Mountain View

বদলে যাওয়া জিম্বাবুয়ের গল্প এবং একজন হিথ স্ট্রিক!

প্রকাশিতঃ জুলাই ১০, ২০১৭ at ৬:১৪ অপরাহ্ণ

এফ. আই রাশেদ, বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমস :  সম্প্রতি শ্রীলংকা সফরে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটীয় রূপ দেখে অনেকেই নিল জনসন, মারি গুডউইন, হিথ স্ট্রিক এবং হেনরি ওলোঙ্গা, এ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার যুগের জিম্বাবুয়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। যখন তারা বিশ্বের সব বড় বড় দলকে হেসে খেলে হারিয়ে দিতে পারতো, ইংল্যান্ডের মতো দলকে করতেন ধবল ধোলাই। সে স্মৃতি জিম্বাবুয়ের জন্য ধূসর স্মৃতি হয়ে গিয়েছিল সম্প্রতি! ভঙ্গুর অবস্থা থেকে ফিরে এসে এই জিম্বাবুয়ে শ্রীলংকার মাটিতে সিরিজ হারিয়ে দিয়েছে ৩-২ ব্যবধানে। হিথ স্ট্রিকের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া জিম্বাবুয়ের গল্পই চলুক।

সাম্প্রতিক জিম্বাবুয়েকে নিয়ে গুনগান করার আগে একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক, ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট ৩১ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয় বারের মতো হারিয়ে দেয় জিম্বাবুয়ে। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে প্রথম ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর মাধ্যমে। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ফুটতে থাকা জিম্বাবুয়ে ৩ টেস্ট এবং ৫ ওডিআই সিরিজ বাংলাদেশে আসে, সিরিজের ৮ টি ম্যাচেই হেরে ধবধবে হয়ে দেশে ফিরেই চাকুরী হারান কোচ স্টিফেন মাঙ্গোঙ্গো। এরপর কোচ হয়ে আসেন ডেভ হোয়াটমোর, বিশ্বাস ছিলো যার স্পর্শে ঘুচে যায় সব ব্যর্থতা।

২০১৫ বিশ্বকাপ খেলতে নিউজিল্যান্ডে পারি দেয় জিম্বাবুয়ে, নর্দান ডিস্ট্রিক্ট এর বিপক্ষে সবগুলো গা গরম করা ম্যাচে জয় পেলেও নিউজিল্যান্ডের কাছে বৃষ্টি বিঘ্নিত প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে হারতে হয়। পরের ম্যাচে শ্রীলংকাকে ৭ উইকেটে আবার ঘুরে দাঁড়ালেও বিশ্বকাপের মূল পর্বে প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যায়। পরের ম্যাচে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তুু পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং তার পরের খুব ক্লোজ ম্যাচে হেরে যায় পাকিস্তানের কাছে। পরের ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের জন মুনির অসততা এবং আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে হেরে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ ম্যাচে ভারতের সাথে হেরে বিশ্বকাপ পর্ব শেষ করে তারা।

টুর্নামেন্টে দুই সেঞ্চুরী সহ ৪৩৩ রান করা ব্রেন্ডন টেইলর অবসরের ঘোষণা দিয়ে দেন। সে বছরই মে মাসে দীর্ঘ ৬ বছরের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন থেকে বিরত থাকা পাকিস্তান সফরে যায় জিম্বাবুয়ে। সেখানে টি২০ সিরিজ ২-০ তে এবং ৩ ম্যাচ ওডিআই সিরিজ ২-০ তে হারে জিম্বাবুয়ে। পরবর্তীতে নিজ দেশে ভারতের সাথে ৩-০ তে ওডিআই সিরিজ হারে, তবে প্রথম বারের মতো হারারে গ্রাউন্ডে টি২০ জিতে ভারতের বিরুদ্ধে ২ ম্যাচ টি২০ সিরিজ ১-১ ড্র করে জিম্বাবুয়ে। নিউজিল্যান্ডের সাথে হোম সিরিজে প্রথম ম্যাচ জিতলেও পরবর্তী ২ ম্যাচ হেরে সিরিজ হারে ২-১ ব্যাবধানে। নিউজিল্যান্ড চলে যাওয়ার পর সিরিজ খেলতে আসে পাকিস্তান, সে সিরিজও ২-১ ব্যবধানে হারে জিম্বাবুয়ে।

পরবর্তী সিরিজে আয়ারল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারালেও আফগানিস্তানের সাথে ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ হেরে যায় জিম্বাবুয়ে। এই প্রথম আইসিসির কোন সহযোগী দল পূর্নাঙ্গ সদস্য পদ পাওয়া দলকে সিরিজ হারিয়ে দেয়। অঘটনের ওখানেই শেষ হয়ে যায়নি, টি২০ সিরিজও ২-০ ব্যবধানে হেরে যায় আফগানদের সাথে। এরপর বাংলাদেশ সফরে এসে ওডিআই সিরিজ ৩-০ হেরে গেলেও টি২০ সিরিজ ১-১ এ ড্র করে। এভাবেই ২০১৪ এবং ২০১৫ দু একটা ম্যাচ ছাড়া চরম ব্যর্থ ছিলো জিম্বাবুয়ে। ২০১৬ সালে ঘুরে দাড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে আরব আমিরাতে আফগানিস্তানের সাথে সিরিজ খেলতে যায় জিম্বাবুয়ে, সেখানে ওডিআই সিরিজ ৩-২ এবং টি২০ সিরিজ ২-০ হেরে যায় জিম্বাবুয়ে। এরপর ৪ টি টি২০ খেলতে বাংলাদেশে আসে জিম্বাবুয়ে, ২-২ এ সিরিজ শেষ করে দেশে ফিরে যায়। অধিনায়কত্ব চলে যায় এল্টন চিগুম্বুরার।

ভারতে টি২০ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে হ্যামিল্টন মাসাকাদজাকে অধিনায়ক করে পাঠানো হলেও আফগানিস্তানের কাছে ৫৯ রানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় জিম্বাবুয়ে। ব্যর্থতার চুড়ান্ত ধাপ শেষ করে চাকুরী হারান কোচ ডেভ হোয়াটমোর, এবং অধিনায়কত্ব চলে যায় মাসাকাদজার। বছরের মাঝের দিকে ভারত সফরে যাওয়ার আগে নতুন অধিনায়ক হন গ্রায়েম ক্রেমার, বোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ পান দক্ষিণ আফ্রিকার মাখায়া এনটিনি, এবং ব্যাটিং কোচ হিসেবে নিয়োগ পান দক্ষিণ আফ্রিকার এক সময়ের নির্ভরতার প্রতিক ল্যান্স ক্লুজনার। ভারত সফরে গিয়ে ৩-০ তে ধবল ধোলাই হওয়া, সমর্থকদের চোখ রাঙ্গানিতে আর প্রায় ৭ জন ইঞ্জুরিতে পরায় বিপর্যয়ে পড়ে যায় জিম্বাবুয়ে। ঐ অবস্থায় নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজ হেরে যায় তারা। সেপ্টেম্বরে শ্রীলংকা সফরের আগে প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ পান স্বদেশি হিথ স্ট্রিক, নিজেদের ১০০ তম টেস্ট খেলতে শ্রীলংকায় যাওয়া জিম্বাবুয়ে স্বপ্ন দেখছিল।

শততম ম্যাচ ২২৫ রানে হেরে টেস্টটি হারতে হয়, তবে অধিনায়ক ক্রেমার পঞ্চম দিনের শেষ ঘন্টা পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন ম্যাচটি বাঁচাতে। পারেননি! শেষ টেস্ট হেরে ২-০ তে সিরিজ শেষ করে জিম্বাবুয়ে। ঐ সফরে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে যোগ দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে প্রথম ম্যাচ হার, দ্বিতীয় ম্যাচ টাই, তৃতীয় ম্যাচ পরিত্যক্ত এবং চতুর্থ ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠে যায়। কিন্তুু শ্রীলঙ্কার কাছে ৬ উইকেটে হেরে রানার্স আপ হতে হয়। এরপর আফগানিস্তানের কাছে হোম সিরিজ আবারও ৩-২ এ হারে, স্কটল্যান্ডের সাথে খেলতে গিয়ে সিরিজ ড্র করে ১-১ এ। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর পরে ৫ টি ওডিআই ও ১ টি টেস্টের পূর্নাঙ্গ সিরিজ খেলতে শ্রীলংকায় গিয়েই পাল্টে দিল হিসাবের খাতা, প্রথম ম্যাচেই শ্রীলংকার দেওয়া ৩১৭ রানের টার্গেট সলোমন মিরের সেঞ্চুরিতে মাত্র ৪ উইকেট হারিয়েই জিতে যায় জিম্বাবুয়ে। শ্রীলংকার মাটিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম জয় এবং প্রথম বারের মতো শ্রীলংকার মাটিতে যে কোন দলের ৩০০ রান চেজ করে জয়ের রেকর্ড গড়ে জিম্বাবুয়ে। কিন্তুু দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিং ব্যর্থতায় পরে মাত্র ১৫৫ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৭ উইকেটে হেরে সিরিজ ১-১ করেন।

তৃতীয় ম্যাচে হ্যামিল্টন মাসাকাদজার সেঞ্চুরীতে ৮ উইকেটে ৩১০ রান করে সিরিজে ঘুরে দাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল, কিন্তুু শ্রীলংকার দুই ওপেনার ডিকওয়েলা ও গুনাথিলাকার মেইডেন সেঞ্চুরিতে ৮ উইকেটে হেরে ২-১ এ পিছিয়ে পরে জিম্বাবুয়ে। চতুর্থ ম্যাচে শ্রীলংকা ৬ উইকেটে ৩০০ রান করলে হারের সঙ্কায় পড়ে যায় জিম্বাবুয়ে, কিন্তুু বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচে ৪ উইকেটের জয় পেয়ে সিরিজে ২-২ এ সমতা আনলে পঞ্চম ম্যাচটি গড়ায় অঘোষিত ফাইনালে। সেখানে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে মাত্র ২০৩ রান করে শ্রীলংকা।

জবাবে খেলতে নেমে সলোমন মিরে এবং হ্যামিল্টন মাসাকাদজার উদ্বোধনী জুটির আগ্রাসী ব্যাটিং জিম্বাবুয়েকে প্রথম বারের মতো শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের। সে পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল ধনঞ্জয়া এবং মালিঙ্গার বোলিং, কিন্তুু মিরে, মাসাকাদজা, মুসাকান্দা এবং শেষের দিকে ম্যাচের নায়ক বোলিংয়ে ১০ ওভারে মাত্র ২১ রানে ৩ উইকেট নেওয়া সিকান্দার রাজা ২৭ বলে অপরাজিত ২৭ রান করলে ৩ উইকেটে ম্যাচ জিতে জিম্বাবুয়ে। সেই সাথে রচিত হলো ইতিহাস, যার অগ্রভাগে ছিলেন কোচ হিথ স্ট্রিক।

এ সম্পর্কিত আরও