ঢাকা : ১৯ অক্টোবর, ২০১৭, বৃহস্পতিবার, ২:০০ পূর্বাহ্ণ
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
প্রচ্ছদ / মতামত / যে কারণে বাড়ছে ডিভোর্স : একটি তাত্ত্বিক গবেষণা

যে কারণে বাড়ছে ডিভোর্স : একটি তাত্ত্বিক গবেষণা

প্রকাশিত :

প্রিন্স আল মামুন: বিবাহ হলো নারী ও পুরুষের মাঝে পবিত্রতম বন্ধন; যা ধর্ম ও সমাজ দ্বারা স্বীকৃত। নারী ও পুরুষ একে অন্যের জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করেন এই পবিত্রতম বন্ধনের মধ্য দিয়ে। আদিকাল হতে এটি সমাজে প্রচলিত। দু’জন দু’জনের মাঝে আবদ্ধ থাকেন অপরিসীম ভালবাসায়। প্রায় প্রতিটি পুরুষের স্বপ্ন থাকে, তার পরবর্তীতে এক বা একাধিক উত্তরাধিকারী রেখে যেতে। তাইতো সে বৈবাহিক বন্ধনের মায়াজালে নিজেকে আটকে ফেলে। সংসারের নিয়মিত সমস্যায় মানুষ নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে চায়। অনেক সময় এর হিতে বিপরীতও হয়। নানাবিধ কারণে একে অন্যের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। মুক্তি পেতে চায় বৈবাহিক বন্ধন থেকে।তাই তারা বিবাহবিচ্ছেদের মতো অভিশপ্ত প্রথা বেছে নেয়।

বর্তমানে প্রায় প্রতিটি শিল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ বৈধভাবে স্বীকৃত। শুধুমাত্র মাল্টা ও ফিলিপাইনে এটি স্বীকৃত নয়। তবে মাল্টার অধিবাসীরা অন্য দেশ হতে ‘ফরেন ডিভোর্স’ নিতে পারেন যদি স্বামী-স্ত্রী একজন বা উভয়ে সেখানকার অভ্যাসগতভাবে বাসিন্দা হন। পশ্চিমা ও অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা।

অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিতই নয়; উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের মাঝেও বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। সামাজিক অস্তিরতা, প্রগতিশীলতার নামে নারী স্বাধীনতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটারে আসক্তি, পর পুরুষের প্রতি নারীর আসক্তি, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়, বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কারণগুলো অনেকাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা।আমরা দেখেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পরিচয়ের জের ধরে চার সন্তানের জননী এক মালয়েশিয়ান সুদূর বাংলাদেশে চলে আসেন। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, বিবাহবিচ্ছেদ পুরুষের তুলনায় বর্তমান নারীরাই বেশী করছেন। শিক্ষিত কর্মজীবী নারীরা বিবাহবিচ্ছেদে বেশি আগ্রহী। একটা সময় বিবাহবিচ্ছেদের মতো জগন্য কাজ পুরুষ দ্বারা বেশি হলেও এখন কিন্তু তা আর বর্তমান নেই।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সালিশী বোর্ডের তথ্য মতে, মোট তালাকের ৭০ দশমিক ৮৫ ভাগই নারীর পক্ষ থেকে আর বাকী ২৯ দশমিক ১৫ ভাগ পুরুষ কর্তৃক হচ্ছে। [দৈনিক জনকণ্ঠ, ১১ সেপ্টেম্বর ]

এক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই দিনের বেশির ভাগ সময়ই আলাদা থাকা, পারিবারিক বন্ধন হ্রাস, অর্থনৈতিকভাবে নারীদের শক্ত অবস্থান ইত্যাদি কারণ গুলো বিবাহবিচ্ছেদ বা আলাদা থাকার মতো প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বর্তমানে প্রতি হাজারে বিবাহবিচ্ছেদের হার ১ দশমিক ১ জন, যেখানে ২০০৬ সালে এর পরিমাণ ছিল মাত্র দশমিক ৬ জন। তারা আরো বলছে, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা নারীদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি হাজারে ১ দশমিক ৭ জন আর অশিক্ষিত নারীর ক্ষেত্রে তা মাত্র দশমিক ৫ জন। বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি। এরপর আছে খুলনা। [bangla insider, ০৫ আগস্ট ১৭]

