‘জাস্ট ফান’ থেকে পর্নোগ্রাফির দুনিয়ায়!

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৯, ২০১৬ at ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

dsu

‘বছরখানেক আগের কথা। আমার মেয়ে তখন নামকরা একটি স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। হঠাৎই তার আচরণ বদলে যেতে থাকে। আমাদের সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত আবদার করতে থাকে সে। বুঝিয়ে বললেও শোনে না। স্মার্টফোন কিনে না দেওয়ায় সারারাত কম্পিউটার টেবিলেই থাকে। দরজা বন্ধ করে কথা বলে। রাত জেগে সে কী করছে সেই সন্দেহের জায়গা থেকেই আমি তার ওপর নজর রাখতে শুরু করি। একদিন মেয়েকে বলি আমার সামনেই ফেসবুক লগইন করতে। আমার সামনে সে লগইন করে। তবে সেখানে আপত্তিকর কোনও কিছু চোখে পড়েনি। এরপর লিস্টে আরেকটি নাম দেখে লগইন করতে বললে, প্রথমে সে করতে রাজি হয়নি। পরে সেই অ্যাকাউন্টে ঢোকে এবং আমি বিস্মিত হয়ে দেখি আমার মেয়ে তার চেয়ে বয়সে বড় বন্ধুদের সঙ্গে কী ধরনের আলাপ করে।’

কথাগুলো বলছিলেন রায়হান হোসেন (ছদ্মনাম)। তার মেয়ে নায়মা (ছদ্মনাম) সদ্য আলোচনায় আসা ‘ডেসপারেটলি সিকিং আনসেন্সরড’এর ফেসবুক গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিল।

পেশায় ব্যবসায়ী রায়হান অনলাইনে মেয়ের বিপদে পড়ার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করি সে এসব (প্রাপ্তবয়স্ক আলোচনা) কেন করছে আর কীভাবে সে এই গ্রুপগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো। মেয়ে জানায়,কলেজ শাখার আপুরা নিজ আগ্রহে এসে তাদের সঙ্গে খাতির করে, বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে যায়, গিফট চাইলে গিফট দেয়। আর কারও সঙ্গে দেখা করো কিনা প্রশ্নের জবাবে মেয়ে বলে, রেস্টুরেন্টে অন্য কলেজের ভাইয়ারা আসেন, তারপর কার সঙ্গে কে যাবে সেখানে তা ঠিক হয়। তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেও গিয়েছে। সেই ভাইয়াদেরই কারও একজনের কাছ থেকে সে একটি স্মার্টফোনও পেয়েছে। যেটি তার বাবা-মা কেউ জানেও না।’ মেয়েকে সেখান থেকে বের করে আনতে স্কুল পরিবর্তন, বাসা পরিবর্তনসহ নানা পদক্ষেপের পর এখনও ওই অভিভাবক নিজেদের শঙ্কামুক্ত ভাবতে পারছেন না।

ফেসবুকের এই পেজগুলো যারা পর্যবেক্ষণে রেখেছেন তারা বলছেন, ফেসবুক গ্রুপ হওয়ায় এখানে সদস্য সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। যেসব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে সেগুলোতে কৈশোরে আগ্রহ বেশি থাকে। তার সেই সুযোগটাই নিতে চেষ্টা করে ওরা।

মনোরোগ বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা এ ধরনের কাজ করে তারা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত। যারা না বুঝে জড়িয়ে পড়ছে বুঝতে পারার পর তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে এমনটাও বলা যাবে না।

অ্যাডমিন আটকের ঘটনার পর আলোচনায় আসা গ্রুপ ‘ডেসপারেটলি সিকিং আনসেন্সরড’ এর ফেসবুক গ্রুপের সদস্য এক লাখ ২২ হাজার। গ্রুপের  আলাপের বিষয়বস্তু ও কর্মকাণ্ড শুরু থেকে গ্রুপের সদস্য হিসেবে থাকা আরেকজন স্নেহা সরোয়ার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘এখানে লাখ লাখ মানুষ আছে। কিন্তু সবাইকে ওদের দরকার নাই এটা বোঝা যায়। বাকিদের কাছে বিষয়টা ফান। কিন্তু অ্যাডমিনরা যাদেরকে টার্গেট করে তাদেরকেই ওদের দরকার। ওরা টার্গেট করে বাছাই করে তাদের কাছে নানারকম প্রস্তাব দেয়। আমার বান্ধবীকে দেওয়া হয়েছিল। সে কোনওভাবে এড়িয়ে গেলে তাকে গ্রুপ থেকে ব্যান করে দিয়ে ওর ছবি বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।’

