Mountain View

মিয়ানমার থেকে অন্তত ১০ হাজার সংখ্যালঘু মুসলমান পালিয়ে বাংলাদেশে

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ১, ২০১৬ at ২:৩৮ অপরাহ্ণ

d203cfeaa7bd37eb2a18984da260b55ex600x400x41-1মিয়ানমারে গত কয়েক সপ্তাহে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নির্যাতনের মুখে পড়ে কত রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারও কাছেই নেই। তবে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা জানিয়েছে, মিয়ানমার থেকে অন্তত ১০ হাজার সংখ্যালঘু মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। এইউএনইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান ট্যান বলেছেন, সেখানকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ এবং পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

ভিভিয়ান ট্যান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, বিভিন্ন মানবিক ত্রাণ সংস্থার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা অনুমান করছেন, অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

এছাড়া মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে রক্তাক্ত দমন অভিযান চালাচ্ছে, তাতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো নির্যাতন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা।

বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস হাইকমিশনারের’ এক বিবৃতিতে একথা বলা হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যে রক্তাক্ত সহিংসতায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগে অং সান সুচি সরকারের সুনাম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এতে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের চালানো দমন-পীড়ন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল।’ জুনের একটি রিপোর্টের তথ্য পুনর্ব্যক্ত করে এতে বলা হয়, ‘সরকার মূলত জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ধরন স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।’

কয়েক প্রজন্ম ধরে এসব রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন। তারপরও তাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করা হয়নি। তারা বিবাহ, ধর্মপালন, সন্তান জন্মদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগণ হিসেবে বসবাস করছেন। ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং এরপর থেকে তারা পুলিশ পাহারায় দারিদ্র্যপীড়িত ক্যাম্পে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে তারা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের আন্দোলনকে প্রচণ্ডভাবে দমিয়ে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে যেভাবে নির্যাতন চলছে তা সরেজমিন দেখে কোনো সাংবাদিক রিপোর্ট করবেন তাও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ গণধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ অনুসন্ধান করতে বিদেশী সাংবাদিক, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও মানবাধিকারকর্মীরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।

এদিকে জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনান রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অবস্থা দেখতে মিয়ানমার গেছেন। এর আগে আগস্টে সপ্তাহব্যাপী ওই এলাকা পরিদর্শন শেষে তিনি রাখাইনে সহিংসতায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন। বুধবার আবারও তিনি ২ দিনের সফরে মিয়ানমারে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে, রাখাইনে রোহিঙ্গা নিপীড়নে নীরব থাকায় বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হচ্ছেন নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সুচি। রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে মিয়ানমারের আসিয়ান সদস্য পদ স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী খাইরি জামালুদ্দিন।

নির্যাতিত, স্বজনহারা রোহিঙ্গারা আসছেনই : রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনীর চরম নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা সীমান্তের নানা পথ দিয়ে টেকনাফ ও উখিয়া ক্যাম্পের দিকে ধেয়ে আসছেন। প্রতি রাতেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে স্বজনহারা, নির্যাতিত রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছেন। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এ পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।

বুধবার টেকনাফের লেদা আনরেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের লেদা, জাদিমুড়া, নয়াপাড়া গ্রাম সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে- ক্যাম্পের প্রায় প্রতি ঘরেই আশ্রয় নিয়েছেন নতুন আসা রোহিঙ্গারা। আবার আশপাশের গ্রামগুলোতেও একই অবস্থা। বিভিন্ন আত্মীয়-অনাত্মীয়র বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো।

এদিকে, দেশে আসা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের হিসাব রাখাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। লেদা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া জানান, নতুন আসা রোহিঙ্গারা হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সোমবার পর্যন্ত ক্যাম্পের ৬টি ব্লকে ১ হাজার ৩৩৮ জনকে গণনা করা হয়েছিল। এখন সে সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। আবার অনেকে আছেন, যাদের এখনও হিসাবেই আনা যায়নি। এভাবে প্রতিদিনই ঢুকছেন শত শত রোহিঙ্গা।

এদিকে আশ্রয় দেয়া পরিবারগুলো বলছে, শুধু মানবতার খাতিরে তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছে। স্থানীয়রা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও দালালরা ঠিকই লাভবান হচ্ছে। তারা প্রতি রাতে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে এসে জনপ্রতি ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে।

বুধবার সরেজমিন জাদিমুড়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এখানে স্থানীয় বাড়িঘরে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার আশ্রয় নিয়ে আছে।

ক্যাম্পে ঠাঁই নেই, গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছেন অনেকে : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঠাঁই মিলছে না অনেকের। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়া রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের আশপাশের গ্রামে ঢুকে পড়ছেন। সরেজমিন দেখা গেছে, টেকনাফের জাদিমুড়া গ্রামে আহমদ উল্লাহর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমার থেকে আসা খতিজা বেগমের ১০ সদস্যের পরিবার। মোহাম্মদ উল্লাহর স্ত্রী জাহেদা বেগম জানান, ভোরে বাড়ির উঠানে দেখতে পান অসহায় পরিবারটি আশ্রয়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। বাধ্য হয়ে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেন। আবার ভয়ের মধ্যে আছেন, আইনি কোনো ঝামেলায় না পড়ে যান। খতিজার পরিবারটি রাখাইন রাজ্যের মংডু রাঙ্গাবালি থেকে এসেছেন।

এ সম্পর্কিত আরও