Mountain View

ইসলামী ব্যাংকের অধঃপতনের আশঙ্কা

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১১, ২০১৭ at ৫:৪৩ অপরাহ্ণ

সরকারের ইচ্ছায় গেল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়। পুনর্গঠন করা হয় পরিচালনা পর্ষদ।

পর্ষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোস্তফা আনোয়ারকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক সচিব আরাস্তু খানকে। পদত্যাগ করেন ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। নতুন এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউনিয়ন ব্যাংকের এমডি মো. আবদুল হামিদ মিঞাকে। ব্যাংকের এমডি পদে এই প্রথম পরিবর্তন করে একজন সাধারণ ব্যাংকারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

পর্ষদ পুনর্গঠনের পরপরই ব্যাংকের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নানা পরিবর্তন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান আরাস্তু খান জানয়িছেন, এখন থেকে নারী ও হিন্দুরাও ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাবেন। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে মেধাবী মেয়েদের এই ব্যাংকের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে তুলে আনা হবে।’

রবিবার মতিঝিলস্থ ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘এত দিন একটি বিশেষ দলের লোকদের কেবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ করা হবে। দেশের সব শ্রেণির মেধাবীরা যেন এই ব্যাংকে নিয়োগ পেতে পারেন সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।

আরাস্তু খান বলেন, সিএসআরের অর্থ-অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হবে। অনুমোদন ছাড়া কোনো অর্থই ছাড় করা হবে না। তবে ব্যাংকের দর্শন বা মৌলিকনীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। আগের মতোই শরিয়াহ অনুযায়ী এই ব্যাংক পরিচালিত হবে।

নতুন নেতৃত্ব আসায় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হলেও ব্যাংক আগের নিয়মেই পরিচালিত হবে জানিয়ে আরাস্তু খান বলেন, ‘এই ব্যাংকে যারা নিচের পদে কর্মরত রয়েছেন তাদের কারো চাকরি যাবে না। এ কারণে এই ব্যাংকের প্রতি দেশের জনগণের আস্থাও অটুট থাকবে।’

আরাস্তু খানের এই ঘোষণার পরদিন চাকরি হারিয়েছেন দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। সোমবার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে যোগ দিয়েছেন মো. আবদুল হামিদ মিঞা।

এছাড়া আরো বেশ কয়েকজন অন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাকে এই ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন চেয়ারম্যান আরাস্তু খান দায়িত্ব নেয়ার পর ব্যাংকটির শীর্ষ ২ কর্মকর্তা—এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) এন আই খান ও কবির হোসেনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।ইসলামী ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে চাকরি করতেন এন আই খান ও কবির হোসেন। বৃহস্পতিবার ব্যাংকে নতুন নেতৃত্ব আসার পর ওই দুজনের নিয়োগের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। এ কারণে রবিবার রাত ৮ টার দিকে তাদের ব্যাংকে না আসার জন্য বলে দেওয়া হয়েছে’।

জানা গেছে, ওই ২ কর্মকর্তা ছাড়াও একজন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও (ডিএমডি) সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাকে আপাতত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এর বাইরে মধ্যম সারির আরো কয়েক ডজন কর্মকর্তা রয়েছেন পর্যবেক্ষণে।

এদিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করেই নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে ব্যাংকটি।

সোমবার পর্যন্ত ১৬ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন শাখায় পোস্টিংও দেওয়া হয়েছে। দেশের একটি বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠীর তালিকা অনুযায়ী আরো ২৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন ব্যাংকটির একজন পরিচালক। তিনি বলেন, ‘একমাস আগে বোর্ডসভায় একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল—নতুন লোকবলের প্রয়োজনে ছোটখাটো পোস্টে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দিতে পারবেন। এজন্য বোর্ডের অনুমতি বা পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ওই সভায় ১০ জন নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল’।

নতুন চার ডিএমডি হলেন কোম্পানি সচিব আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া, করপোরেট ডিভিশন-১ প্রধান মোহন মিয়া, করপোরেট ডিভিশন-২-এর প্রধান মনিরুল মওলা ও মোহাম্মদ আলী।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘এমডি পরিবর্তনের বিষয়ে তারা আমাদের কাছে অনুমোদন চেয়েছে আমরা অনুমোদন দিয়ে দিয়েছি’।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার যেকোনো গ্রুপ কিনতে পারবে’।

এদিকে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, হঠাৎ বড় ধরনের পরিবর্তনে নানামুখী তৎপরতায় ইসলামী ব্যাংকের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কেননা, এই ব্যাংকটি বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক। দীর্ঘদিন থেকে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে আসছিল। হঠাৎ করে তারা সরে দাঁড়ানোয় নতুনদের নানামূখী উদ্যোগে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে নতুনদের খুবই সতর্কতার সঙ্গে এগুতে হবে।

পেশাদারিত্ব মনোভাবের পরিবর্তে কোনো পক্ষের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কিংবা কোনো পক্ষকে উচ্ছেদের মনোবৃত্তি নিয়ে কাজ করলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, এতে বিনিয়োগকারী-গ্রাহকরা আস্থার সঙ্কটে পড়তে পারেন। আর সেটা হলে কোনোভাবেই ব্যাংকটির ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন পর্ষদের শীর্ষ কর্মকর্তারা যেভাবে এগুচ্ছেন তাতে স্বল্পদিনের মধ্যেই ব্যাংকটির অধঃপতন শুরু হয়ে যেতে পারে। কেননা, তাদের কথাবার্তায় পেশাদারিত্বের ছাপ নেই, আছে দলীয় মনোবৃত্তির পরিচয়। ফলে সহজেই ব্যাংকটির বার বেজে সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা, যেকোনো ব্যাংকের মূল শক্তি হচ্ছে গ্রাহকদের আস্থা। আস্থার সঙ্কট দেখা দিলে সেই ব্যাংকের গতি ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ যেভাবে কার্যক্রম শুরু করেছেন তাতে গ্রাহকদের মনে সন্দেহ-সংশয় কিংবা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে গ্রাহকদের আস্থায় আঘাত হানছে। ফলে যত ভাল পদক্ষেপই নেওয়ার কথা বলা হোক না কেন ব্যাংকটির পতন অবশ্যম্ভাবী। যদি না পর্ষদ তাদের এই অবস্থান থেকে সরে না আসে। দলবাজি করে কখনো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলে না।

এ সম্পর্কিত আরও