কীভাবে এই গ্রুপে যুক্ত হলেন প্রশ্নে স্নেহা বলেন, ‘আসলে আমরা বন্ধুদের মাধ্যমে গ্রুপটার কথা জানি। রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে সদস্য হই। আমরা ভেবেছি এটা জাস্ট ফান। কিন্তু পর্নো ভিডিও ছেড়ে দেওয়া, জোর করে ভিডিও চ্যাটে ডাকা। না আসলে অশ্লীল ছবি বানিয়ে পাঠানোর মতো ঘটনা ফান হতে পারে না। ভয় পেয়ে আমরা বন্ধুরা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করি। বের হয়ে গেলে যদি অ্যাডমিন রাগ করে আমাদের নিয়ে কিছু করে। তাই  আমরা গ্রুপেই থাকবো বলে সিদ্ধান্ত নেই।’

কেন্দ্রীয় মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. রাহানুল ইসলাম কিশোর বয়সে এধরনের কাজে লিপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘ যে ছেলেরা আটক হচ্ছে, সে অপরাধ করেছে । বেড়ে ওঠার মধ্যে হয়তো এক ধরনের অসুস্থতা রয়েছে। ফলে সে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠার জায়গা থেকে এমনটা করে থাকতে পারে। ঠিক কেন করে তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও গবেষণা আমাদের দেশে নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘যিনি ভিকটিমাইজড হচ্ছেন তিনি ভাবছেন, তার ব্যক্তিগত সুনাম ধ্বংস হচ্ছে। ফলে সমাজের প্রতি রাগ, নিজেকে দোষী ভাবার মতো অনুভূতিগুলো আসে। সেখান থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে তাকে যথাযথ কাউন্সিলিং এর মধ্যে আনতে হবে।’

ফেসবুকে ভিডিও কল রিসিভে বাধ্য করে সেই ভিডিও ধারণ প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিডিনগ এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির  বলেন, ‘ভয় দেখিয়ে কিংবা ব্ল্যাকমেল করে ভিডিও চ্যাটিং এবং সেটা ধারণের নজির নতুন নয়। এভাবে ভিডিও ধারণ করে সেটা ব্যবহার খুব সম্ভব। যারা ভিকটিম হয়েছেন তারা হয়তো বন্ধুত্বের কারণে ভাবেনওনি এটার পরিণতি কী হবে। আর সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা। ছবি যেমন ফটোশপ করা যায় তেমনই ভিডিও তৈরি করা যায়। সেটা আমাদের এখানে হয়তো অহরহ হয় না। কিন্তু বাইরে পাঠিয়ে দিলে সেটাও করা সম্ভব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জিয়া রহমান ন বলেন, ‘এরা কোনওভাবে যদি আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারে। যাদের ধরা সম্ভব হয়েছে তাদের মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের কাছে পৌঁছাতে হবে। তারা কোন কোন কনটেন্ট সংরক্ষণ করেছেন, ভিডিও কীভাবে ক্যাপচার ও এডিট করা হয় সেগুলো দ্রুত বের করতে হবে। এ ধরনের যত গ্রুপ আছে তাদের কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তরুণদের ভেতর ডেসপারেসনেস থাকে। তারওপর গত কয়েক বছরে আমাদের সমাজে অস্থিরতা বেড়েছ। যেটা রিলেশনশিপগুলোকে শেষ করে দিয়েছে। আমাদের অনুশাসন আলগা হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত একটা ইন্টারনেট ব্যবহার নীতিমালা তৈরি জরুরি।’- Bangla Tribune 

তথ্য-প্রযুক্তি/ডিএসিউ/ইফাদ/৪

এ সম্পর্কিত আরও