Mountain View

দুদকের তালিকায় ১০২ শিক্ষক

প্রকাশিতঃ আগস্ট ২০, ২০১৭ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ১০২ জন শিক্ষকের তালিকা তৈরি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি বিশেষ টিম গত চার মাসের বেশি সময় অনুসন্ধান চালিয়ে ঢাকা মহানগরীর আটটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওই ১০২ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ কোচিংয়ের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে।সূত্র জানায়, অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে এরই মধ্যে কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে।

দুদক সূত্র জানায়, প্রথম পর্যায়ে ঢাকা মহানগরীর আট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০২ শিক্ষককে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই আট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কোচিংয়ে জড়িত নগরীর অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও শিক্ষকের তালিকা তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে। দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক নাসিম আনোয়ার সমকালকে বলেন, কমিশনে পেশ করা প্রথম পর্যায়ের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে অবৈধভাবে কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় অবৈধ কোচিংয়ে যুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয় তদারক করার কথা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও মন্ত্রণালয়ের ওই সব কর্মকর্তাকে শিগগির জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপর কমিশনে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিবেদন পেশ করা হবে।

নাসিম আনোয়ার আরও বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কি-না, এ ব্যাপারে কমিশনের আইন শাখার মতামত নেওয়া হবে।

এদিকে দুদকের একাধিক পদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুরোপুরি সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ও অপরাধজনিত বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী মামলা করা যায়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়, কোনো শিক্ষক তার নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে প্রতিদিন অন্য যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন ছাত্রছাত্রীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছে লিখিতভাবে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ, শ্রেণি, রোল নম্বরসহ নামের তালিকা পেশ করতে হবে। নীতিমালার এই বিধান লঙ্ঘন করে ওই ১০২ শিক্ষক নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করিয়েছেন, যার তথ্য-প্রমাণ দুদকের কাছে রয়েছে।

দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধে বিশেষ টিমের প্রধান মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেছেন অন্য কথা। তিনি সমকালকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অবৈধ কোচিংয়ে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে দুদক আইন অনুযায়ী ওই সব শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করাও যাচ্ছে না। অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং ওই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠাতে কমিশনের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

টিমের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রেখে ২০১২ সালের ২০ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আইন পাস করা হয়নি। সুনির্দিষ্ট আইনের আলোকে শাস্তির বিধান না থাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা দুরূহ হবে।

জানা গেছে, দুদক টিমের অনুসন্ধানকালে মহানগরীর শাহজাহানপুর, মতিঝিল, এজিবি কলোনি, সিদ্ধেশ্বরীসহ বিভিন্ন এলাকার কোচিং সেন্টারগুলোয় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে কোচিং পরিচালনারত অবস্থায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে কোচিং করানোর কথা স্বীকার করেছেন।

দুদকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মহানগরীর নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অসংখ্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবৈধ কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও ওই সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র জানায়, দুদক টিমের নজরদারিতে রয়েছে মহানগরীর ২১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই ২১টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নামের তালিকা সংগ্রহ করেছে টিম। প্রথম ধাপে আট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওই ১০২ শিক্ষককে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩৪, মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৪, খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ১৪ ও গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের সাতজন শিক্ষক রয়েছেন।

ছয় সদস্যের টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. আবদুল ওয়াদুদ, মনিরুল ইসলাম, ফজলুল বারী ও উপসহকারী পরিচালক আতাউর রহমান।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক নিজাম উদ্দিন কামাল (ইংরেজি), আবদুল মান্নান (রসায়ন), উম্মে ফাতিমা (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিভাগ), লাভলী আখতার, তাসমিন নাহার, মতিনুর (ইংরেজি), উম্মে সালমা (ইংরেজি বিভাগ, ইংলিশ ভার্সন) মো. আবদুল জলিল (ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ), মনিরা জাহান (ইংরেজি), ফাহ্মিদা খানম পরী (গণিত), লুৎফুন্ নাহার (গণিত), হামিদা বেগম সহকারী শিক্ষিকা (গণিত), নাজনীন আক্তার (গণিত), মুহছিনা (গণিত), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক আশরাফুল আলম (রসায়ন), সুবাস চন্দ্র পোদ্দার (রসায়ন), মোহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রসায়ন), উম্মে সালমা (২) (ইংরেজি), তৌহিদুল ইসলাম (ইংরেজি), সুরাইয়া জান্নাত (ইংরেজি), মো. সফিকুর রহমান-৩ (গণিত ও বিজ্ঞান), মো. শফিকুর রহমান সোহাগ (গণিত ও বিজ্ঞান)।

এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক নুরুল আমিন (গণিত), মনিরুল ইসলাম (ইংরেজি), রফিকুল ইসলাম (সমাজবিজ্ঞান), গোলাম মোস্তফা (গণিত), মো. অহিদুজ্জামান (বাংলা বিভাগ), মো. শফিকুল ইসলাম (ইংরেজি), মো. মাহবুবুর রহান (পদার্থবিজ্ঞান), মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (গণিত), মাকসুদা বেগম মালা, আলী নেওয়াজ আলম করিম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. আবদুর রবের নাম রয়েছে দুদকের কাছে।

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক মোহনলাল ঢালী, মো. কবীর আহমেদ, হাসান মঞ্জুর হিলালী, দিবা শাখার সিনিয়র শিক্ষক প্রদীপ কুমার বসাক, আবুল খায়ের, শারমীন খানম, দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখাপ্রধান মো. দেলোয়ার হোসেন, সহকারী শিক্ষক মাও. কামরুল হাসান, মো. রুহুল আমিন-২, মো. কামরুজ্জামান, আমান উল্লাহ আমান, মো. সাইফুল ইসলাম, স্কুল শাখার ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক এনামুল হক, সিনিয়র শিক্ষক মেজবাহুল ইসলাম (ইংরেজি), সুবীর কুমার সাহা (গণিত), বাসুদেব সমদ্দার, বকুল বেগম, আসাদ হোসেন (ইংরেজি), খ. ম. কবির আহমেদ, শেখ শহীদুল ইসলাম, শুকদেব ঢালী, হামিদুল হক খান, রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস ও চন্দন রায়।

খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়: সহকারী শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী। এ প্রতিষ্ঠানের আরও কিছু শিক্ষকের নাম যাচাই করা হচ্ছে।

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন মিয়া (ভৌতবিজ্ঞান), মো. মোখতার আলম, (ইংরেজি), মো. মাইনুল হাসান ভূঁইয়া (গণিত), মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (গণিত), মুহাম্মদ আফজালুর রহমান (ইংরেজি), মো. ইমরান আলী (ইংরেজি), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ কবীর চৌধুরী, এ বি এম ছাইফুদ্দীন ইয়াহ, মো. মিজানুর রহমান, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. জহিরুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন বেপারী।

মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষিক নূরুন্নাহার সিদ্দিকা (সামাজিক বিজ্ঞান), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক শাহ মো. সাইফুর রহমান (গণিত), মো. শাহ আলম (ইংরেজি), মোসা. নাছিমা আক্তার (ভূগোল)।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক কামরুন্নাহার চৌধুরী (ইংলিশ ভার্সন)। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক ড. ফারহানা (পদার্থবিজ্ঞান), সুরাইয়া নাসরিন (ইংরেজি), লক্ষ্মী রানী, ফেরদৌসী ও নুশরাত জাহানের নাম রয়েছে।

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক যোবায়ের মাহমুদ (গণিত), মো. নুরুদ্দিন (গণিত), মো. মেহেদী হাসান (গণিত), শহীদুল ইসলাম (ইংরেজি), তুহিনুর রহমান (রসায়ন), ফেরদৌস হাসান (ইংরেজি), শামসুন্নাহার (বাংলা), মো. মাছুদ আলম, (ইংরেজি), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন (ইংরেজি), মো. মোখলেছুর রহমান (গণিত), মো. নূরুজ্জামান (রসায়ন), মো. সাইফুল্লাহ (ইংরেজি), তাজুল ইসলাম (বাংলা) ও সহীদুর রহমান বিশ্বাস (ইংরেজি)।

গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল: প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক মো. শাহজাহান সিরাজ (গণিত), মোহাম্মদ ইসলাম (গণিত), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক মো. শাহজাহান (গণিত), মো. আবদুল ওয়াদুদ খান (সামাজিক বিজ্ঞান), মো. আলতাফ হোসেন খান (ইংরেজি), মো. আযাদ রহমান (ইংরেজি) ও রণজিৎ কুমার শীল (গণিত)।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View