দিনাজপুরে হাজীদের সাথে প্রতারণা, দুই হাজীর মৃত্যু

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৮, ২০১৬ at ১:০১ অপরাহ্ণ

হজে গমনেচ্ছুকদের সাথে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতসহ সৌদি আরবে হাজীদের নির্যাতন, নিপিড়নের অভিযোগ উঠেছে জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ভুয়া রশিদ দিয়ে হাতিয়ে দিয়েছে কোটি কোটি টাকা। full_1695312000_1479451248

সরকারের খাতায় কালো তালিকাভুক্ত এই জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ এর প্রতারণার খপ্পরে পড়ে দিনাজপুর, বগুড়া, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলার হজ্ব যাত্রীরা সর্বশান্ত হয়েছে। এ নিয়ে কয়েকদিন আগে হজ্ব থেকে ফিরে আসা হাজীদের আর্তনাত, আহাজারী ও কান্নায় প্রকম্পিত হয়ে উঠে দিনাজপুর চেম্বার ভবন। দিনাজপুর চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাট্রিতে আলহাজ্ব মোঃ হাকিউল ইসলাম হাকির দায়েরকৃত অভিযোগ সূত্রে দিনাজপুরে অবস্তিত জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস এর স্বত্বাধিকারী মাওলানা জোবায়ের সাঈদের প্রতারনার ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে।

আলহাজ্ব হাকিউল ইসলাম হাকিসহ ৩ শতাধিক হাজী প্রতারক জোবায়ের সাঈদ ও তার দালাল এ্যাডভোকেট মিজানুর রহমানের বিচার দাবি করেন। দিনাজপুর চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিতে
৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় এ নিয়ে এক শালিস বৈঠকে বসে। শালিশ বৈঠকে বগুড়া জজ কোর্টে আইনজীবী এ্যাড. মোঃ মোজাম্মেল হক ক্রদনরত কন্ঠে আত্মচিৎকারে শালিশ বৈঠকে জানান, জোবায়ের সাঈদ ভুয়া জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ এর রশিদ দিয়ে শত শত হাজীর সাথে কোটি কোটি টাকা প্রতারণা করছেন।

জোবায়ের সাঈদের কোন নিজস্ব লইসেন্স নেই। অথচ ওই নামে অর্থ আদায় করছে। জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ একটি সরকার বাজেয়াপ্ত অঅনুমোদিত হজ এজেন্ট। হজ্ব গমনেচ্ছুকদের কাছে কোটি কোটি টাকা নিলেও ঢাকায় হাজ্বীক্যাম্পে তাকে খুজে পাওয়া যায়নি। অনেকেই নিজের টাকা দিয়ে ভিসা নিয়েছে। বাড়ী থেকে বিদায় নিয়ে গেলেও হজে যেতে পারেননি অনেকে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভুয়া জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস ঢাকার নর্থ ওয়েস্ট ট্রাভেলস্, ইকরা ট্রাভেলস ও এ্যারিজোনা ট্রাভেলস্ এর মাধ্যমে হজে গমনচ্ছুকদের সাথে এই প্রতারণা করে চুক্তির চেয়েও অতিরিক্ত টাকা আদায় করেছে। হজ্ব গমনেচ্ছুক ব্যক্তিদের জমজম টাওয়ারে রাখার কথা বললে রাখা হয় নিম্নমানের ভাড়া করা বাড়িতে। খাওয়া দাওয়া নিম্নমানের। পরিবহনের ব্যবস্থাও খারাপ। হজ যাত্রীদের অবননীয় দুঃখ, কষ্ট ও মানষিক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে।

চিকিৎসার অভাবে ২ জন হাজীর মৃত্যু হয়েছে। জোবায়েরের দালাল এ্যাডভোকেট মোঃ মিজানুর রহমানসহ একাধিক দালাল দিনাজপুরসহ কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার আবু বক্কর সিদ্দিক সালিশ বৈঠকে জানান, ১৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নিয়েও সৌদি আরবে তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলার অহিদুর ইসলাম প্রধান সালিশ বৈঠকে জানান, জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ এর নামে তার কাছ থেকে ৫ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি হজ্বে যেতে পারেননি।

দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর আলহাজ্ব মোঃ শরিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, জোবায়ের সাঈদ দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস্ এর রশিদ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হজ গমনিচ্ছুকদের কাছ থেকে আদায় করছেন। কিন্তু প্রশাসন কোন খোঁজ রাখেনি। চুক্তির পরেও যাওয়ার পূর্বে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা জনপ্রতি অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা না দিলে হজ্বে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ওই অতিরিক্ত টাকার সাথে জড়িত ঢাকার নর্থ ওয়েস্ট ট্রাভেলস্, ইকরা ট্রাভেলস ও এ্যারিজোনা ট্রাভেলস্ বলে হাজীদের দাবি। ওই ৩ ট্রাভেলস’র মাধ্যমে সৌদি আরব পৌছা মাত্র বিভিন্ন ভাবে টাকা আদায় শুরু হয়। চুক্তি মোতাবেক খাওয়া দাওয়া, থাকা,কোন কিছুর সহযোগিতা করা হয়নি বলে ভুক্তভোগী হাজীরা অভিযোগ করেন।

দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা নিবাসী শরীফ আহমেদের পরিবারের ৩ সদস্যর জন্য জোবায়েরের দালাল এ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান ৯ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা চুক্তি করে। হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা যাওয়া কয়েকদিন পূর্বে আরও ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নেয় এ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান। এধরণের অসংখ্য হাজীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জোবায়ের সাঈদ শালিস বৈঠকে হাজির হয়ে হাজীদের সাথে প্রতারণা, নির্যাতন ও নীপিড়নের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা ফেরত ও যারা যেতে পারেননি তাদের টাকা ফেরত দেয়ার অঙ্গীকার করেন। স্বীকার করেন জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস নামে তার কোন এজেন্সি নেই।

শালিস বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দিনাজপুর চেম্বার অব কর্মাসের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সালিশ কমিটির আহবায়ক আনোয়ারুল ইসলাম, দিনাজপুর চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি রেজা হূমায়ূন ফারুক চৌধুরী শামীমসহ চেম্বারের ১৩ কার্যনির্বাহী সদস্য উপস্থিত ছিলেন। শালিস বৈঠকের সভাপতি আনোযারুল ইসলাম টাকা ফেরতে প্রতারিত হাজীদের ৭ দিনের মধ্যে চেম্বার বরাবরে দরখাস্ত দেয়ার অনুরোধ জানান।

ভুক্তভোগী হাজীরা ভুয়া প্রতিষ্ঠান, প্রতারক জোবায়ের সাঈদসহ দালালদের প্রতিহত করতে হাজী কল্যান মনিটরিং সেল নামে একটি সংগঠন গঠন করেছে। এই সংগঠনের আহবায়ক আলহাজ্ব কাজী মোঃ আব্দুল হালিম ও সদস্য সচিব আলহাজ্ব মোঃ হাকিউল ইসলাম।

আহবায়ক আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল হাকিম বলেন, হজ গমনেচ্ছুকদের রশিদ মূলে অর্থ নেয়ার কোন অধিকার মাওলানা জোবায়ের সাঈদের নেই। জোবায়ের সাঈদের একটি প্রতারক চক্র রয়েছে কয়েকটি জেলায়। ভুয়া জোবায়ের এয়ার ট্রাভেলস এর রশিদ মূল্যে প্রায় ৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে তিনি বলেন।

এ সম্পর্কিত আরও