স্বামী-স্ত্রী একজন অন্যজনের সাথে বনিবনা না হওয়া বা দাম্পত্য কলহ অথবা অন্য কোন কারণে যখন স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজন থেকে আলাদা হয়ে যায়; তখন তাদের সন্তানকেই সবথেকে বেশি অসহায়ত্ব বরণ করতে হয়। তারা বেড়ে ওঠে ‘ব্রোকেন ফ্যামিলির’ সন্তান হিসেবে, যা তাদের স্বাভাবিক মানসিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্থ করে। তারা এক ধরণের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে’ ভোগে। তাছাড়া মাতা-পিতা না থাকার কারণে তারা অনায়াসে বিভিন্ন অপরাধ জগতে ঢুকে পড়ে। মাদকাসক্ত, ছুরি, ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে। সন্তানরা নিজেদের পরিচয় আড়াল করছে। তারা সমাজে পরিচয় দিতে চায় না। ফলে এসব সন্তানরা মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে এবং হীনম্মন্যতায় ভোগে।

১৯৩৬ সালে হ্যাটউইক ৩৫ জন নার্সারী স্কুল শিশু নিয়ে একটি স্টাডি করেন।বিভিন্ন হোম ব্যাকগ্রাউন্ডের বিষয়াবলি এবং তাদের সামাজিক আচার-আচরণের উপর। তাতে তিনি ঘর নিয়ে চিন্তা বা অস্তিরতা এবং শিশুর আচরণ গঠনের উপর পারস্পরিক ইতিবাচক সম্পর্ক খুঁজে পান। যেমন, সন্দেহপ্রবণতা, স্বার্থপরতা, ভীতু, আবেগী, বিপর্যস্ত এবং ঝগড়াটে ইত্যাদি কারণ সমূহ সন্তানদের চরিত্রে দেখা দেয়।[সোস্যাল সাইকোলজি ] অপরদিকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যদি অসঙ্গতিপূর্ণ হয়, তাহলে সন্তানদের ক্ষেত্রে আগ্রাসীভাব, সন্দেহপ্রবণতা এবং অপকর্ম ইত্যাদি খারাপ গুণাবলী সমূহ দেখা দেয়। [সোস্যাল সাইকোলজি ] মনোবিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুবাদে এসব বিষয়ের উপর আমার একটুআধটু পরিচিত হবার সু্যোগ হয়। স্বামী-স্ত্রী ভাল বা মন্দ থাকার উপর তাদের সন্তানদের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যা আমরা উপরে সমাজ মনোবিজ্ঞানীদের কয়েকটা পরিসংখ্যান থেকে জানতে পেরেছি।

গ্রামে-গঞ্জে হরহামেশাই বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে। এটি বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাগুলোর অন্যতম একটি।এর পিছনে প্রধানতম কারণ হতে পারে ঃ
অবিশ্বাস ঃ বিয়ের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। বিয়ের মাধ্যমে দুইজন মানুষ আজীবন বিশ্বাসের সাথে ভালবেসে একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। কিন্তু যখনই একজন আরেকজন কে ঠকায় বা কোনো কিছু গোপন করে, তখনই নেমে আসে অবিশ্বাস। আর বিয়ের মতো এত শক্তিশালী কিন্তু স্পর্শকাতর সম্পর্ক একবার অবিশ্বাস চলে এলে তা বিচ্ছেদের মতো ভয়াবহ রুপ নিতে বেশি সময় লাগে না।

অতিরিক্ত ঝগড়াঃ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতিরিক্ত ঝগড়া বিবাহবিচ্ছেদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঝগড়ার সময় সাধারণত মাথা ঠিক থাকে না। ফলে এসময় অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া অতিরিক্ত ঝগড়া স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কও নষ্ট করে দেয়।

অবাস্তব প্রত্যাশাঃ অবাস্তব প্রত্যাশা মানুষের যে কোন সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। দাম্পত্য জীবনটা মূলত দু’জন মানুষকে ঘিরে বেঁচে থাকে। সো, দু’জনের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি দু’জনেই সমান শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।কিন্তু যখনই চাওয়া-পাওয়াটা ভারসাস্যহীন হয়, তখন হতাশা চলে আসে।আর এর থেকে জন্ম নেয় বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা।
অত্যাচার ঃ স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার দাম্পত্য জীবনকে করে তোলে চরম দুর্বিষহ। বর্তমানে অধিকাংশ বিবাহবিচ্ছেদ মূলত অত্যাচারের কারণে হচ্ছে।

যৌতুক ঃ যৌতুকই হলো শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন এবং বিবাহবিচ্ছেদের মূল কারণ। নিন্মবিত্ত পরিবারে পুরুষ তার জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করার্থে একাধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে স্ত্রীকে যথাযথ ভরণ ভোষণ দিতে না পারার কারণে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন্; যাতে করে স্ত্রীর কাছ থেকে মোটা অংকের যৌতুক পান। ফলে বিবাহবিচ্ছেদের মত ঘটনা ঘটছে।

তবে কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপিকা মেহতাব খানম বিবাহবিচ্ছেদের কারণ সমূহ কে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ম্যামের মতে, মূলত দু’টো কারণে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। প্রথমত, মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত চেয়ে বেশি শিক্ষিত হচ্ছে। তারা এখন অনেক সচেতন। মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য না করে বিবাহবিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছে। মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হবার কারণে আত্মঅহমিকা বেড়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাঁধন মানতে নারাজ তারা। বাধাহীন জীবনে অনেক ক্ষেত্রে তারা জড়িয়ে পড়ছেন পরকীয়ায়। আসক্ত হচ্ছে নানা মাদকে।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল কোম্পানি গুলোর নানা অফার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ফেসবুক এবং পর্নোগ্রাফির মতো সহজলভ্য উপাদান থেকে আকৃষ্ট হয়ে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা হারাচ্ছে। ফলে বিয়ের মতো সুদৃঢ় সম্পর্ক এবং নৈতিক বিষয়টি ছিন্ন করতে একটু দ্বিধা করছে না মেয়েরা। একটু সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, ম্যামের কারণ দু’টো অধিক শক্তিশালী বর্তমান প্রেক্ষাপটে।
আমি অনার্স ১ম বর্ষে থাকাকালে আমাদের স্যার ড. সাহাদাত হোসেন যখন ডিভোর্সের চ্যাপ্টার টা পড়াচ্ছিলেন, তখন সামনের বেঞ্চ থেকে স্যার কে প্রশ্ন করা হয়, “স্যার, বর্তমানে অধিক ডিভোর্সে কারণ কি?” স্যার বলেন, “স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অধিক ভালবাসা। ” স্যারের উত্তর ছোট হলেও এর তাৎপর্য সুগভীর। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে অধিক মাত্রায় ভালবাসার কারণে একটা সময় মনের মধ্যে সন্দেহ বাসা বাধতে শুরু করে। এরপর নিজেদের মধ্যকার শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় দূরত্ব। ফলে অধিক ভালবাসা রুপ নেয় বিবাহবিচ্ছেদে।

বিবাহবিচ্ছেদের কারণ যাই হোক না কেন, এর দ্বারা তাদের নিরপরাধ সন্তান যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হন এবং সামাজিকভাবে বাধাগ্রস্থ না হন সেদিকে বাবা-মার খেয়াল রাখা কর্তব্য। এর দ্বারা কমবেশি স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ক্ষতিগ্রস্থ হন। এ ক্ষেত্রে নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হন। তারা সমাজের নানান শ্রেণির মানুষের নিকট বিভিন্ন ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হন। এমনকি এরা পরিবারের নিকটও বোঝা হয়ে দাড়ায়। বিবাহবিচ্ছেদ রোধকল্পে শুরু থেকে নিজেদের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত গড়ে তুলতে হবে। থাকতে হবে স্বচ্ছতা। থাকতে হবে সহনশীলতা এবং সমঝোতার মানসিকতা। কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভেবে-চিন্তে, অস্তির হয়ে নয়। তাছাড়া বিবাহবিচ্ছেদ বিবাহ বন্ধনের মতো পবিত্র কাজের বিপরীত একটা কাজ। সমাজে অস্থিরতা কমাতে ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা কমাতে শুধু ব্যক্তিই নয়; রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

লেখক : প্রিন্স আল মামুন, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও

Check Also

গ্রহণযোগ্য জাতীয় দল গঠনে যা যা করণীয়

ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশে উম্মাদনার শেষ নেই, কাজের ফাঁকে একটু সময় হলেই ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকতে …