Mountain View

বানিজ্যের কাছে ক্রিকেট-ক্রিকেটারদের পরাজয়, করণীয় কি?

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭ at ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ

ক্রিকেট-ফুটবল কিংবা আন্তর্জাতিক স্পোর্টসই টাকার খেলা। ক্রিকেট ফুটবলে সব সময়েই টাকা বেশি। তবে যেকোন খেলাতেই জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করাটা সম্মানের, সেখানে হয়তো টাকার হিসাবটা শুরুতেই আসে না। প্রতিনিধিত্ব করাটাই বড় ব্যাপার, আয় রোজগার যাই হউক হবে আরকি, এমনটাই ভাবনা থাকে সবার।

কিন্তু টি২০ ক্রিকেট!!! পুরোটাই বানিজ্যিক, কোন সন্দেহ নেই। তবে হ্যাঁ জাতীয় দলের হয়ে টি২০ কিছুটা ব্যতিক্রম, এখানে সবার আগে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটাই আসল বিষয়। কিন্তু আইপিএল-বিপিএল-বিগ ব্যাশ, সিপিএল, পিএসএল সহ এই ধরণের যত লীগ আছে, সেখানে আবেগ বিবেকের কোন দাম নেই, বানিজ্যিক চিন্তা ভাবনাই আসল।

টি২০ লীগের ফাঁদে পড়ে ইতিমধ্যে অনেক ক্রিকেটারই তাদের সুন্দর ক্যারিয়ার নষ্ট করে ফেলেছেন, ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান সহ অনেক দেশের ক্রিকেটাররাই ফিক্সিং কেলেংকারীতে জড়িয়ে টেস্ট, ওয়ানডে সর্বোপরি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছেন, যা কখনোই কাম্য ছিলো না।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ বিপিএলে কিংবা বিশ্বের প্রতিটি দেশের টি২০ লীগেই তাদের জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটার দল পাননা, যা বেদনাদায়কই বটে। যারা দেশের হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা রাখেন, তারা দেশের ঘরোয়া একটা টি২০ লীগে খেলার সুযোগ পান না শুধুমাত্র ব্যবসায়িক মনমানসিকতার কারনে।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ নিয়েই আলোচনা করবো, তাই বাহিরের দেশের উদাহরণ টানা বাদ দিলাম। বিপিএল এর শুরু থেকেই জাবেদ ওমর, রাজিন সালেহ, তুষার ইমরান সহ কিছু ক্রিকেটার দল পাননি। তবে ওদের দল না পাওয়া নিয়ে, ওদের হতাশা থাকলেও সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হননি, ওরা লঙ্গার ভার্সনের ক্রিকেটার বলেই হয়তো কারো মধ্যে হতাশা নেই বিপিএলে দল না পাওয়ায়।

গত বছর টি২০ ক্রিকেটের দূর্দান্ত ব্যাটসম্যান এবং জাতীয় দলের হয়েও টি২০ ক্রিকেটে দূর্দান্ত ইনিংস খেলা জুনায়েদ সিদ্দিকী দল পাননি, যা হাস্যকর বিষয় এবং যথেষ্ট হতাশার, সিদ্দিকী ছাড়াও গতবার দল পাননি জুবায়ের হোসেন সহ আরো কিছু ক্রিকেটার। অবশ্য বিপিএলের মাঝখানে জুনায়েদ দল পেয়েছিলেন, খেলেছেন মোটামুটি, খুব বেশি ভালো করতে পারেননি। সম্ভবত সর্বোচ্চ ৩৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন এক ম্যাচে।

বিপিএল ২০১৭ তে আবারো দল পাননি জুনায়েদ সিদ্দিকী, এনামুল হক জুনিয়র, সামসুর রহমান, জুবায়ের হোসেন লিখন, শাহাদাত হোসাইন, সোহরাওয়ার্দী শুভর মতো ক্রিকেটাররা। জাতীয় দলে না খেললেও নাজমুল হাসান মিলন ছক্কা মিলন হিসেবেই পরিচিত, কিন্তু তিনিও দল পাননি এবার, যা চূড়ান্ত হতাশার বিষয়।

দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলা এ ক্রিকেটারা ঘরোয়া ক্রিকেটের একটা আসরে সুযোগ পাচ্ছেন না, তা কষ্টকরই বটে। জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে তাদের জন্য এটা অপমানেরও। অনেকেই হয়তো আমার সাথে দ্বিমত হতে পারেন, যুক্তি দেখাতে পারেন ওরা তেমন ভালো করতে পারেনি, তাই কেউ আগ্রহ দেখায়নি কিংবা ক্রিকেটে এমনটা হতেই পারে।

কিন্তু আমার যুক্তিটা হলো, ওরা জাতীয় দলের ক্রিকেটার, পরিচিত মুখ এবং লঙ্গার ভার্সনের স্পেশালিষ্ট ক্রিকেটার নয়, শুধু এতোটুকুই। সবাই টি২০ ক্রিকেটেও নিজেদের প্রমাণ করেছেন, তাছাড়া জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটার হিসেবে ওরা দল পাওয়াটা লজ্জাজনক, অপমানজনক এবং হতাশার, এই আসল কথা।

জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়েছেন, এমন কোন ক্রিকেটার যদি দল না পায়, তা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু যারা বর্তমান জাতীয় দলে না থাকলেও নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে, তারা দল না পেলে বিষয়টা দৃষ্টিকটুই দেখায়। তার উপরও সামসুর রহমান শুভর মতো ওপেনার প্রতিবার দল পেলেও গতবার খারাপ খেলায় এবার দল পাবেন না, তা মেনে নেওয়া যায় না। জুনায়েদ সিদ্দিকীরও টি২০ ক্রিকেটে এবং বিপিএলে অনেক ভালো ইনিংস আছে, তিনিও দল পাচ্ছেন না, এনামুল জুনিয়র বিপিএলের অন্যতম সেরা বোলার, তিনিও দল পাননি, সোহরাওয়ার্দী শুভও অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার তিনিও দল পাননি, গতবার সহ প্রতিবার বিপিএল খেলা শাহাদাত হোসাইন টি২০ ম্যাচে খরুচে বোলার হলেও দেশের অন্যতম সেরা এই ফাস্ট বোলার দলই পাবেন না, তাও মেনে নেওয়া যায় না। জুবায়ের হোসেন লিখনের মতো তরুন উদীয়মান স্পিনার দল পাবেন না, তাও মেনে নেওয়া যায় না। খারাপ খেলতেই পারে, তার কারনে হয়তো একাদশে সুযোগ পাবেন না, কিন্তু দলেই সুযোগ না পাওয়া বিব্রতকর বিষয় জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্য। তাছাড়া বিপিএলের প্রতিটি দলে সুযোগ পাওয়া সব ক্রিকেটারই সফল হয় না, ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি। ভালো করে হাতগুণা কয়েকজন মাত্র।

এবার বিপিএলে একটি দল কমে যাওয়ার কারনেও কিছু ক্রিকেটারের দলে জায়গা হয়নি, এটাও বড় একটা কারণ, তবে এই বিষয়গুলোতে বিসিবিকেই আন্তরিক হতে হবে।

এতো সব সমস্যার সমাধান কি? হ্যাঁ অবশ্যই সমাধান আছে। সমাধান করার যথেষ্ট সামর্থ্য ও সুযোগ আছে বিসিবির কাছে। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন, এবার বিপিএলে ৫ বিদেশী খেলানোর কারনেই অনেক দেশী ক্রিকেটার দল পাননি। মেনে নিলাম এই যুক্তি, কিন্তু তারপরও সুযোগ থাকে, প্রয়োজন বিসিবির আন্তরিক হওয়ার।

ধরুন, বিপিএলের প্রতিটি দলে মোট ২০ জন করে ক্রিকেটার কিনতে পারবে। এই নিয়মটা বিসিবিই করে দেয়। এখন বিসিবি যদি আন্তরিক হয়ে এই সংখ্যাটা ২২ করে দেয় কিংবা যতজনের দল হয়, তার থেকে একজন করে বা ২ জন বাড়তি ক্রিকেটার নিতে হবে এবং অবশ্যই জাতীয় দলের হয়ে খেলা ক্রিকেটার, যারা এখনো অবসর নেননি, এমন ক্রিকেটারদের নিতেই হবে। বিসিবি যদি এমন নিয়ম করে দেয়, তাহলে দলগুলো অবশ্যই বাধ্য হবে ক্রিকেটার নিতে। হ্যাঁ, বিসিবি হয়তো দলগুলোর কথাও ভাবে, কিন্তু দলগুলোতো বিদেশী নয়, দেশীয়। তাদের কি দেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের নিয়ে কোন ভাবনা নেই?? দায়িত্ব নেই? একাদশে সুযোগ না হউক, দলে রেখেও তাদেরকে সম্মানিত করা যেতে পারে। বিসিবি জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বিপিএলে ন্যূনতম এই সম্মানটা দিতে চাইলে কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

ক্রিকেটারদের অভিভাবক হিসেবে বিসিবি কি জাতীয় দলের এইসব তারকা ক্রিকেটারদের বিপিএলে দল না পাওয়ার কষ্ট, হতাশাটা উপলব্ধি করতে পারে না? বিসিবি চাইলেই সম্ভব, প্রয়োজন আন্তরিকতার।

তবে প্রত্যাশা থাকবে ভবিষ্যতে বিসিবি এ সমস্যাটা নিয়ে গভীর ভাবে ভাববে এবং বিপিএল ২০১৭ থেকে বাদ পড়া জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা মাঝপথে হলেও দলে অন্তর্ভূক্ত হবে।

জুবায়ের আহদ

ক্রীড়া লেখক

এ সম্পর্কিত আরও