ঢাকা : ৩০ মার্চ, ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site

লাউহাটির রমজান আলীর ব্রাশ শিল্প পাল্টে দিয়েছে গোটা এলাকা

aaww

মোঃনাজমুল হাসানঃ রমছোটবেলায় মাকে হারান তিনি। বাবা দিনমজুর। লেখাপড়া দূরের কথা, ঠিকমতো দুবেলা দুমুঠো খাবারও জুটত না। তাই মাত্র ১২ বছর বয়সে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে যান। কাজ পান জুতার ব্রাশ তৈরির কারখানায়। সেখানে কাজ শিখে নিজ গ্রামে ফিরে ব্রাশ তৈরির কারখানা করেন। ধীরে ধীরে পাল্টে যায় গ্রামের চিত্র। গ্রামের ঘরে ঘরে এখন ব্রাশ তৈরির কারিগর। ব্রাশ দিয়ে অভাব মোচন করেছেন তাঁরা। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি ইউনিয়নের হেরেন্দ্রপাড়া গ্রামের চিত্র পাল্টে দেওয়া মানুষটির নাম রমজান আলী (৫২)। শুরুর কথা: তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় রমজান। দিনমজুর বাবা শহিদ আলীর (৭২) আয়ে কোনোরকমে চলত সংসার। এক বেলা খাবার জুটলে অন্য বেলা উপোস কাটাতে হতো।

এর মধ্যে মাও মারা গেলেন। অভাবের তাড়নায় ১২ বছর বয়সেই ভাইবোন আর নিজ গ্রাম ছেড়ে কিশোর রমজান এক আত্মীয়ের সঙ্গে ঢাকায় চলে যান। সেটা ১৯৭৫ সালের কথা। কিছুদিনের মধ্যে ঢাকার লালবাগ এলাকায় একটি ব্রাশ তৈরির কারখানায় কাজ জোটে তাঁর। কাজ করতে থাকেন আপন মনে। সেখানে টানা ১০-১১ বছর কাজ করেন রমজান। হয়ে ওঠেন ব্রাশ তৈরির দক্ষ কারিগর। তখন ভাবতে থাকলেন, নিজেই কিছু করা যায় কি না। সেই ভাবনা থেকেই ব্রাশ তৈরির কারখানা গড়ার উদ্যোগ নিলেন। ছেড়ে দিলেন কারখানার কাজ। এর মধ্যে বিয়ে করে সংসারও পাতেন। ঢাকায় নিজের ভাড়া বাসায় স্ত্রী নার্গিস বেগমকে নিয়ে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করলেন। এরপর মহাজনদের কাছ থেকে চাহিদা নিয়ে ব্রাশ তৈরি করে তা সরবরাহ শুরু করলেন। দিন দিন তাঁর ব্রাশের চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই অর্থে কারখানা করতে পারেননি।

কারণ, ঢাকায় কারখানা করতে অনেক পুঁজি দরকার। দরকার লোকবলেরও। গ্রামে ফেরা: আট থেকে দশ বছর আগে গ্রামে ফিরে বাবার বাড়ির উঠানে একটি ঘর তুলে রমজান ব্রাশ তৈরি শুরু করলেন। দক্ষ কারিগর রমজান ও তাঁর স্ত্রী নার্গিস প্রথমে আশপাশের বাড়ির নারীদের কাজ শেখালেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই হেরেন্দ্রপাড়ার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে ব্রাশ তৈরির কাজ। রমজান জানালেন, প্রথমে যখন ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন, তখন গ্রামের অনেকেই তাঁকে বলেছেন, ভুল সিদ্ধান্ত হলো। গ্রামে ব্রাশ তৈরির কারিগর পাওয়া যাবে না, আরও নানা সমস্যা পোহাতে হবে। কিন্তু দমে যাননি রমজান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ শিখিয়ে কারিগর তৈরি করেছেন। ব্রাশ তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহ করেছেন। এভাবে তাঁর ওপর মানুষের আস্থা গড়ে তুলেছেন—জানালেন তিনি। রমজান বলেন, শুরুতে লোকবলের অভাবে ব্রাশের উৎপাদন কম হতো।

