বাংলাদেশে না আসায় ইংল্যান্ড অধিনায়ক মরগানকে যা বললেন নাসের হোসাইন

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৮, ২০১৬ at ৭:৩৮ অপরাহ্ণ

22 ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেন একহাত দিয়েছেন তার দলের বর্তমান অধিনায়ক ইওন মর্গ্যানের। বাংলাদেশ সফর না করায় তার এবং দলের কী ক্ষতি হচ্ছে তা তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এখানে তা তুলে ধরা হলো।পদ্মাপারের দেশে ইওন মর্গ্যানের ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হিসেবে আসা উচিত ছিল। একেবারে শুরুতেই খোলাখুলিভাবে নিজের মতটা জানিয়ে রাখলাম। ইওনকে যতদূর জানি নিজের মর্জিমাফিক চলতে পছন্দ করে। কিন্তু, দেশের ক্রিকেট দলের নেতা হিসেবে ওর এমন কিছু সতীর্থদরে কাছ থেকে প্রত্যাশা করা উচিত নয় যেটা করতে ও নিজে অপারগ!‌

এরপরও যেটা বলব, গত দেড় বছরে বিশ্ব ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের যে বদলে যাওয়া অবয়বটা গোটা দুনিয়া প্রত্যক্ষ করছে তার পিছনে মর্গ্যানের ভূমিকা ভুললে চলবে না। নিজের ওপর ওর অগাধ আত্মবিশ্বাস, সঙ্গে লড়াকু মেজাজ -‌ সবমিলিয়ে একদিনের ক্রিকেটে টিম ইংল্যান্ডের নেতৃত্বের দায়িত্ব মর্গ্যানের কাঁধে বর্তানোর পর দলটা আমূল বদলে গিয়েছে। বলাই বাহুল্য, ইংরেজ ক্রিকেটের ভভিষ্যতের পক্ষে ভালোই হয়েছে ব্যাপারটা।এটাও মাথায় রাখা জরুরি, নিরাপত্তার খাতিরে কেউ যদি কোনো সফরে যেতে অসম্মত হয় তাহলে তাকে কাঠগড়ায় তোলা যায় না। কারন এটা পুরোপুরিই তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বলেই ধরে নেয়া উচিত।

বাংলাদেশ সফরে যতই ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারা বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রেগ ডিকাসন ক্রিকেটারদের আশ্বাস দিন না কেন, এরপরও ভয়টা থেকে যাওয়া অমূলক কিছু নয়।তবে, এখানে আরেকটা কথাও মনে রাখতে হবে। তুমি যখন দলের ক্যাপ্টেন তখন দায়িত্বটাও অনেক বেশি। দলের প্রতি অন্যদের চেয়ে আরো বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়াও কাম্য। এক্ষেত্রে ইওনেরও উচিত ছিল বোর্ড কর্তাদের বোঝানো যে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সফরে না যাওয়াই উচিত। এরপরেও যদি ইসিবি নিজেদের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকত তাহলে অন্য টিমমেটদের সামনে থেকে সবার আগে ঢাকাগামী বিমানে চড়ে বসাটাই ওর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল। সাধারণ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তুলনায় ক্যাপ্টেনের দায়িত্বটা যে অনেক বেশি এটা নিশ্চয়ই ইওনকে নতুন করে বুঝিয়ে বলতে হবে না।পরবর্তীকালে মর্গ্যান যখন ওর সতীর্থদের কাছ থেকে দলের প্রতি আরো নিবেদিতপ্রাণ হওয়ার কথা বলবে তখন যদি ওরা মর্গ্যানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়?‌ মানে বলতে চাইছি, ওরা তো বলতেই পারে, ‘‌ওহে, যখন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের দিব্যি বাংলাদেশ সফর করতে পাঠিয়ে দিয়েছিলে নিজে না গিয়ে, তখন দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন তোমার কোথায় ছিল?‌’‌

অথবা কেউ কেউ এমনো ভেবে নিতে পারে, বাংলাদেশ সফরে গিয়ে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ওদেশের ক্রিকেট বোর্ড যখন আমাদের ঘরবন্দী করে রেখেছিল, তোমাকে তো খুঁজে পাইনি ব্রাদার!‌ কেন জানি না মনে হচ্ছে, বাংলা সফরে মর্গ্যানের না যাওয়াটা অদূর ভবিষ্যতে দলে ওর রাশ আলগা করে দিলেও দিতে পারে।পাঠকদের একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই, ২০১০ সালে আইপিএল চলাকালীন বেঙ্গালুরুতে বোমা বিস্ফোরনের সময় অকুস্থলের খুব কাছাকাছিই ছিল মর্গ্যান। অথচ, তারপরও কিন্তু নিয়মিভাবে ফি বছর দ্বিধাহীন চিত্তেই ভারতের মাটিতে পা রেখেছে!‌ তাহলে?‌ সমস্যটা ঠিক কোথায়?‌ মর্গ্যান যদি মনে করে, বাংলাদেশে সফর করতে যাওয়ার চেয়ে ভারতের মাটিতে খেলতে যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ তাহলে সেটা অন্য কথা। ইতিমধ্যেই আগামী বছরের জানুয়ারিতে মহেন্দ্র সিং ধোনিদের বিপক্ষে সফরকারী ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার ব্যাপারে সম্মতি জানিয়ে রেখেছে মর্গ্যান। ওর সত্যিই এব্যাপারে ঝেড়ে কাশা উচিত। কী চাইছে?‌ কেন বাংলদেশকে ওর অনেক বেশি নিরাপত্তা হানিকর বলে মনে হচ্ছে?‌ মর্গ্যান নিজেই ব্যাপারটা খোলসা করুক এবার। ভারতের মাটিতে অমন ভয়াল বিস্ফোরণের অভিঘাত সামলেও যে বারবার নিয়ম করে সেদেশে গিয়ে হাজির হয়, সে কেন নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে পাশের দেশটিতে গেল না?‌

