Mountain View

আদালতে সাক্ষ্য বিনা উসকানিতে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলি

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৬, ২০১৬ at ৭:১৩ পূর্বাহ্ণ

1988

স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে বিনা উসকানিতে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল বলে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রবীণ সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন চৌধুরী।  সাক্ষ্যে তিনি দাবি করেছেন, সেদিন পুলিশের গুলিবর্ষণের টার্গেট ছিল শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক।

গত ২৮ বছর আগের ঐতিহাসিক গণহত্যা মামলায় গতকাল (মঙ্গলবার) ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মীর রহুল আমিনের আদালতে সাক্ষ্য দেন দৈনিক আজাদীর তৎকালীন সিনিয়র রিপোর্টার হেলাল উদ্দিন চৌধুরী।  একইদিন জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র লালাও আদালতে সাক্ষ্য দেন।

বিভাগীয় বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, হেলাল উদ্দিন চৌধুরী এবং সুভাষ চন্দ্র লালার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক এই মামলায় ৪১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।  আদালত ৩১ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী সময় নির্ধারণ করেছেন।

আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী জানান, ঘটনার দিন তিনি দৈনিক আজাদীর সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে আট দলীয় জোটের নেত্রী শেখ হাসিনার লালদিঘি ময়দানের জনসভার সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।  বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা জনসভাস্থলে আসার সময় অগ্রবর্তী দল হিসেবে তিনি স্কুটারে ছিলেন।  এসময় পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ছিল।

কোতয়ালি মোড়ে শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাক পৌঁছানোর পর হেলাল উদ্দিন চৌধুরী স্কুটার থেকে নেমে যান।  এসময় কোতয়ালি মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আশপাশের এলাকায় কোন ধরনের উত্তেজনা দেখেননি বলে সাক্ষ্যে জানিয়েছেন হেলাল উদ্দিন।

‘ট্রাকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আসার পর পুলিশ প্রথমে টিয়ার শেল, পরে এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ ও গুলি ছুঁড়ে পুলিশ।  আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশে নালায় পড়ে যাই।  আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ট্রাকটি বেস্টন করিয়া ছিল।  ট্রাকের হেলপার আব্দুল মান্নান গুলিবিদ্ধ হইয়া ঘটনাস্থলে মরে যায়।  বেশ কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়িয়া ছিল। ’

‘এসময় শেখ হাসিনা বারবার মাইকে গুলি বন্ধের নির্দেশ দিচ্ছিলেন।  আমি কোতয়ালির ওসি সাহাবুদ্দিনকে জিজ্ঞেস করি-শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি চালালেন কেন ? তিনি বলেন ওপরের অর্ডার আছে।  পিআই জে সি মন্ডল বলেন, পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে অ্যাকশনে গিয়েছেন। ’ বলেন হেলাল উদ্দিন চৌধুরী।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নগরীর লালদিঘি ময়দানে সমাবেশে যাবার পথে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালালে নিহত হন ২৪ জন।  আহত হন কমপক্ষে দুই শতাধিক মানুষ।

আদালত সূত্র জানায়, এরশাদ সরকারের পতন হলে ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে প্রয়াত আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদি হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।  মামলায় হত্যাকান্ডের সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের দায়িত্বে থাকা মীর্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়।

মামলার আসামিরা সরকারি কর্মচারি হওয়ায় এবং মামলা চালানোর জন্য সরকারের অনুমতি না মেলায় আদালত মামলাটি ওই সময় খারিজ করে দেয়। পরবর্তীতে বাদিপক্ষ উচ্চ আদালতে রিভিশন মামলা দায়ের করলে মামলাটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডির ওপর দায়িত্ব পড়ে।

 মূলত ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করলে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়।  আদালতের নির্দেশে সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি সিএমপির তৎকালীন কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মীর্জা রকিবুল হুদাসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জ‍শিট দাখিল করে।

অভিযুক্ত অন্যরা হল কোতোয়ালী জোনের তৎকালীন পেট্রল ইন্সপেক্টর (পিআই) জে.সি. মন্ডল, পুলিশ কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মুশফিকুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো: আব্দুলাহ ও মমতাজ উদ্দিন।  জে.সি.মন্ডল ছাড়া অন্য সবাই উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে আছেন।  ঘটনার পর থেকে জে.সি. মন্ডল পলাতক আছেন।

আদালতে দুই দফায় আলোচিত এ মামলার চার্জ গঠন (দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত আকারে) করা হয়।  প্রথম দফায়  ১৯৯৭ সালের ৫ আগষ্ট এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০০ সালের ৯ মে ৮ আসামির বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/৩২৬/৩০৭/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

ইতিহাসের নৃশংসতম চট্টগ্রাম গণহত্যা মামলাটি প্রায় ২৮ বছর চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর ‍দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন থাকার পর গত জানুয়ারিতে সেটি পাঠানো হয় বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View