তবে এখন তাঁর কারখানায় মাসে ১০ হাজার ব্রাশ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে কিছু কোট ব্রাশও তৈরি করা হয়। ব্রাশপ্রতি পাঁচ টাকা পর্যন্ত লাভ ধরে আকারভেদে একেকটি ব্রাশ তিনি বিক্রি করেন ১৬ থেকে ২৫ টাকা দরে। খরচ বাদে মাসে গড়ে তাঁর আয় হয় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। ব্রাশ তৈরি করে তিনি এগুলো ঢাকার চকবাজারের পাইকারি বাজারে পাঠিয়ে দেন। সরেজমিনে একদিন: সম্প্রতি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, দোচালা কারখানা ঘরটিতে ব্রাশ তৈরিতে ব্যস্ত ১৪ থেকে ১৫ জন নারী-পুরুষ কারিগর। কেউ কাঠ কেটে ব্রাশের ‘ডাঁট’ তৈরি করছেন। কেউ ‘ডাঁটে’ গরুর চুল লাগাচ্ছেন। কেউ করছেন ‘ফিনিশিংয়ের’ কাজ। সেখানেই নিজের জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা শোনালেন রমজান। ওই কারখানাতেই কথা হলো কারিগর ফিরোজা বেগমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, এ কাজ করে তিনি প্রতিদিন দু-তিন শ টাকা আয় করেন। বাড়তি আয়ে সংসারের অভাব দূর হয়েছে। একই গ্রামের ইতি বেগম জানালেন, ব্রাশ তৈরির জন্য সব সরঞ্জাম তিনি রমজান আলীর কারখানা থেকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সংসারের কাজে ফাঁকে ফাঁকে ব্রাশ তৈরির কাজ করেন। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও আয় করে সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন। লাউহাটি উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু সাইদ জানায়, তার বাবা মারা যাওয়ার পর অর্থের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

এখন ব্রাশ কারখানায় কাজ করে সপ্তাহে ছয় থেকে সাত শ টাকা আয় হচ্ছে; যা দিয়ে তার লেখাপড়ার খরচ চলে যায়। রমজানের কারখানা দেখে উদ্বুদ্ধ হন একই গ্রামের রোকন মিয়া ও আবদুল মান্নান। তাঁরাও ঢাকায় ব্রাশ তৈরির কারখানায় কাজ করেছিলেন। পরে গ্রামে ফিরে তৈরি করেছেন কারখানা। ওই দুই কারখানা থেকেও প্রায় ১০ হাজার করে ব্রাশ উৎপাদিত হচ্ছে। গ্রামটিতে এখন ঘরে ঘরে ব্রাশ তৈরির দক্ষ কারিগর। কারও ঘরে অভাব নেই। কারখানার তিন মালিকের আনুমানিক হিসাব, সব মিলিয়ে গ্রামের আড়াই শতাধিক পরিবারের প্রায় এক হাজার মানুষ এ পেশায় যুক্ত। যেভাবে তৈরি হয় ব্রাশ: ব্রাশ তৈরির প্রক্রিয়া জানালেন রমজান আলী নিজেই। প্রথমে কদম কাঠ সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন এলাকা থেকে। সেই কাঠ থেকে তৈরি করা হয় ব্রাশের ‘ডাঁট’। পরে তাতে গরুর লেজের চুল লাগিয়ে ব্রাশ তৈরি করা হয়। এরপর করা হয় ‘ফিনিশিংয়ের’ কাজ। কয়েক ধাপে তৈরি একটি ব্রাশে থাকে কয়েকজন শ্রমিকের হাতের ছোঁয়া। ব্রাশের জন্য গরুর লেজের চুল সংগ্রহ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও

Best free WordPress theme

Check Also

খানসামায় জঙ্গীবাদ বিরোধী সমাবেশ ও মিছিল

খানসামা (দিনাজপুর)প্রতিনিধি: দিনাজপুর খানসামা উপজেলায় গতকালকে পালিত হলো জঙ্গীবাদ বিরোধী মিছিল ও সমাবেশ। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ …