Mountain View

শীতের চাদরে গাঁদা ফুলের হাসি

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৬, ২০১৬ at ৪:১০ অপরাহ্ণ

ba15a90394f17dcf8513ebc79ddc14a3x600x400x24শীতের সকালে প্রকৃতি যখন শীতের চাদর মুড়িয়ে থাকে তখন বাগানে উঁকি দেয় গাঁদা ফুল। হলুদ গাঁদা। কমলা গাঁদা। সোনালী গাঁদা। বেগুনি গাঁদা। গাঢ় লাল রঙের গাঁদা। গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির উঠানে, এমনকি শহরে বাড়ির ছাদে বা বারান্দার টবে- এমন বাহারি রংয়ের গাঁদা চোখে পড়ে।

এবারে বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে এবং ভাগ্য ফেরাতে ফুলচাষে নেমেছেন জেলার পবা উপজেলার দামকুড়ার হরিষার ডাইং এলাকার জাফর ইকবাল। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে হলুদ গাঁদা ফুলের চারা রোপন করেছেন। যথারীতি বাগান থেকে ফুলের বিক্রি শুরু করেছেন তিনি।
জাফর ইকবাল বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় ফুলচাষে খরচ কম। রোগবালাই নেই বললেই চলে। জমি প্রস্তুতের পরে চারা রোপন করতে হয়। পর্চির্যার মধ্যে আগাছা দমন, সেচ ও প্রয়োজনে কীট স্প্রে করতে হবে। তার এক বিঘা জমিতে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। উৎপাদন ভাল হলে লাখ টাকায় বিক্রি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তার ফুল চাষে প্রথমে অনেকে হাসাহাসি করেছেন। কিন্তু এখন অনেকে ফুলচাষ করার জন্য তার কাছে পরামর্শ নিচ্ছেন। এতে তিনি উৎসাহিত হচ্ছেন বলেও জানান। সরোজমিন তার কাছে পরামর্শ নিতে এসেছেন ওই এলাকার শীষাপাড়ার রফিকুল ইসলাম। তিনি জানালেন তিনিও এবারে এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ করবেন।
জাফর ইকবাল জানান, চারার একশো’ দিন থেকে ফুল দিতে শুরু করে। প্রায় তিন মাস একটি গাছ ফুল দিয়ে থাকে। গাছ ভাল থাকলে প্রায় একটি গাছ ২ শো’টির ওপওে ফুল দিবে। বর্তমানে রাজশাহীর বাজারে প্রতি হাজার ফুলের দাম ৩শ’ টাকা। সেই হিসেবে (প্রতি বিঘা ৫ হাজার চারা ফুল দিবে দশ লাখ ফুল দিবে এবং প্রতি হাজার ফুলের দাম ৩শ’ হলে ৩ লাখ টাকা) প্রতি বিঘা ফুলের দাম লাগবে তিন লাখ টাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাজার কম বেশী হলেও দেড় লাখ টাকা পাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উৎপাদন খরচ জমি লীজসহ ৩০ হাজার টাকা। ছয়মাসে ফুল চাষ করে লাখ টাকা উপার্জন করা সম্ভব বলে জানান।

এদিকে রাজশাহীর ফুলের বাজার দখল করে আছে সিরাজগঞ্জ, যশোর ও বগুড়ার ফুল। ফুল বিক্রেতা তুষার বলেন, রাজশাহীতে ফুল উৎপানের ক্ষেত্র বিস্তার ঘটলে ব্যবসায়ী ও চাষির উভয়ই লাভবান হবেন। সাধারণত এটি শীতকালীন ফুল হলেও বর্তমানে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালেও চাষাবাদ হয়ে থাকে। বাগানের শোভাবর্ধন ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বন ও গৃহসজ্জায় এর ব্যাপক ব্যবহার ফুলটিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।
তবে আমাদের দেশে চারা রোপন করার সময়টা হলো ডিসেম্বর মাস। এ মাসের চারা রোপন করলে ফুল চাষে বেশী লাভবান হওয়া যায়। একদিকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অন্য দিকে বিবাহ সাদির কারণে ডিসেম্বর মাসের প্রথম থেকে গাঁদা ফুল, গোলাপ ফুল, টগর সহ নানা জাতের ফুল চাষ করে সারি সারি করে শাখা বা বীজ বপন করতে হয়।

বর্তমানে ঋতুভিত্তিক (গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শীত) তিন জাতের গাঁদা ফুলের চাষ করা হয়। বাংলাদেশে ফুলের বাজার খুব সীমিত। সিরাজগঞ্জ শহর সবচেয়ে বড় ফুলের বাজার। প্রতিদিন ভোরে এখানে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুল আসে এবং পাইকারী ও খুচরা দু’ভাবেই বিক্রি হয়। গাঁদা ফুল শীতকালীন ফুলের মধ্যে গাঁদা অন্যতম। বিবাহ, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, গৃহসজ্জা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবস, পূজাসহ সব অনুষ্ঠানেই গাঁদা ফুলের ব্যবহার রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শীতকালীন ফুলের মধ্যে গাঁদা অন্যতম। বাংলাদেশে গাঁদা একটি জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ফুল। সাধারণত এটি শীতকালীন ফুল হলেও বর্তমানে গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালে এর চাষাবাদ হয়ে থাকে। গাঁদা ফুল বিভিন্ন জাত ও রঙের হয়। গাঁদা ফুলের আছে নানান রকম ঔষধি গুণ।

জাফর ইকবালকে উদ্বুদ্ধকারি এসএএও রেজাউল হক রাজু বলেন, ফুল চাষের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই, কম লেখাপড়া জানা যে কোনো ব্যক্তিও হাতে কলমে শিক্ষা নিয়ে ফুল চাষ শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সহযোগিতা দিয়ে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এর দ্বিতীয় শস্য বহুমুখী করণ প্রকল্পের আওতায় কৃষদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের ফুল চাষে উদ্বুদ্ধ করছে।
ক্ষুদ্র পরিসরে শুস্ক এলাকায় শস্য বহুমুখীকরণে নতুন মাত্রা শুরু করেছে তবুও ফুল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি বলেন, প্রচলিত ফসল চাষে ঝুঁকি থাকলেও ফুল চাষ প্রায় শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত। ডিএই-এর উপ-পরিচালক দেব দুলাল ঢালী বলেন, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশী-বিদেশী ফুলের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে দেশে ফুলের বড় বাজার রয়েছে। এসব অঞ্চলসহ উপযুক্ত স্থানে বিভিন্ন ধরনের ফুল চাষের মাধ্যমে বাজার রক্ষা ও বাজার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। ফুল ব্যবসায়ী ও কৃষিবিদগণ ফুলের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ফুলের চাহিদা মেটাতে ফুল চাষ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি ও গাছপালার পরিবর্তনশীলতার কারণে এসব অঞ্চলে শোভাবর্ধক উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের মাধ্যমে রপ্তানী করণে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স আ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি। তিনি বলেন, ফুলকে রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে বিভিন্ন প্রকার ফুল চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক ড. বিধান চন্দ্র দাশ বলেন, ফুল প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর উপহার এবং সব বয়সের মানুষই ফুল ভালবাসে। তাই কৃষকদের ফুল চাষে উৎসাহিত করতে হবে। এখানে ফুল রিসোর্স কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন যেখান থেকে কৃষকেরা সহজে ফুল সংগ্রহ ও বিক্রয় করতে পারে।
এদিকে ফুল ব্যবসায়ীরা সারা দেশ থেকে ফুল সংগ্রহ করে সংরক্ষনের জন্য নগরীতে ফুল স্টোরেজ সুবিধা দাবি করেন। তারা বলেন, এই ধরনের সুবিধা থাকলে ফুল চাষীরা উপকৃত হবেন এবং ফুলভিত্তিক শিল্পের সূত্রপাত হবে।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View