A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

জীবনানন্দের চোখে কবিতা ও কবিসত্তা

1476978000_6কবির মনে প্রাগ্কল্পিত হয়ে কবিতার কলঙ্ককে যদি দেহ দিতে চায় কিংবা সেই দেহকে দিতে চায় আভা, তাহলে কবিতা সৃষ্টি হয় না, পদ্য লিখিত হয় মাত্র, ঠিক বলতে গেলে পদ্যের আকারে সিদ্ধান্ত, মতবাদ ও চিন্তার প্রক্রিয়া পাওয়া যায় শুধু। কাজেই চিন্তা ও সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন ও মতবাদ প্রকৃত কবিতার ভিতর সুন্দরীর কটাক্ষের পেছনে শিরা, উপশিরা ও রক্তের কণিকার মতো লুকিয়ে থাকে যেন। লুকিয়ে থাকে কিন্তু নিবিষ্ট পাঠক সে সংস্থা অনুভব করে; বুঝতে পারে যে তারা সংগতির ভেতর রয়েছে, অসংস্থিত হয়ে পীড়া দিচ্ছে না। [জীবনানন্দ দাশ] জীবনানন্দ দাশের এ বক্তব্যটিকে মাপকাঠি ধরে যদি তার কাব্যের জীবনমুখিতার বিচার করা যায়, তাহলে প্রশ্ন আসে, জীবনানন্দের কি নিজের কাছে থেকেই কোনাে প্রয়াস ছিল তার সামাজিক কিংবা তার জাতিগত অথবা মানবীয় চেতনাকে সৌন্দর্যের মোড়কের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে রাখার, অথবা এ বক্তব্য অন্য কবিদের সম্বধ্যে তার সহনশীলতার একটা প্রকাশ মাত্র? এখানে এ প্রশ্নটির মীমাংসা করতে গিয়ে প্রথমেই বলা যেতে পারে, জীবনানন্দের কবিতা যে স্বপ্নমঙ্গল কিংবা আকাশ-কুসুম নয় তার প্রমাণ পাওয়া যাবে তার প্রথম প্রহরের কবিতাগুলোতে অথবা রূপসীবাংলা’র কবিতাগুলোতে অথবা তার জীবনের শেষ প্রহরের কবিতাগুলোতে। রূপসীবাংলা শুধু ‘হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলির খেলা’ নয়। সেখানে রয়েছে বেহুলা আর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অভিযাত্রার প্রতীক। রাত্রির কোরাস কবিতায় দেখা গেছে, বিশ্বযুদ্ধের অমানবিকতা কবি জীবনানন্দের মনে কী প্রচ- ঝড় তুলেছিল। সময়ের তীর কবিতাটিও এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য। এ সকল কবিতায় অবশ্যই প্রমাণিত যে, সামাজিক কিংবা জাতিগত অথবা মনবিক সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন ও মতবাদকে লুকিয়ে রাখার জন্য যে সুপারিশ করেছেন তিনি সেটা তার নিজের প্রতিও প্রযোজ্য ছিল। তিনি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন সামাজিক সমস্যা, এ কথা মানতেই হবে। সুন্দরীর কটাক্ষের নিচের শিরা-উপশিরার মতো অত্যন্ত নিষ্ঠুর বাস্তবকে তিনি প্রচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করেছেন। এ-চেষ্টা অনেক কবিই করেননি, অথবা এর প্রয়োজনকে অনেকে অবান্তর মনে করে এসেছেন। কিন্তু এখানে প্রকৃত কথা এই যে, বাস্তবকে তিনি অনেক বেশি প্রগাঢ়রূপে গ্রহণ করেছেন বলেই তাকে ঢাকবার তাগিদ অনুভব সকলের চেয়ে বেশি করে। জীবনানন্দ যে বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন এবং তা প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করেছিলেন তখন নিশ্চয়ই যৌবনে পা দিয়েছিলেন। এ বয়সে নিশ্চয়ই নিজের লেখা কবিতার দায়িত্বজ্ঞান হয়েছিল। দেশবন্ধু কবিতাটির কথাই ধরা যাক। তখন তার বয়স ছাব্বিশ। তিনি সজ্ঞানে কবিতাটি লিখেছিলেন। কবিতাটি পড়লেই বুঝতে পারা যায় যে, এধরনের একটি বহির্মুখী কবিতায় সুন্দর শব্দমালা নিয়ে পরীক্ষা করার দিকেও তার একটি প্রচেষ্টার কথা বেরিয়ে এসেছে। তবে যে চিন্তার লাভা প্রবাহ বেরিয়ে এসেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্বাধীনতা সংগ্রামের কবিতা লেখার চিন্তা থেকে। কবি তার একাধিক কবিতায় সমাজচেতনার অবতারণা করেছেন। সময়ের একটা ঢেউ চলে যাবার পর আরেকটি ঢেউ আসবে। অতীতে কতবার গিয়েছে আবার এসেছে। বনলত সেন কবিতাটি মুক্তোর মতো জমানো রয়েছে সেই কালোত্তীর্ণ শুক্তিতেই। এটা কোনো রকমের প্রাগৈতিহাসিক অথবা প্রতœতাত্ত্বিক স্থবিরতা থেকে উদ্ভূত হয়নি। পৃথিবীর বাস্তবতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে অথবা নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই তিনি লিখেছিলেন : কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি। হে নর, হে নারী, তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনদিন; আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই। যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গতি, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ সেখানেই সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, কালপুরুষ, অনন্ত আকাশগ্রন্থি, শত শত শূকরীর প্রসববেদনার আড়ম্বর; এমনসব ভয়াবহ আরতি। জীবনানন্দ সৌন্দর্যের কবি। তাকে বলা হয় শুদ্ধতম কবি। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ কবিসত্তার বিশ্লেষণে তিনি এই মত পোষণ করেন। তার কথিত কেউ কেউ কবির মধ্য থেকেও তিনি একজন বিশিষ্ট উজ্জ্বলতর কবি; বলা যায় উজ্জ্বলতম কবি। জীবনানন্দ কবি হয়ে জন্ম নেননি। তবে আজন্ম তিনি কবিত্ব লালন করেছিলেন। সম্ভবত তিনি এই বিরল সত্তাটি প্রাপ্ত হয়েছিলেন বংশ পরম্পরায়। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন তৎকালীন গ্র্যাজুয়েট; উপনিষদের অমোঘ বাণী তিনি জীবনানন্দের কানে তুলে ধরতেন প্রতিনিয়ত। মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন স্বভাব কবি। ভাত রাঁধতে গিয়ে তিনি মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে ফেলতে পারতেন। বলা যায় এই কুসুমকুমারী দাশও কেউ কেউ কবিদের একজন বিরলপ্রজ কবি। ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে হবে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’ এর মতো নমস্য বাক্য কিÑ যে কারো মস্তিষ্ক প্রসব করতে পারে? কবি কুসুমকুমারী দাশ আমাদের এই দুর্ভাগা দেশে এমন একজন সন্তান কামনা করেছিলেন যে কিনা কথার চেয়ে কাজে বড় হবে। কবি জীবনানন্দই কি এই জননী কবির মানসসন্তান নন? কবি জীবনানন্দ কথা বলতেন সত্যি অবাক করার মতো কম। কিন্তু তিনি যে কর্মদৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। জীবনানন্দ ছিলেন মননে-মানসিকতায় একজন ভাবুক কবি। কবিসত্তা সমুন্নত রাখতে গিয়ে তিনি বারবার নাজেহাল হয়েছেন। যে মহান কবিকে আমরা হৃদয়ের উষ্ণতায় আগলে রাখতে চাই, যার লেখা প্রতিটি শব্দকণা আমরা হীরকখ-ের চেয়েও দামি বলে জানি; সেই কবি কিনা বারবার হেনস্তা হয়েছেন এই মনুষ্যসমাজেই। কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি বারবার চাকরি হারিয়েছেন; জীবন-জীবিকার পথ হয়েছে রুদ্ধ। কবি বারবার বিভীষিকায় নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। জীবনের গভীরতা মাপতে গিয়ে এই কবির মানস ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। জীবনে চলার শুরুতে কবি ও কবিতা সম্পর্কে যে ধারণা নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলেন; সে ধারণা তার পাল্টে গেছে জীবনপথের বাঁকে বাঁকে নানান খানাখন্দে পড়ে। তিনি কখনও একবিন্দুতে স্থায়ী হতে পারতেন না। তার এই অস্থিরতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন, ‘কবিতা কী Ñ এ জিজ্ঞাসার কোনো আবছা উত্তর দেয়ার আগে এটুকু অন্তত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, কবিতা অনেকরকম। ১৯৫৪ সালের ২০ এপ্রিল, তার মৃত্যুর ছ’মাস আগে এইভাবে শুরু করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ তার শ্রেষ্ঠ কবিতা’র প্রবেশকে। মোটামুটি একে ধরা যেতে পারে তার পরিণত চিন্তার ফসল। কবিতা অনেকরকম; জীবনানন্দের মুখে এরকম উক্তি শুনে আমরা একটু চকিত হয়ে উঠি : সারাজীবন যিনি প্রায় একরকম কবিতাই লিখে গেলেন; এরকম অনেকের ধারণা; তার কণ্ঠে একি উচ্চারণ। হ্যাঁ, জীবনানন্দ গভীর ও প্রশস্ত ঔদার্য থেকেই এ কথা লিখেছিলেন; কিন্তু এ কেবল তার মননী অভিজ্ঞতা নয়Ñ এ তার উপলব্ধিজাত সত্য। কেননা আপাতÑ এরকম কবিতার মধ্যেও জীবনানন্দ অনেকরকম কবিতা লিখেছিলেন।’ [ বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা : আবদুল মান্নান সৈয়দ ] কবি সম্পর্কে জীবনানন্দের যে ধারণা তা আমরা বারবার পরিবর্তন হতে দেখেছি। তিনি জীবনের একেক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে কবি সম্পর্কে একেক ধারণা আমাদেরকে দিয়েছেন। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ তার কবিমানস নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জীবনানন্দের এই বিবর্তনকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন : প্রথম পর্যায় : জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক। এই ঝরাপালকেই প্রথম যে কবিতাটি সন্নিবেশিত হয়েছে সেটির নাম ‘আমি কবি-সেই কবি’। কবি সম্পর্কে তার প্রথম পর্যায়ের ধারণা এই কবিতাটি থেকেই পাই : আমি কবি, সেই কবিÑ আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরাপালকের ছবি! আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল মেঘের পানে মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠেছে কোন কাজরীর গানে! [আমি কবি, সেই কবি : ঝরাপালক] জীবনানন্দ তার প্রথম জীবনে কবি সম্পর্কীয় ধারণা দিতে গিয়ে আরো তিনটি কবিতা লিখেছিলেন : ভ্রমরীর মত চুপে সৃজনে ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপন। নিরালায় সুর সাধি; বাঁধি মোর মানসীর বেণী, মানুষ দেখেনি মোরে কোনদিন আমারে চেনেনি। [কবি : ঝরাপালক] বীণা হাতে আমি তব সিংহাসনতলে কালে কালে আমি কবি, কভু পরি গলে জয়মালা, কভু হিং¯্র নির্দয় বিদ্রুপ তুলে লই অকুণ্ঠিতে, খুঁজে ফিরি রূপ [কবি : অগ্রন্থিত] এসেছিলে চিত্তে মোর পুলক সঞ্চারি নিখিল কবির কাব্যে ঝংকারি ঝংকারি মানসে জাগালে মম অপরূপ জ্যোতি! [নিবেদন : অগ্রন্থিত] প্রথম পর্যায়ের এই কবিতাগুলোতে জীবনানন্দ নিজেকে আনন্দের মধ্য দিয়েই খুঁজে বেরিয়েছেন। তিনি নিজেকে ভাসিয়েছেন অকুণ্ঠচিত্তে ভরা জোছনার আলোকে। আবদুল মান্নান সৈয়দের দৃষ্টিতে : সেখানে যে কবির সাক্ষাৎ পাই সে যেমন স্বপ্নদর্শী, তেমনি নির্জন। দ্বিতীয় পর্যায় : দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে কবি সম্পর্কে জীবনানন্দের অভিজ্ঞতা গেছে পাল্টে। কবি সম্পর্কে তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তার সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বপ্নদ্রষ্টা কবির স্বপ্ন ভেঙে বিচূর্ণিভূত হয়েছে : কবিকে দেখে এলাম দেখে এলাম কবিকে আনন্দের কবিতা একাদিক্রমে লিখে চলেছে তবুও পয়সা রোজগার করবার দরকার আছে তার কেউ উইল করে কিছু রেখে যায়নি। [কবি ঃ অগ্রন্থিত কবিতা] গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দের এ বিচ্যুতির কারণ খুঁজতে গিয়ে বলেছেন : প্রায় মনেই হয় না প্রথম পর্যায়ের সেই কবিরই লেখা এটি। মন ভেঙে গেছে কবির। আসলে এই দ্বিতীয় বা মধ্যপর্যায়ে জীবনানন্দ ব্যঙ্গময়, আত্মকরুণশীল, গভীর যাতনাবিদ্ধ, বস্তুবিদ্ধ, নিশ্রু রোদনশীল। প-িত ও সুন্দরী দু-ই তার আক্রমণের লক্ষ্য, কেননা দুজন-ই কবি ও কবিতাকে বুঝতে পারে না। অন্তিম পর্যায় : অন্তিমবেলায় এসে কবি আর কবিসত্তা নিয়ে তেমন করে ভাবিত হননি। কি জানি, হয়তো বিষয়টি আর আকৃষ্ট করেনি তাকে। তবে কবিসত্তাকে একটি আলো-আঁধারিতে নিমজ্জিত করেছিলেন শেষবেলায়। এ সম্পর্কীয় তার একটি লেখা বেরিয়েছিল চতুরঙ্গ পত্রিকায় মাঘ-চৈত্র ১৩৬২ সংখ্যায়। ‘ভোরের কবি, জ্যোতির কবি’ শিরোনামে কবিতাটির দুটি লাইন ছিল এরকম : ইতিহাসের অন্তে নবীন ইতিহাসের ক্রান্তিনীলিমায় ভোরের কবি, জ্যোতির কবি গায়।

Check Also

এবার লাখো কণ্ঠে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা

পহেলা মে শ্রমিক দিবসে লাখো কণ্ঠে উচ্চারিত হবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদোহী’ কবিতা। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading...