Mountain View

কালীপূজা ও দীপাবলির কথা

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৩০, ২০১৬ at ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

dipaboliকালীপূজা হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। শাক্ত বিশ্বাস মতে, শাক্তদেবী কালিকা বা কালী দশম বিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা। বিশ্বসৃষ্টির আদিকরণ তিনি। যারা শক্তির আরাধনা করেন তাদের বলা হয় শাক্ত। শাক্তরা কালীপূজা করেন। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহাময়ী। তন্ত্র ও পুরাণে কালীর কালীর অষ্টরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই অনুসারে দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালীর সন্ধান পাওয়া যায়।

প্রথমে আমরা অল্পকথায় জেনে নিই কালীর অষ্টরূপের মাহাত্ম্য।

দক্ষিণাকালী: দক্ষিণ দিকে যমের অবস্থান। কালীর ভয়ে সে পালিয়ে বেড়ায়। তাই এ কালী দক্ষিণা। তিনি করালবদনা, মুক্তকেশী ও চতুর্ভুজা। গলায় মুণ্ডমালা। বাম অধোহস্তে অভয়, ঊর্ধ্বহস্তে বরমুদ্রা। গাত্র শ্যামবর্ণ। তাই তিনি শ্যামাও বটে। দিগম্বরী। কর্ণভূষণ দুই শবশিশু। উন্নত স্তন যুগল। পরণে নরহস্তের কটিবাস। দক্ষিণ পদ শিবের বক্ষে স্থাপিত ও দক্ষিণামুখী।

শ্মশানকালী: শ্মশানকালী মহাশক্তির অন্যরূপ। তিনি অঞ্জনের মতো কালো অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণা। নেত্র রক্তবর্ণ। দেহ অতিশুষ্ক। এক হাতে মদপাত্র, অন্য হাতে নরমাংস। স্মিত আনন দেবী সদা মাংস চর্বণে ব্যস্ত।

সিদ্ধকালী: সিদ্ধকালী ব্রহ্মময়ী ভুবনেশ্বরী। দক্ষিণা কালীরই আরেক রূপ। সিদ্ধকালী মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান- আরাধ্যাদেবী হিসাবেই পরিচিতা। ত্রিনয়না মুক্তকেশী দেবীর দক্ষিণ হস্তের খর্গের আঘাতে চন্দ্রমণ্ডল থেকে ঝরে পড়ছে অমৃত বাম হাতের মাথার খুলির পাত্রে। দিগম্বরী, নীলোৎপলাবর্ণাদেবী তা পানরত। চন্দ্র ও সূর্য দেবীর কুণ্ডল। বামপদ শিবের বুকে দক্ষিণপদ শিবের দুই উরুর মধ্যস্থলে অধিষ্ঠিতা।

 গুহ্যকালী: গুহ্যকালীর অপর নাম আকালী। মহাকালসংহিতার মতে, তার মতো বিদ্যা ব্রহ্মাণ্ডে কারও নেই। সাধক আরাধ্য এই কালীর রূপ গৃহস্থদের কাছে অপ্রকাশ্য। ভয়ঙ্কর রূপকল্পটি এই রকম, গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ মেঘের মতো। লোলজিহ্বা ও দ্বিভূজা। পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা গলায়। ললাটে অর্ধচন্দ্র। গলায় নাগহার, মাথায় সহস্রফণা অনন্তনাগ, চার দিকে নাগফণায় বেষ্টিত। নাগাসনে উপবিষ্টা, বাম কঙ্কণে সর্পরাজ তক্ষক এবং দক্ষিণ কঙ্কণে নাগরাজ অনন্ত। বামে বৎস্যরূপী শিব। গুহ্যকালী শব মাংস ভক্ষণে অভ্যস্ত। নারদ ও অন্য ঋষিরা শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন। তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা, সাধকের অভিষ্ট ফলদায়িনী।

