বিসিএস প্রিলিমিনারি ফল নিয়ে অসন্তোষ, চলছে রিটের প্রস্তুতি

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ৫, ২০১৬ at ৯:০৯ অপরাহ্ণ

bpsc-rules

স্টাফ রিপোর্টার, বিডি টুয়ন্টিফোর টাইমস :  বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিপিএসসির সেকেলে ফলাফল পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে যাচ্ছেন চাকরিপ্রার্থী। গেল ১ নভেম্বর ৩৭ তম বিসিএস  প্রিলিমিনারি পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে পিএসসি। সেখানে ধারনাতীত কম সংখ্যা প্রার্থীকে টিকানোর পর থেকেই সমালোচনার ঝড় উঠে।

যারই ধারবাহিকতায় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিপিএসসির সেকেলে ফলাফল পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন লাখো চাকরিপ্রার্থী।   শনিবার ঢাকায় অবস্থানরত চাকরিপ্রার্থীরা সিদ্ধান্ত নেন রিট করার। যেখানে তাদের দাবী হচ্ছে- প্রিলিমিনারির রেজাল্ট প্রকাশ করতে হবে। কারণ পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে ৩৪ তম বিসিএসেও  পিএসসি কোটা অ্যাপলাই করার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছিলো। পরবর্তীতে রিটের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের দারস্থ হলে রায়ে পিএসসি প্রিলিমিনারিতে সবার জন্য একই কাট মার্ক নির্ধারণ করে ফলে কোটাধারীদের টিকাতে গিয়ে প্রার্থী সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার। পরবর্তীতে কিন্তু সেই প্রথম তালিকায় থেকে বাদপরা একজনই চূড়ান্ত নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন।

আব্দুল্লাহ আল নোমান নামের অপর একজন চাকরিপ্রার্থী বলেন,‘বিসিএস ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিণ প্রশ্ণ হয়েছিলো এবছর। সবাই বলাবলি করছিলো ৯০/৯১ কাট মার্ক হবে। অথচ এমন একটা জায়গাতে ১০২/১০৩ নম্বর পেয়েও টিকতে না পরাই বলে দেয় এখানে কোটার ব্যবহার হয়েছে। পিএসসি বরাবারের মতই বিষয়টি  অস্বীকার করবে। তাই আমরা উচ্চ আদালতের কাছে জানতে চাইব কেন প্রিলিমিনারি নম্বর প্রকাশ না করা  অবৈধ হবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন বলেন,‘দেশ কিন্তু সেই ২০ বছর পেছনে পরে নেই। যেখান থেকে আপনি চাইলেই দায় এড়াতে পারেন এই বলে, নম্বর প্রকাশ অনেক ব্যায় সাপেক্ষ কিংবা সময় সাপেক্ষ। এখানে কেবলই স্বচ্ছতা প্রকাশ করার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপার। বরং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যাবহারে এখন মূহুর্তেই কোটা ও নন কোটা আলাদা করা সম্ভব হয়।’ পিএসসির নীতিমালায় যেহেতু প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় কোটা ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই সেটা নিশ্চিত করতেই নম্বর প্রকাশের জোর দাবী জানাচ্ছি। সেজন্য দরকার হলে অামরা উচ্চ আদালতে রিট করব। কারণ পরীক্ষার পর প্রতিবারই এই অসঙ্গতি দেখা দেয়। সবার মনেই সংশয় থাকে বেশি নম্বর পেয়েও টিকলাম না আবার অনেকে কম নম্বর পেয়েও টেকে গেল।  এই জায়গাটিতে স্বচ্ছতার একমাত্র ‍উপায় হচ্ছে নম্বর প্রকাশ।

খাইরুল ইসলাম নামের একজন চাকরিপ্রার্থী বলেন‘ ৩৪ তম বিসিএসে পিএসসি গোপনে প্রিলিতেই কোটা অ্যাপলাই করে। এ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেথা দিয়েছিলো। এবারও যে প্রিলিতে কোটা অ্যাপলাই হয় নাই তার গ্যারান্টি কে দিবে? আমরা আরও স্বচ্ছতা দাবি করছি। এটা বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন। অার আমরা বাংলাদেশেরই নাগরিক।