এতে অবশ্য মর্গ্যানের কেরিয়রে বিরাট কোনো আঁচ পড়বে, মনে হয় না। ইংরেজ অধিনায়কের মুকুটও এজন্য ওর মাথা থেকে খুলে নেয়া হবে এমন ভাবনাও অবান্তর। সেটা মনেপ্রাণে চাইও না। তবে, ওর বোঝা উচিত বাংলাদেশ সফরে ওর বদলে যাওয়া লোকটা যদি তুখোড় খেলে দেয় তাহলে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই নির্বাচকদের বিড়ম্বনা বাড়বে!‌ তখন কোনো কোনো মহল থেকে এই প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয় যে, আবার কেন মর্গ্যানকে ফিরিয়ে নেয়া হবে? কোন যুক্তিতে?‌ পদ্মাপারে জস বাটলার যদি দারুন অধিনায়কত্ব করে বা ইওনের জায়গায় আসা বেন ডাকেট নিজেকেও ছাপিয়ে যায় তখন অবধারিতভাবেই দলে মর্গ্যানের আসনটা আর তেমন শক্তপোক্ত না’‌ও লাগতে পারে। একটা ব্যাপার খোলসা করেই বলা যায়, স্রেফ দারুণ নেতৃত্ব দিয়েই মর্গ্যান কিন্তু আর দলে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পারবে না। যেটা আগে হয়েছিল। উপুর্যপরি ২১ ম্যাচে একটাও পঞ্চাশ করতে না পেরেও দিব্যি দলে টিঁকেছিল।এ প্রসঙ্গে আমার নিজের কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। সালটা ২০০১। আমি তখন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। ভারত সফরে যাব নাকি যাব না এই নিয়ে স্পষ্টতই দ্বিধায় ছিলাম। কারণ তার আগেই গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই টুইন টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সেই ভয়াবহ ঘটনার মাস খানেক পরই শুরু হয়েছিল সফর। দলের ক্রিকেটাররা মারাত্মক আশঙ্কায় ভুগছিল। আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা নড়ে গিয়েছিল। অ্যান্ড্রু ক্যাডিক আর রবার্ট ক্রফট আমাকে এসে বলল যে, ভারতে যেতে চায় না।

ওদের মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেছিলাম। ওদের নেয়া সিদ্ধান্তকে যথাযথ সম্মানও করতেও কুন্ঠাবোধ করিনি। এরপরেও যেটা বলার, রবার্ট ক্রফটকে আর কখনো ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে দেখা যায়নি। না, সেই সফরে না যাওয়ার শাস্তি হিসেবে নয়। ওর বদলে ভারতে গিয়েছিল যে সেই অ্যাশলে জাইলস দুর্দান্ত বল করে দলে নিজের জায়গা পাকা করে নেয়। সে এক ইতিহাস। এবং কে না জানে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বারবারই হয়!‌আমার ক্রিকেট কেরিয়ের এই ধরনের ঘটনা আরো একবার। ২০০১-‌র সেই ভারত সফরের ঠিক বছরদুয়েক পরে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলার জন্য জিম্বাবোয়েতে যাওয়া নিয়েও ঘনিয়ে উঠেছিল অনিশ্চয়তা। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে নয়, সেদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাই সংশয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল সেবারের কাপযুদ্ধকে। রবার্ট মুগাবের মতো স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকা একটা দেশে ক্রিকেট খেলতে যাওয়া নীতিগতভাবে সঠিক কী না সেই ধন্দেই পড়ে গিয়েছিলাম। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, হেনরি ওলোঙ্গাদের মতো জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা দুই তারকার সঙ্গে বিস্তারিতভাবে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যাই হোক না কেন, বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে ওদেশে যাব না। গেলে মুগাবের মতো একনায়কের অপশাসনের প্রতি আস্থা প্রদর্শন করা হত। অন্তত তখন এটাই মনে হয়েছিল।২০০১-‌র ভারত সফরের আগে বিশ্বাস করুন, একবারও মনে হয়নি দলের অন্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আমি ইংল্যান্ডে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থেকে যাই। শেষ করছি এটা জানিয়ে আমি কিন্তু ইংল্যান্ডের আসন্ন বাংলাদেশ সফরে হাজির থাকছি। ধারাভাষ্য এবং লেখালেখির কাজে। এবং একটুও ভয় মনে পুষে না রেখেই যাচ্ছি!‌ কারণ, একটা কথা আমি এতদিনে জেনে গিয়েছি এই বিশ্বের কোত্থাও আমরা আর নিরাপদ নই। আচমকা হামলা শুধু বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের দেশগুলোতে নয়, ধেয়ে আসতে পারে ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র লর্ডসে বা এমন কোনো জায়গাতেও যেগুলোকে আমরা এতকাল নিরাপদ বলেই জেনে এসেছি।

এ সম্পর্কিত আরও