কালীপূজা-১

ভদ্রকালী: যে কালী ভক্তদের কল্যাণ বিধান করেন তিনিই ভদ্রকালী। কালিকাপুরাণের মতে ভদ্রকালী গায়ের রং অতসী ফুলের মতো। মাথায় জটাজুট, কপালে অর্ধচন্দ্র। তন্ত্রমতে তিনি মসীর মতো কৃষ্ণবর্ণ। মুক্তকেশী, কোটরাক্ষী, সর্বদা জগত্‌কে গ্রাস করতে উদ্যত। হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো পাস।

চামুণ্ডাকালী: চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুর বধের জন্য দুর্গার ভ্রূকুটি-কুটিল ললাট থেকে এই চামুণ্ডাকালীর সৃষ্টি বলে মার্কণ্ডেয়পুরাণ ও দেবীভাগবত পুরাণের মত। চামুণ্ডার গায়ের রং নীল পদ্মের মতো, পরণে ব্যাঘ্রচর্ম, অস্থিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। অস্ত্র দণ্ড ও চন্দ্রহাস। দুর্গাপুজোয় সন্ধিপুজোর সময় চামুণ্ডার পুজো করা হয়। মন্দিরে বা বাড়িতে আলাদা করে চামুণ্ডা পুজোর রীতি বঙ্গদেশে তেমন দেখা যায় না। তবে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চামুণ্ডার মন্দির রয়েছে।

মহাকালী: সংস্কারকারিণী কালরূপ মহাদেবী হলেন মহাকালী। শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুসারে মহাকালীকে আদ্যাশক্তি দশভূজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তন্ত্রসার গ্রন্থ অনুসারে তিনি আবার পঞ্চদশ নয়না। মহাকালীর দশ হাতে যথাক্রমে খড়গ, চক্র, ধনুক, বাণ, শঙ্খ, শূল, লগুড়, ভূশান্তি ও নরমুণ্ড। নীলকান্তমণিকুল্য প্রভাবিশিষ্টা সর্বালঙ্কারে সুশোভিতা এই দেবী। মধু ও কৈটভ নামক অসুরদ্বয়কে বিনাশ করার জন্য ব্রহ্মা মহাকালীর ধ্যান করেছিলেন।

শ্রীকালী: পুরাণ মতে শ্রীকালী দারুক নামে এক অসুরকে দমন করেন। এই কালীর গাত্রবর্ণ কালো। কারণ হিসাবে বলা হয় শ্রীকালী মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করায় তার কণ্ঠের বিষে কালীর গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ হয়। শিবের মতোই শ্রীকালী ত্রিশূলধারিণী ও সর্পযুক্তা।

কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কালট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

শ্যামা বা কালীপূজার সঙ্গে দীপাবলির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কালীপূজার দিনই দীপাবলি উৎসব পালন করা হয়। দীপাবলী বা দেওয়ালি সনাতনধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় মহোৎসব। এটি দেওয়ালি, দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা এবং যক্ষরাত্রি নামেও অভিহিত হয়। এই দিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয়। কেউ কেউ রাত্রিতে নিজগৃহে দরজা-জানালায় মোতবাতি জ্বালায়।

দীপাবলি মানে আলোর উৎসব। আনন্দের উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয়কে উদযাপন করা। আলোকসজ্জার এই দিবস অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালার দিন। নিজের ভেতরের বাহিরের সকল অজ্ঞতা ও তমকে দীপশিখায় বিদূরিত করার দিন। প্রেম-প্রীতি-ভালবাসার চিরন্তন শিখা প্রজ্বলিত করার দিন। দেশ থেকে দেশে, অঞ্চল থেকে অঞ্চলে- এই দিনের মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন; তবু মূল কথা এক। আর আধ্যাত্মিকতার গভীর দর্শনে এই দিন- আত্মাকে প্রজ্বলিত করে পরিশুদ্ধ করে সেই পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার দিন।

এ সম্পর্কিত আরও