গোসাইরহাটে এক পরিবারের ৩ জন অন্ধ পায়নি সরকারী কোন সহযোগিতা

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৮, ২০১৬ at ৪:২১ অপরাহ্ণ

dsc_0024ভাঙ্গা গড়ার এক অভিনব প্রতিষ্ঠানই জীবন। কেউ হাঁসে, কেউ কাঁদে। কেউ রাজ প্রাসাদে, কেউ ফুটপাতে। কেউ সোঁনার চামচ মুখে নিয়ে জম্ম নেয়, কেউবা জম্মই নেয় দারিদ্রতার অভিশাপ নিয়ে। পৃথিবী নামক সংসারে বহুরুপ। এরই তেজস্ক্রীয়তায় পুড়ে সোনা হয়, কেউ হয় আঙ্গার। জীবনের দোলাচল এক কঠিন বাস্তবতা। তেমনি গোসাইরহাট উপজেলার আবুল কালাম মাল। দুঃখ আর অভাব যার নিত্যদিনের সঙ্গী।
 
 সেই আবুল কালামের বয়স এখন ৫৪ বছর। গোসাইরহাট উপজেলার ইদিলপুর ইউনিয়নের মিত্রসেনপট্টি গ্রামের মৃত ইউসুফ আলী মালের ছেলে আবুল কালাম। ১ বছর বয়সে শিয়ালের কামড়ে গুরুতর আহত হয় আবুল কালাম। বাবা ইউসুফ আলী মাল ছেলের চিকিৎসায় শেষ সহায় সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি করেও চোখের আলো ফিরিয়ে আনতে পারেননি। পর্যায়ক্রমে ৫ বছর বয়সে এসে দুটি চোখেই দৃষ্টি হারায় আবুল কালামের। সে থেকে অদ্য পর্যন্ত অন্ধ কালামের কেটে গেছে ৫০টি বছর। দ’ুটি চোখ নষ্ট হওয়ার পর কোনো কাজ কর্ম করতে না পেরে ভিক্ষাবৃত্তি  পেশা হিসাবে নিয়েছেন তিনি । এ পরিবারটি পায়নি সরকারী কোন সাহায্য-সহযোগীতা। উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা বলছেন, আবেদন পেলে সাহায্য করবেন। এ অন্ধ লোকটিকে কে দিবে আবেদন লিখে,কে করবেন এ সহযোগিতা?
 
বিশ বছর বয়সে ফাতেমা নামে এক মেয়েকে বিয়ে করে সংসার  করছেন আবুল কালাম । ফাতেমার ঘরে জম্ম নেয় রাসেল ও শিল্পী নামে দু’টি সন্তান।  ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, রাসেল ৫ বছর বয়সে নদীতে গোসল করতে নামলে চোখে বালু ঢুকে তারও চোখ দ’ুটি নষ্ট হয়ে যায়। ৩ বছর বয়সে শিল্পী চুলায় গরম ডালের পাতিলে পড়ে স্থায়ীভাবে অন্ধত্ব বরন করেন। এখন রাসেলের বয়স ২২ ও শিল্পীর বয়স ১৮ বছর। কষ্টের নদী কখনো অতিক্রম করতে পারেনি তারা। দৈনিক ভিক্ষা করে যা পায় তাই রুটি রুজির ব্যবস্থা হয় তাদের পরিবারের । দীর্ঘশ্বাস আর স্মিত হাসির মধ্যে সান্তনা খুঁজে পায় চির অভাবী আবুল কালাম ও তার পরিবারের সদস্যরা । কোন অনুরাগ বিরাগ  নেই এ পরিবারটির। স্ত্রী ফাতেমার দিন পার হয় স্বামী ও ছেলে-মেয়ের খেদমত করে। তাদের মনের মধ্যে কষ্টের যে পাহাড় জমেছে তা তাদের সাথে কথা বলে সহসাই  অনুমান করা যায়। 
 
গোসাইরহাট উপজেলার পট্টি ব্রিজের পূর্বপাড়ে তিন নদীর মোহনায় জীর্ণ-শীর্ণ একটি দোচালা টিনের ঘর। ৪ সদস্যের পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করেন আবুল কালাম । ছেলে-মেয়ে ও নিজে অন্ধ হয়ে পাড় করছেন ২০টি বছর। তারা স্বামী ¯ত্রী দুজনই পূর্ণবয়স্ক। অভাব তার অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকলেও সামাজিক চক্ষু লজ্জায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রাসেল ও শিল্পীকে ভিক্ষা করতে দেননি আবুল কালাম   সারাদিন হাত পেতে পরিশ্রম করে যে দান দক্ষিনা পান তা দিয়ে কোনো রকম সংসার চলে আবুল কালামের। 
 
খেয়ে না খেয়ে, অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে তিল তিল করে কিছু পয়সা জমিয়ে পনের বছর আগে ১১ শতাংশ জায়গা ক্রয় করেন। খুজে নেন একটুখানি মাথা গোজার ঠাই। কিন্তু রাক্ষুসে মেঘনার শাখা নদী  এ দুঃখী পরিবারের সুখ সইতে পারেনি। বিগত ৪ পাঁচ বছরে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ১১ শতাংশ জমির ৮ শতাংশ গ্রাস করে নিয়েছে। বাকি ৩ শতাংশের উপর মুখ ভার করে দাড়িয়ে আছে দোচালা একটি টিনের ঘর। তাও চূড়ান্ত পর্যায়ে যেকোন মুহুর্তে গিলে খাওয়ার অপেক্ষায়। ছুবরি ঘরটি নদীর এত কাছাকাছি যে, নেত্র যুগলের তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়লে নদীর পানিতে মিশে একাকার হয়ে যাবে ঘরটি। ঘুমের ঘরে কখন যেন ঢেউয়ের  ধাক্কায় সারা জীবনের অর্জিত সর্বশেষ সম্বল টুকু নিঃশেষ করে দেয়। তখন আর তার মাথা গোজার ঠাই বলতে কিছুই থাকবেনা।  ভাগ্য বড় নিষ্ঠুর ! পৃথিবীর রং, রুপ ও যৌলস কিছুই তাদের উপভোগ করার সুযোগ হয়নি। মানবতা ও মনুষত্বের দরজা গুলো তার জীবনে সিলগালা। তাই তাদের করুন আর্তনাদ কোথাও পৌছেনি। তবুও অধম্য ইচ্ছা শক্তি তাকে দমাতে পারেনি। এখনো সে স্বপ্ন দেখে চিকিৎসা হলে ছেলে-মেয়ের দৃষ্টি ফিরে পাবে। পরিবারের ৪ সদস্যের মধ্যে প্রধান উর্পাজনক্ষম ব্যক্তি সহ তিন জনই অন্ধ। অথচ, সরকারী কোনো তালিকায় তাদের নাম নেই। তাদের কাছে পৌছেনি প্রতিবন্ধি ভাতা, ভিজিএফ ও হতদরিদ্রদের কার্ডসহ সরকারী কোন আর্থিক সহযোগিতা। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র, তাদের দায় দায়িত্ব কি কেউ নিবেন না ? 
 
আবুল কালামের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, নিজে অন্ধ হওয়ার সময় নিজের চিকিৎসা করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ছেলে-মেয়ে অন্ধ হওয়ার পর টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারি নি। বিত্তবানদের কাছে ছেলে-মেয়ের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চান তিনি। 
২নং দাসের জঙ্গল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি, মোঃ আলাউদ্দিন মৃধা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদেরকে আমি চিনি। তাদের পরিবারে তিন জনই অন্ধ। তারা খুব মানবেতর জীবন যাপন করছে। তারা কোনো সরকারী অনুদান পায় না। এটা চরম অমানবিক।  
 
ইদিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন শিকারীকে বার বার ফোন করে ও তাকে পাওয়া যায়নি।
গোসাইরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের নামে এখনো প্রতিবন্ধি ভাতার আবেদন পাইনি। ইদিলপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তালিকা দিলে তাদের প্রতিবন্ধি ভাতা দেওয়া হবে। 
গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সগীর হোসেন বলেন, অন্ধ পরিবারটির ব্যাপারে কেউ আমাকে জানায়নি। আমি খোজ খবর নিয়ে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

এ সম্পর্কিত আরও