Mountain View

নেপালের রাজার খুনি কে?

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ২৬, ২০১৬ at ৫:৪৮ অপরাহ্ণ

bg20161026155439

গত ২০০১ সালের ১ জুন নিজ প্রাসাদে মর্মান্তিকভাবে খুন হন নেপালের দশম রাজা বীরেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ দেব।

শুধু রাজা নয়, একইসঙ্গে নির্মমভাবে খুন হন রাণী ঐশ্বরিয়া, যুবরাজ নিরাজন, যুবরাণী শ্রুতি রাজ্যলক্ষ্মী এবং ভাই ধীরেন্দ্রসহ রাজপরিবারের আরও ছয় সদস্য।

বীরেন্দ্রপুত্র যুবরাজ দীপেন্দ্রকে এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের জন্য তদন্ত কমিটি দায়ী করলেও সেটি বিশ্বাস করেন না নেপালের সাধারণ মানুষ।

তাই নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক এই ঘটনা সেদেশের জনগণের কাছে এখনও অপার রহস্য হয়ে আছে।  রাজাকে কে খুন করেছে, এই প্রশ্নের উত্তর গত ১৬ বছর ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছে নেপালবাসী।

নেপালের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজা হিসেবে বিবেচিত বীরেন্দ্র বীরবিক্রম থাকতেন রাজধানী কাঠমুন্ডুর নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদে।  রাজা বীরেন্দ্র নেই, কিন্তু তাকে সম্মান জানাতে সেই রাজপ্রাসাদে, যেটি এখন জাদুঘর হিসেবে আছে, সেখানে প্রতিদিন ছুটে যান নেপালের হাজার হাজার মানুষ।

নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদে গিয়ে দেখা হয় সেদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বিজয় থাপার সঙ্গে।  রাজা বীরেন্দ্রকে ছেলে দীপেন্দ্র হত্যা করেছে, এমন প্রসঙ্গ তুলতেই চোখ কপালে তুলেন বিজয়।

‘সব মিথ্যা কথা।  তদন্ত কমিটি নিজেদের মতো করে তদন্ত করেছে।  তারা নিজেরাই বলেছে তদন্ত অসম্পূর্ণ।  যুবরাজ রাজাকে খুন করতে পারেন, এটা নেপালের একজন মানুষও বিশ্বাস করেন না।  এখানে আরও বড় কোন ঘটনা আছে। ’ বলেন বিজয় থাপা।

কাঠমান্ডুর একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শ’খানেক শিক্ষার্থী গেছেন সেই রাজপ্রাসাদ পরিদর্শনে।

রাজার মৃত্যু নিয়ে তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়।  কৈশোরে পা দেয়া সেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও বিস্ময়, যুবরাজ কিভাবে খুন করতে পারেন রাজাকে ?

দীর্ঘসময় ধরে রাজাশাসিত নেপালবাসী কখনোই বিশ্বাস করেন না যে, রাজপরিবারের কোন সদস্য এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।

নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদ দেখতে যাওয়া বাংলাদেশের শিল্পপতি ও ডায়মন্ড সিমেন্টের পরিচালক হাকিম আলীর সঙ্গে কথা হয়।  তিনি বলেন, রাজা বীরেন্দ্র নেপালে খুব জনপ্রিয় ছিলেন।  সার্কের কল্যাণে আমাদের দেশেও রাজা বীরেন্দ্রর জনপ্রিয়তা এবং গ্রহণযোগ্যতা ছিল।  তার মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়েও নাড়া দিয়েছিল।  রাজপ্রাসাদটা ঘুরে দেখলাম।  নেপালের মানুষের মধ্যে রাজার জন্য যে আবেগ সেটাও অনুভব করলাম।  প্রায় দেড় যুগ হতে চলেছে, অথচ রাজাকে কে খুন করল, সেটি নেপালবাসীর কাছে এখনও পরিস্কার নয়।  রাজা বীরেন্দ্রর মৃত্যু নেপালের ইতিহাসের বড় ট্র্যাজেডি।  

নারায়ণহিতি রাজপ্রাসাদের ত্রিভুবন সদনে খুনের শিকার হয়েছিলেন রাজা।  সেই ত্রিভুবন সদন পরবর্তী রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ দেব এসে গুঁড়িয়ে দেন।  তবে রাজপ্রাসাদের ভেতরে ঘুরে ত্রিভুবন সদনের স্মৃতিচিহ্ন এখনও দেখা গেছে।  যে কক্ষে রাজা খুন হন সেখানে লেখা আছে বুলেটবিদ্ধ হবার ইতিহাস।  এর সামনেই খোলা মাঠের মতো একটি সবুজ ঘাসে ঘেরা জায়গায় যুবরাজ ও যুবরাণীসহ অন্যদের খুন করা হয়।  কয়েকজনকে খুন করে মরদেহ ফেলে দেয়া হয় রাজপ্রাসাদের ড্রেনে।  যুবরাজ দীপেন্দ্রকে পাওয়া যায় সেই ড্রেনের ভেতরে।  সেই সবুজ চত্বরে লেখা আছে তাদের বুলেটবিদ্ধ হবার ইতিহাস।

সেদিন যারা খুন হয়েছিলেন তারা হলেন, রাজা বীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব, রানী ঐশ্বরিয়া রাজ্যলক্ষী রানা শাহ দেব, যুবরাজ দীপেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব, যুবরাণী নিরজন, প্রিন্সেস শ্রুতি রাজ্যলক্ষ্মী, রাজার ছোট ভাই ধীরেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেব, রাজার বোন শান্তি ও শরাদা, শারদার স্বামী কুমার খাদগা এবং রাজার চাচাত বোন জয়ন্তী।

আহত হন রাজা বীরেন্দ্রর বোন শোভা, যুবরাণী শ্রুতির স্বামী কুমার গোরখ, রাজার ভাই জ্ঞানেন্দ্রর স্ত্রী কমল ও ছেলে পরশ এবং রাজার চাচাত কেটাকী চেষ্টার।

যাকে খুনের জন্য দায়ী করা হয়েছিল রাজা বীরেন্দ্রর ছেলে দীপেন্দ্রও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

কোমায় থাকা দীপেন্দ্রকে বীরেন্দ্রর মৃত্যুর পর রাজা ঘোষণা করা হয়েছিল।  কিন্তু চারদিন পর তিনি মারা যান।  এরপর সিংহাসনে বসেন বীরেন্দ্রর বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই জ্ঞানেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ দেব।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা গেছে, ১৯৭২ সালে রাজা মহেন্দ্র বীরবিক্রম শাহ দেব মারা যাবার পর বীরেন্দ্র নেপালের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।  ২০০১ সালের ১ জুন খুন হওয়ার দিন পর্যন্ত প্রায় ২৯ বছর নেপাল শাসন করেন বীরেন্দ্র।

রাজার হত্যাকান্ড তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কেশব প্রসাদ উপাধ্যায় ও প্রতিনিধি সভার স্পিকার তারানাথ রানাভাটকে নিয়ে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল।  ‍অসম্পূর্ণ তদন্ত শেষে কমিটি জানায়, বিয়ে নিয়ে জটিলতায় ক্ষিপ্ত হয়ে যুবরাজ দীপেন্দ্র মাতাল অবস্থায় সেই রাতে রাজপ্রাসাদের ডিনার পার্টিতে মেশিনগান দিয়ে মা-বাবা, ভাইবোন, চাচা, ফুফুসহ সবাইকে গুলি করে হত্যা করেন এবং পরে নিজেকেও গুলি করে আত্মাহুতি দেবার চেষ্টা করেন।  চারদিন পর তিনিও হাসপাতালে মারা যান।  ইংল্যান্ডে পড়ার সময় যুবরাজ দীপেন্দ্র প্রেমে পড়েন রানা দিব্যানীর।  তাকে বিয়ে করার কথা পরিবারকে জানালে মা রানী ঐশ্বরিয়া অমত দেন।  এ নিয়ে রাজ পরিবারে অসন্তোষ ছিল।

তবে এই ভাষ্য মানতে পারেননি নেপালের বেশিরভাগ জনগণ ও রাজনৈতিক নেতারা।

বিজয় থাপা বলেন, আমরা যেটা জানি, যুবরাজ দীপেন্দ্রকে রাজপ্রাসাদের যে সাঁকোর নিচ থেকে উদ্ধার করে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়, সেখানে কোন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পাওয়া যায়নি।  তাহলে সেই অস্ত্র কেন উদ্ধার করা গেল না ? সেই অস্ত্র গেল কোথায় ?

কিভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, যুবরাজই খুন করেছেন।  রাজপরিবারে থেকে কেউ কি এতটা নৃশংস হওয়ার শিক্ষা পেতে পারেন ?

‘অনেকে বলেন, জ্ঞানেন্দ্র রাজা হওয়ার জন্য বীরেন্দ্রকে সপরিবারে খুন করেছেন।  আমরা নিশ্চিত না হয়ে এটাও বিশ্বাস করতে চাই না।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই না যে, রাজপরিবারের কেউ এই খুনের সঙ্গে জড়িত।  কে খুন করেছে আমাদের রাজাকে, আমরা শুধু সেই প্রশ্নের সত্য উত্তর চাই। ’ বলেন বিজয় থাপা।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View