এত কম সংখ্যক প্রার্থী টেকানো বিষয়ে তিনি আরও বলেন-দেখুন সবাই আমার সাথে একমত হবেন, প্রিলিমিনারি মেধা যাচাইয়ে সেরা মাধ্যম নয়। এটা কেবলই মেধাবীদের বাছাইয়ের প্রাথমিক একটা প্রক্রিয়া। ভুলে যাবেন না ্রপতিবছর এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ৩০ হাজার প্রার্থী বিসিএসে অংশ নেন। বুয়েট আর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্বদ্যিালয় ধরলে সংখ্যাটা ৫০ হাজার হয়ে যায়। েএর বাইরেও সরকারি মেডিকেল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ আরও অনেক নামকরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যায় যেখানকার সেরা শিক্ষার্থীরাই বিসিএসে অংশ নেন। এদের কে আপনি কোন ভাবেই অযোগ্য বলতে পারেন না। কিছু দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার পদেও  ১৫০ পোস্টের বিপরীতে ১০ হাজার জনকে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সযোগ দেয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু হুজাইফা জাকারিয়া বলেন, ‘ আমি এই ফল কোন ভাবেই  মানতে  পারছি না। পিএসসি কিভাবে মাত্র ৮ হাজারজনকে বাছাই করল? এই অাট হাজারই কি বাকিদের চেয়ে যোগ্য? প্রার্থীদের যোগ্যতাম মাপার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে লিখিত পরীক্ষা। সেখানে বেশি করে প্রার্থীতে সুযোগ না দিলে প্রকৃত মেধাবীকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে না। বিগত ২০ বছরের ফলাফল দেখুন । বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রিলিমিনারিতে ২০ হাজার সংখ্যক প্রার্থীকে টেকানো হয়েছে। ৮ হাজার কোন ভাবেই মানতে পারছি না। পিএসসির কি সময়ের অভাব নাকি অর্থ ও লোকবলের অভাব? প্রতি বছর ২০ কোটি টাকা নিচ্ছে প্রার্থীদের কাছ থেকেই এরপরও তো অর্থ সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে কেন ১৫-২০ হাজার প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নিতে অনীহা?

অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট এর বরাত দিয়ে শামিম ওসমান নামের এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘তথ্য জানার অধিকার সবারই আছে। আজকাল ভোটও হয়ে থাকে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে। আর পিএসসি পরে আছে সেই অন্ধকার যুগে। কার স্বার্থে নম্বর গোপন করা হচ্ছে? প্রয়োজন হলে আমরা কোর্টে যাব। তবু জাতির ভবিষ্যত নিয়ে এরকম লুকুচুরি খেলতে দেয়া হবে না। অামরা সবাই জানার অধিকার রাখি কে কত নম্বর পেয়েছে। নাকি পিএসসি ভয় পাচ্ছে গোমর ফাঁস হয়ে যাবে বলে? আমরা আমাদের নৈতিক দাবী আদায়ে আরও বেশি প্রচার প্রচারণা চালাব। আমরা চাই বিসিএসে হউক একটি স্বচ্ছ বাছাই প্রকিয়া।

সোহেল আরমান নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ মন চাইল আর ৭ হাজার ৮ হাজার জনকে টিকিয়ে বাকিদের বাতিল মাল করে দিলাম এমনটা তে পারে না। আমি হলফ করে বলতে পারি বাদ পরাদের অনেকই আছেন যারা লিখিত ও ভাইভাতে অনেক ভালো ফল করতে পারত। তাদের ভবিষ্যত নিজের মনের চাওয়া ও দায়িত্বের বোঝা কমাতে ধ্বংস করে দেয়ার অধিকার পিএসসির নেই। আমরা চাই নিা কোন গোপন নীতিমালা। আগেই থেকেই নির্ধারণ করে দেয়া হউক পোস্টের অনুপাতে কতজনকে প্রিলিতে টিকানো হবে। কিংবা মার্কস নির্ধারন করে দিকে ১০০ তে পাশ মার্ক। তাহলে বিষয়টা ক্লিয়ার হয়ে যায়।’

আলাল হোসেন  আবির নামের আরেক চাকরি প্রার্থী বলেন,‘ আমাদের মাত্র ২ টি নৈতিক দাবি। প্রথম দাবি প্রিলি থেকে – রিটেন নাম্বার প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয় দাবী পোস্ট অনুযায়ী একটা অনুপাত নির্ধারন করে দিতে হবে। সেটা হতে পারে প্রিলিতে ১:১০ রিটেনে ১:৫ । এমনটা হলে বিসিএস নিয়ে কারও কোন অভিযোগ থাকবে না। মন চাইল আর ঘ্যাচাং করে ১০ হাজার মেধাবীর ভবিষ্যতকে কেটে ফেলে দিলাম এটা হতে পারে না। কারও মনগড়া আর ইচ্ছায় আমাদের ভবিষ্যত নির্ধারিত হতে পারে না। আমরা চাই প্রার্থী বাছাইয়ে সুস্পষ্ট ও আগাম নীতিমালা।

এমনটা হলে সবার জন্যই কল্যানকর হবে। কারণ বেশিরভাগই কিন্তু ৬/৭ বার বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ন হন। সেখানে কোন কোন বিষয়ে কত মার্কস পেলেন সেসব দেখতে পেলে নিজেকে যোগ্য করে তোলার সঠিক নির্দেশনা পাবেন প্রার্থীরা। অন্যদিকে দেশও পাবে সেরা আমলাদেরকে।

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পিএসসির ফলাফল প্রকাশের যে নীতি অনুসরণ করে আসছে সেটার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ৩৭ তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেয়া চাকুরিপ্রার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ঘুরে বিশেষ প্রতিবেদনে সেসব দিক তুলে ধরছেন বিডি টুয়েন্টিফোর টাইমস ডট কমের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট।

বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকে ভাইভা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক অজানা কারণে কঠোর গোপনীয়তার নীতি অনুসরণ করে থাকে পিএসসি। ১০ বছর আগে সেটা অনেকটা স্বাভাবিক হলেও তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে এটা খুবই লজ্জাজনক ও বিব্রতকর হিসেবে দেখছেন চাকুররিপ্রার্থীরা।

আব্দুল্লাহ আল মিকদাদ নামের একজন চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘ দেশে নাকি একসেস টু ইনফরমেশন আইন আছে! যদি সেটা থেকেই থাকে তাহলে পিএসসির এই ফলাফল পদ্ধতি অবশ্যই অবৈধ হতে হবে। পরীক্ষা দিলাম অথচ জানলামই না কত নাম্বার পেলাম। অনেককেই দেখা গেছে কম নাম্বার পেয়েও প্রিলিমিনিরীতে পার পেয়ে যায়। অনেকেই এক্ষেত্রে কোটা বিশেষ অবদানের কথা উল্লেখ করেন।

জাকিয়া ইসলাম নামের আরেক চাকরিপ্রার্থীর অভিযোগ,‘ যেখানেই কোন কিছু লুকানোর চেষ্টা থাকে সেখানেই দূর্ণীতি থাকে। আমরা প্রিলিমিনারি পরীকক্ষায় নম্বর দেখতে চাই। আমরা রাষ্ট্রের কাছে স্বচ্ছতা দাবি করছি।

খাইরুল ইসলাম নামের আরেক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘ এই দেশে আন্দোলন ও রিট ছাড়া কোন দাবী দাওয়া আদায় হয়নি। এটা যেহেতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যত আমলাদের বাছাইয়ের মাধ্যম তাই আমি শতভাগ স্বচ্ছতা দাবী করছি। কে কত নম্বর পেয়েছি এটা জানার অধিকার সবার। পিএসসি যদি সেটা না করে তাহলে আমরা সেটা করাতে বাধ্য করব। দরকার হলে লাখো চাকরিপ্রার্থীদের নিয়ে এই জায়গাটিতে স্বচ্ছতা আনতে বাধ্য করব। দরকার হলে হােইকোর্টে রিট করব।’

 ধরে সেই মান্ধাতার আমলের ফলাফল প্রকাশের পদ্ধতি অবলম্বন করে আসার ধারাবাহিকতায় আরও একবার সেভাবেই ৩৭ তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে।  কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে কেন সেই মান্ধাতার আমলের মত ফলাফল প্রকাশ। কার স্থার্থে রাষ্ট্রের সামর্থ্য থাকা সত্বেও কেন এত গোপনীয়তা? এমন প্রশ্নই সবার মুখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো যেখানে ২/৩ দিনের মধ্যে রেজাল্ট প্রকাশ করে । সেই সাথে পরীক্ষার্থীরা কে কেন বিষয়ে কত মার্কস পেল সেটাও জানতে পারে। সম্মিলিত মেধাতালিকাও প্রকাশ থাকে সেখানে। যার সবকিছুই জানতে পারেন পরীক্ষার্থীরা। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষার বেলায় কিসের যেন এক অদৃশ্য গোপনীয়তা ভর করে আছে পিএসসিতে। যেটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে যার কোন পরিবর্তন নেই। অথচ পিএসসি চাইলেই পারে উত্তীর্ন সবার প্রাপ্ত নম্বর সহ ফলাফল প্রকাশ করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের কৃতী শিক্ষার্থী আবু হুজাইফা জাকারিয়া বলেন,‘ যারা বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন সবাই মেধাবী। এদের অনেক হয়থ প্রিলিতে ভালো করতে পারেন আবার অনেকে রিটেনেও ভালো করতে পারেন। কিন্তু ফলাফল নিয়ে পিএসসির এই গোপনীয়তা কিসের উদ্দেশ্যে? আমরা যদি পরীক্ষা দিয়ে নাই দেখতে পারলাম কে কত পেয়েছি তাহলে তো এখানে স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা প্রিলিমিনারিতেই প্রাপ্ত নম্বর দেখতে চাই।’

বিষয়টি নিয়ে এত দিন তেমন আলোচনা-সমালোচনা না হলেও ৩৭ তম প্রিলিমিনারিতে মাত্র ৮ হাজার ৫০০ জনের মতকে লিখিত পরীক্ষার জন্য বিবেচিত করায় অনেকের মধ্যেই দেখা গেছে তীব্র ক্ষোভ আর নিন্দা। সবার দাবি একটাই প্রিলি থেকে রিটেন সব জায়গাতেই নম্বর প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ সম্পর্কিত আরও