অজ্ঞাতনামা এক ভিক্ষুক।
আহত হয় গোলেনুরের ছয় মাস বয়সী ছেলে আকাশ, সজীব (৮), সজীবের মা আমেনা বেগম, রিকশাচালক বাচ্চু মিয়া ও রমজান আলী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সজীবের মা। তিনি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আহত রমজান আলী এখনো হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

ওই ঘটনার পর জরুরি বিভাগের সামনে প্রতিদিন জটলা করে থাকা অ্যাম্বুলেন্সগুলো সরে যায়। গতকাল সকাল সাড়ে দশটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগের বাইরে একটি অ্যাম্বুলেন্সও দেখা যায়নি। ফটকের মুখে সিএনজিচালিত অটোরিকশার অলিখিত ‘স্ট্যান্ড’ও ছিল শূন্য। এতে করে রোগী, তাদের স্বজন ও লাশ পরিবহনে ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ।

দুপুরের দিকে জাকিয়া বেগম নামের এক বৃদ্ধকে জরুরি বিভাগের ফটকের কাছে কাপড়ের পুঁটলির ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। তাঁর বাড়ি গাজীপুর। তাঁর বোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার আপার অনেক দিন ধইরা শরীর খারাপ। জ্বর আর জ্বর। অনেক দিন হাসপাতালে ছিলাম। উনি বাড়ি যাইতে চাইতেছেন। িকসে কইরা যাব বুঝতেছি না।’ অপর এক রোগীকে তাঁর স্বজনের ঘাড়ে ভর দিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাঁরা গেন্ডারিয়া যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি খুঁজছিলেন। দিনভর এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে।

তবে কাছেপিঠেই লুকিয়ে ছিলেন অ্যাম্বুলেন্সচালকেরা। জরুরি বিভাগের ফুটপাতের ওপর সকাল থেকেই গোল হয়ে দলে ভাগ হয়ে লোকজন আড্ডা দিচ্ছিলেন। নাম-পরিচয় গোপন রেখে অ্যাম্বুলেন্স আছে কি না, জানতে চাইলে তাঁদের একজন বলেন, ‘কাল একটু ঝামেলা হইছিল। অ্যাম্বুলেন্স আছে, ধারেকাছেই। লাগব আপনার? বললেই আইসা পড়ব।’ পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, তাঁরা ফুটপাতে ফলের ব্যবসা করেন। আবার অ্যাম্বুলেন্সের দালালিও করেন। অ্যাম্বুলেন্স কাদের জানতে চাইলে বলেন, হাসপাতালের ভেতরের লোকেরও আছে, বাইরেরও আছে। ওই দলটির সঙ্গে কথা বলার পরপরই বাইরে থেকে আসা কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্সকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন আশপাশে থাকা অ্যাম্বুলেন্সচালকেরা। প্রথম আলোর ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংবাদদাতা জানান, বাইরে থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী নামিয়ে দিয়ে কখনো রোগী, কখনো রোগীর স্বজনদের তোলে।

গতকাল বিকেল চারটার দিকে নরসিংদী থেকে অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে আসেন আবদুর রহমান নামের এক চালক। তিনি যাত্রী তোলার চেষ্টা করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্সচালকদের বাধার মুখে পড়েন। পরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর অবস্থা স্বাভাবিক হয়।

65259437f002b04d09c17572ac9d5f59-labo1460

পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং মর্গের কর্মীরও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা
হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র দুটি। প্রতিদিন কমপক্ষে ১১৫ জনের অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন হয়। হাসপাতালের এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে একদল লোক রোগীদের জিম্মি করছে। তারা কারা, জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক, সাবেক একজন পরিচালক ও একজন উপপরিচালক এবং অ্যাম্বুলেন্সের একজন মালিক বলেন, হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেশ কিছু অ্যাম্বুলেন্স আছে। তাঁদের বেশির ভাগই ভাই, স্বামী, বাবার নামে গাড়ি কিনেছেন। অ্যাম্বুলেন্স-মালিকদের মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটারের এমএলএসএস, বার্ন ইউনিটের কর্মচারী, টিকিট কাউন্টারের কর্মী, হাসপাতালের গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মর্গের কর্মী আছেন। অভিযোগ আছে, তাঁরা ইচ্ছেমতো রোগীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করেন। রোগীরা অ্যাম্বুলেন্স-মালিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে পেরে ওঠেন না।
তবে বাংলাদেশ চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতির সভাপতি শেখ মো. আবদুল খালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংগঠন করি বলে অনেক কথাই শুনতে হয়। কর্মচারীদের অ্যাম্বুলেন্স আছে। কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।’
প্রায় তিন বছর উপপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি নিজেই আমার প্রয়োজনে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেছিলাম।’
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায় হাসপাতালের কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আগেও উঠেছিল। তদন্ত করে দেখা যায়, কোনো অ্যাম্বুলেন্সই হাসপাতালের কোনো কর্মচারীর নামে কেনা হয়নি। তারপরও কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অ্যাম্বুলেন্সটির মালিক হিসেবে মাহফুজুর নামে এক ব্যক্তির কথা বলেছে পুলিশ। মাহফুজুর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। গতকাল তিনি হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ ছিল।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮-০৯ সালের দিকে সমস্যা সমাধানে আমরা অনেকটা এগিয়েছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স-সেবা আমরা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব করেছিলাম। আগুন লাগলেই যেমন নেভানোর গাড়ি ছোটে, তেমনি রোগীর প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ছুটবে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, মহাখালী, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালসংলগ্ন জায়গায় অ্যাম্বুলেন্সের ডিপো করারও প্রস্তাব ছিল। কোনোটাই পরে চূড়ান্ত হয়নি।’ তিনি বলেন, হাসপাতালের কর্মচারীরা সব সময় ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট, ফলে তাঁরা এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দিতে পেরেছিলেন।

একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

শনিবার অ্যাম্বুলেন্সের ধাক্কায় মারাত্মক আহত রমজান আলীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকেরা বলেন, রমজানের পাঁজরের ছয়টি হাড় ভেঙে গেছে। তাঁর বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাঁর অবস্থা সংকটজনক।

আহত শিশু সজীবের পায়ে প্লাস্টার করা হয়েছে গতকাল। তার অবস্থা ভালো। সদ্য মা-হারা সজীব দিনভর কেঁদেছে গতকাল। পরে তাকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন তার বাবা জাকির হোসেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওই ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে অ্যাম্বুলেন্সটির মালিক হাসপাতালের কর্মচারী—পুলিশ এমন তথ্য দিলেও গতকাল পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি বলে দাবি করেছে।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের চাপায় চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার চালক সোহেলকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদার এ আদেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এজাহারভুক্ত অন্য দুই আসামি মাহফুজুর ও সোহাগকে আমরা খুঁজছি। শুনেছি মাহফুজুর হাসপাতালেই চাকরি করে। তাঁকে ধরার চেষ্টা চলছে।’

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

ঠাকুরগাঁওয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৭ম জেলা সম্মেলন উদ্বোধন

  এস. এম. মনিরুজ্জামান মিলন, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ “জনতার ঐক্য দানবের দম্ভ ভাঙবোই”এই শ্লোগানকে সামনে রেখে …

Mountain View

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *