Mountain View

বিস্মৃত ‘সুপার সাব’ মারুফ

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৬, ২০১৬ at ৮:০৯ অপরাহ্ণ

maruf

‘আপনার হাতে মার আছে, আপনি মারেন। না মারলে আপনি রানও পাবেন না। আর রান না পেলে আমি আপনাকে নিয়মিত খেলাবও না। আপনি মারলেই রান হবে আর রান হলেই আপনাকে খেলাব। আপনাকে মারতে হবে, না মারলে আপনাকে কেউ চিনবেও না।’

অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের কাছ থেকে ব্যাট হাতে অবাধে মারার স্বাধীনতা পেয়ে যেতেই যেন ‘অচেনা’ মেহেদী মারুফকে চেনার শুরু সবার। ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যান্য আসরের পরিচিত মুখ হলেও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরা নাম অবশ্যই ছিলেন না ঢাকা ডায়নামাইটসের ওপেনার। কিন্তু চলতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) তাঁর ব্যাটে বিস্ফোরণের ফুলকি ছুটতেই যেন নিজেকে অন্য এক ভুবনে আবিষ্কার করলেন বছর দশেকের ক্যারিয়ার পেছনে ফেলে আসা এই তরুণ, ‘গত ১০ দিনে আমাকে মানুষ যে রকম চিনেছে, গত ১০ বছরেও তা চেনেনি।’

লোকে তাঁকে ক্রিকেটের সেই ফরম্যাটে এসেই চিনছে, যেখানে মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ের চাহিদাই থাকে সর্বোচ্চ। কোচ খালেদ মাহমুদ আর অধিনায়ক অভয় দেওয়ার পর আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটতে থাকা মারুফ নিজ দলের প্রথম ম্যাচ থেকেই সে দাবি মেটাতে শুরু করে দিয়েছেন। তাঁর বিস্ফোরক ব্যাটিংয়েই তো বরিশাল বুলসের ১৪৮ রান তাড়া করতে নামা ঢাকা চার ওভার বাকি থাকতেই দেখেছিল অনায়াস জয়ের তীর। মাত্র ৪৫ বলে পাঁচটি করে বাউন্ডারি আর বিশাল ছক্কায় তাঁর হার না মানা ৭৫ রানের ইনিংসটিই রাতারাতি সর্বসাধারণের দৃষ্টিসীমায় নিয়ে আসে মারুফকে।

অথচ এক যুগেরও বেশি সময় আগে এ রকম ব্যাটিংয়ের জন্যই কোচদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ট্রায়াল ছিল তখন প্রথম বিভাগের দল কাঁঠালবাগান গ্রিন ক্রিসেন্ট ক্লাবের। কিন্তু নেটে নেমে প্রতি বলেই চালাতে গিয়ে ব্যাটে-বলে হচ্ছিল না ঠিক। ব্যস, বলে দেওয়া হয় যে তাঁকে রাখা হচ্ছে না। তবু পরদিন আরেকটি সুযোগ চাওয়া মারুফের তখন ঢাকায় রাত্রিযাপন নিয়েও দুশ্চিন্তা, ‘‘কাঁঠালবাগান ক্লাব থেকে বলা হয়েছিল, ‘ঢাকায় কোথাও থাকার ব্যবস্থা থাকলে করে নাও। আমাদের এখানে জায়গা নেই।’ আমি বলেছিলাম, ‘ঢাকায় আমারও থাকার জায়গা নেই। তবে আমি ম্যানেজ করতে পারব।’ দলের কিছু ক্রিকেটারের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল আমার। সেই সূত্রে রাতে ক্লাবের ছোট্ট একটি রুমের মেঝেতে ঘুমানোর সুযোগ পাই।’’

পরদিন কোনোমতে নিজেকে গুটিয়ে রাখা ব্যাটিং তাঁকে ট্রায়ালে পার করে নিলেও ধীরগতির ব্যাটিং মারুফের মোটেও পছন্দের নয়, ‘যেহেতু আমি মারতে পছন্দ করি, তাই তিন ফরম্যাটের মধ্যে সবার পরে রাখি বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচকে। আর ছোটবেলা থেকেই আমার মাথায় গেঁথে আছে যে ছক্কা মারলেই রান বেশি হয়, আর দর্শকদের পছন্দও ছক্কা বা চার।’ ঢাকার ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে এভাবে খেলার স্বাধীনতা পেয়ে যেতেই অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না এ মারকুটে ব্যাটসম্যানকে, ‘আমাকে দলের স্কোরের দিকেও তাকাতে হয় না। আমি শুধু নামি, বল দেখি আর মারি।’ ডায়নামাইটসের চতুর্থ ম্যাচে বেদম মেরেছেন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বোলারদেরও। এবার ৩৯ বলে চার বাউন্ডারি ও তিন ছক্কায় তাঁর ৬০ রানের ইনিংস দলকে ২০০ ছোঁয়া স্কোরের পথও দেখায়।

পথের দেখা পাওয়া মারুফের ক্যারিয়ারও একসময় ঝলমলে সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে পথ হারিয়েছিল। বিকেএসপিতে এক ক্লাসের ছোট সাকিবের সঙ্গে খেলার শুরু সেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ ক্রিকেট দলের হয়ে। দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছেন টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, শামসুর রহমান এবং সোহরাওয়ার্দী শুভকেও। এঁদের সঙ্গে তামিম ইকবালও তাঁর সতীর্থ, খেলেছেন শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ২০০৬ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। সেই আসরের পর সবাই যখন ক্রমাগত ওপরে ওঠার সিঁড়ি ভেঙেছেন, তখন ‘সুপার সাব’ মারুফ শুধুই নেমেছেন।

সুপার সাব? রহস্যটা তাঁর মুখ থেকে শুনে নিলেই ভালো, ‘‘ওই যুব বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচের দল হতো ১২ জনের, এদের মধ্যে একজন থাকত ‘সুপার সাব’। ১১ জনই ফিল্ডিংয়ে নামত, তবে আমার জায়গায় নামত একজন বোলার। আর ব্যাটিংয়ের সময় ওই বোলারটা বসে থাকত, আমি ব্যাটিং করতাম। আমি প্রতি ম্যাচেই ‘সুপার সাব’ থাকতাম। ওই আসরটি খুব একটা ভালো যায়নি আমার।’’ না যাওয়ার ফল, ‘ওটা এমন একটা পর্যায় যে ওখান থেকে হয় আপনি ওপরের দিকে যাবেন নয়তো নিচে নামবেন। মুশফিক-তামিমরা ওপরের দিকে গেছে আর আমি নিচের দিকে।’

সে জন্য পারিবারিক কিছু সমস্যার জন্য মনোযোগ হারিয়ে ফেলা মারুফ নিজেকেও দোষারোপ করতে ছাড়েন না, ‘মুশফিকসহ অন্যরা যখন অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট শেষ করে প্রিমিয়ার লিগ, ‘এ’ দল ও জাতীয় দলে খেলে, তখন আমি বড়জোর প্রথম বিভাগে খেলার যোগ্য। পারফরম্যান্স আমার ওরকমই ছিল।’ সেই থেকে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলারও সুযোগ হয়নি তেমন, ‘২০০৭ সালে বরিশালের হয়ে দুয়েকটা ম্যাচ খেলার পরই ইনজুরিতে ছিটকে পড়লাম। এরপর সাত-আট বছর ফার্স্ট ক্লাসেই আর সুযোগ হয়নি। ২০১৩ থেকে ঢাকা মেট্রোতে আছি, তবে খেলার সুযোগ আসে কেবল অন্যরা ব্যর্থ হলেই।’

এখানেও বদলি খেলোয়াড় মারুফ অবশ্য ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে দারুণ ধারাবাহিক। সব শেষ লিগে প্রাইম ব্যাংকের হয়ে করেছেন ৫০০ রান। তার আগের লিগে প্রাইম দোলেশ্বরের হয়ে টানা দুই সেঞ্চুরিসহ ৫৭৭ রান করা টাঙ্গাইলের এই তরুণ তবু সর্বজনীন নাম হয়ে উঠতে পারছিলেন না। হতে হলে মারতে হতো এবং সাকিবের কথামতো মেরে মারুফ এবার বেশ পরিচিত নাম হয়ে ওঠার পথেও!

এ সম্পর্কিত আরও