Mountain View

আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ আসনে বড় দু’দলেরই প্রধান অন্তরায় দলীয় কোন্দল

প্রকাশিতঃ আগস্ট ২২, ২০১৭ at ১:৫৯ অপরাহ্ণ

হারুন-অর-রশীদ,ফরিদপুর প্রতিনিধি,বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমস :দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত দেশের অন্যতম প্রধান নৌবন্দরের অবস্থানসহ নানান কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজবাড়ী-১ (গোয়ালন্দ-রাজবাড়ী সদর) আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে এ আসনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগাম নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হয়েছে। সেই সাথে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র মধ্যে উপদলীয় কোন্দলও প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।

প্রধান প্রতিদন্দ্বি দুই দলই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা ও সক্রিয় রাখতে নিয়মিত দিকনির্দেশনা, সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের শুভেচ্ছা ফেস্টুন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি সংবলিত পোস্টার আকারে পোস্ট এসব তৎপরতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বড় দু’দল ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দলের তৎপরতা এখনও তেমন একটা চোঁখে পড়েনি।

রাজবাড়ী-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী কেরামত আলী, তাঁর ছোট ভাই জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলী, জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি সাবেক জেলা পরিষদের প্রশাসক আকবর আলী মর্জি, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কামরুন্নাহার চৌধুরী লাভলী, রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র মহাম্মদ আলী চৌধুরী, গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র শেখ মো. নিজামের নাম শোনা যাচ্ছে। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপি’র সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহ্মুদ খৈয়ম, জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাড. আসলাম মিয়া ও রাজবাড়ী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. এম.এ খালেক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাজবাড়ী ও গোয়ালন্দের দু’টি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাজী কেরামত আলী এ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী কেরামত আলী ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬১ ভোট পান। তার নিকটতম বিএনপি প্রার্থী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম ভোট পান ৮৩ হাজার ৯৩৩। এ আসনটি ৫৭ হাজার ৬২৮ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন কাজী কেরামত আলী।

রাজবাড়ী-১ আসন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে গোয়ালন্দের ভোটারদের মধ্যে আওয়ামীলীগের অবস্থান আরো বেশী সুদৃহ। বিগত নির্বাচনে গোয়ালন্দের ভোটে আওয়ামীলীগের প্রার্থী জয় নিশ্চিত হওয়ার নজির রয়েছে।

এ আসনে তিনবার সরাসরি ভোটে ও একবার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী। ইতিমধ্যে প্রার্থীতা নিয়ে আওয়ামীলীগ ও বিএনপিতে গৃহদাহ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচীর মাধ্যেমে বিএনপিতে একে অপরের সরাসরি বিরোধীতা করলেও আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আকার-ইঙ্গিতে পরস্পরের বিরোধীতা করে আসছেন। সময় গড়ানোর সাথে সাথে দিন দিন তা অনেকটা প্রকাশ্যে চলে আসছে।

সাবেক গণ পরিষদ সদস্য ও গোয়ালন্দ মহকুমা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী হেদায়েত হোসেনের পুত্র বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও তিনি নিজ পরিবারের বড় বিরোধীর সম্মুখীন হয়েছেন। গত জেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদককের পদ নিয়ে ছোট ভাই কাজী ইরাদত আলীর বিরোধীতার মুখে পড়েন তিনি। কাজী ইরাদত আলী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটের দাবি করেন। তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের জোড়ালো হস্তক্ষেপে কাজী কেরামত আলীকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে তিনি রাজবাড়ী-১ আসনের মনোনয়ন পেতে বলিষ্ঠ ভাবে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছেন।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য কামরুন্নাহার চৌধুরী লাভলীর পরিবারেরও সমৃদ্ধ একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তাঁর স্বামী মহাম্মদ আলী চৌধুরী রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র। তারা দু’জনই আওয়ামীলীগের মনোনয়ন চাইবেন। যে দলীয় মনোনয়ন পাবেন তিনিই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা পারিবারিক ভাবেই নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এই পরিবারেরর আকেজন রাজবাড়ী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাড. ওয়াজেদ চৌধুরীর কন্যা সালমা চৌধুরী রুমা। সম্প্রতি তিনিও রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী মর্জি। তিনি দলীয় অনুকম্পা পেয়ে ৫ বছর নিষ্ঠার সাথে জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত জেলা পরিষদ নির্বাচনে দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এরপর থেকে তিনি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে আকবর আলী মর্জিকে চরম বিরোধীতার মুখে পড়তে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের। পরে প্রভাবশালী ওই সকল নেতাদের পরামর্শ আমলে না নিয়ে দলীয় হাইকমান্ড জেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেন জেলার আরেকজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আব্দুল জব্বারকে।

ওই নির্বাচনে তিনি ৫৯৬ ভোটের মধ্যে ৫২৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে ফকীর আব্দুল জব্বারকে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন দেয়া ছাড়া এ আসন ধরে রাখা কঠিন হবে বলে অনেক নেতা-কর্মীই মনে করেন। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ফকীর আব্দুল জব্বার বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মূল্যায়ন করে যে পদ দিয়েছে আমি তাতেই খুশি। এ মুহুর্তে আমি সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার কথা ভাবছি না।

অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে দীর্ঘ ১৮ বছর গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র শেখ মো. নিজামের নাম। তিনি পিতার আর্থিক সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সে মেয়র নির্বাচিত হন। পারিবারিক ভাবে আওয়ামীলীগ ঘারনার মানুষ হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তৃতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে আওয়ামীলীগে যোগ দেন।

এরপর থেকে তিনি তার আর্থিক সামর্থ ও আচরণের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের সাথে নিবির যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। আলাপকালে তিনি জানান, কোন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি কাজ করছেন না। দল তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিলে তার প্রস্তুতি আছে বলে তিনি জানান। তবে দলের যে কোন সিদ্ধান্ত সফল করতে তিনি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাবেন।

ভোটারা মনে করেন, দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থে বড় দলের ভেতর একাধিক মনোয়ন প্রত্যাশী থাকবে এমনটাই স্বাভাবিক। তবে অন্তদ্বন্দ্ব নিরসন করে দলীয় হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে আসলে কে হচ্ছেন রাজবাড়ী-১ আসনে নৌকার মাঝি।
রাজবাড়ী জেলা বিএনপি গ্রুপিং আর দ্বন্দ্ব-কোন্দলে জর্জরিত।

এ আসনে এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে জেলা বিএনপি’র সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহ্মুদ খৈয়ম। অন্য গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এ্যাড. আসলাম মিয়া ও রাজবাড়ী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এ্যাড. এম.এ খালেক। আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, এ্যাড. আসলাম মিয়া ও এ্যাড. এমএ খালেক দলীয় মনোয়ন পেতে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে পৃথক ভাবে শোডাউন মিছিল-মিটিং করছেন তারা।

তিন বারের নির্বাচিত রাজবাড়ী পৌরসভার চেয়ারম্যান আলী নেওয়াজ মাহ্মুদ খৈয়ম ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনায়নের আশাবাদী হয়ে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটি পুনরায় ফিরে পেতে বিভিন্ন এলাকায় সভা সমাবেশ করে চলছেন।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View