‘বিশ্ববাসীর পর্যবেক্ষণে ভয় পাই না’

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭ at ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ

 

সারাবিশ্বের সমালোচনার তীর যখন বিদ্ধ করছে তখন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি সব রকম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংসতার নিন্দা জানালেন। রাখাইনে সহিংসতায় যারা দুর্ভোগে পড়েছেন তাদের সবার প্রতি প্রকাশ করেছেন গভীর সহানুভূতি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাখাইনে নির্যাতনের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। সহিংসতার একটি টেকসই সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বক্তব্যে সুচি মিথ্যাচার করেছেন। তিনি বাস্তবতা এড়িয়ে গেছেন।

অং সান সুচি বলেছেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন একটি কমিশনের নেতৃত্ব দিতে। রাখাইনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধানে এই কমিটি সাহায্য করবে মিয়ানমারকে। সুচি আরো বলেছেন, যেসব রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চান তাদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা (রিফিউজি স্ট্যাটাস) যাচাই করতে প্রস্তুত মিয়ানমার। কিন্তু তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনস’ নিয়ে কোনোই মন্তব্য করেননি। এমন কী রোহিঙ্গা শব্দটি মুখে উচ্চারণও করেননি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণে তিনি ভীত নন।

তিনি বলেছেন, ৫ই সেপ্টেম্বরের পরে আর কোনো সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়নি। আর কোনো ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ও চালানো হয়নি। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতন শুরুর পর সারাবিশ্ব অং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে সহিংসতা থামাতে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের নিন্দা জানাতে। সর্বশেষ জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টানিও গুতেরাঁ তাকে সতর্ক করে দেন। তিনি জানিয়ে দেন সুচির জন্য শেষ সুযোগ। তিনি যদি এই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করেন তাহলে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। এরপর প্রথমবার মুখ খুললেন অং সান সুচি। তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন মঙ্গলবার মিয়ানমারের সময় সকালে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে সোমবার। ভৌগোলিক কারণে তখন মিয়ানমারে মঙ্গলবার। তিনি তাই এ সময়টাকেই তিনি বেছে নিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সুচি বলেছেন, জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি সক্ষম হননি। তাই বিশ্ববাসীকে তিনি জানাতে চান, রাখাইনের পরিস্থিতিতে তার সরকার কী করছে। ওই ভাষণে তিনি বলেছেন, রাখাইনের বেশির ভাগ মুসলিম রাজ্য ছেড়ে পালায়নি। রাজ্যের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ওদিকে তিনি তার বক্তব্যে দৃশ্যত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে কতজনকে ফেরত নেবেন তা নিশ্চিত নয় এবং ফেরত নিলেও তাদের দৃশ্যত নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। কারণ, তিনি তাদের শরণার্থী হিসেবে মর্যাদা যাচাই করে দেখতে প্রস্তুতির কথা বলেছেন। অর্থাৎ ফেরত নিলেও রোহিঙ্গাদের নেয়া হতে পারে শরণার্থী হিসেবে।

সুচি বক্তব্যে জানিয়ে দিয়েছেন (রাখাইন) রাজ্যজুড়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। (সহিংসতার) দায় খণ্ডিতভাবে কারো ওপর দেয়ার কোনো ইচ্ছা নেই মিয়ানমার সরকারের। একই সঙ্গে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো বাসনা নেই। রয়টার্স, অনলাইন সিএনএন, বিবিসি, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস-এর খবর। এতে বলা হয়, জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেও একটিবারের জন্য রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেননি সুচি। এ শব্দটি ব্যাপক অর্থে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।

গত ২৫শে আগস্ট রাখাইনে পুলিশ ও সেনাদের অবস্থানে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায় বলে কর্তৃপক্ষ বলছে। এরপর সেনারা রোহিঙ্গাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন শুরু করে। তার ফলে চার লাখ ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে জাতিসংঘ জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সুচি এ অভিযোগেরও কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি বলেছেন, আমরা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুনছি। সবার কথা শুনতে হবে আমাদের। আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে, এসব অভিযোগ নিরেট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। তারপরই আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্থিতিশীলতা, সাম্প্রদাকি সম্প্রতি ও আইনের শাসনকে খর্ব করার বিষয়টি দেখা হবে কঠোরভাবে আইনের আওতায়। জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরো বলেন, সহিংসতার শিকার হয়েছেন যেসব মানুষ তাদের সবার প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা প্রকাশ করি। ওদিকে রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার সুযোগ দেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যেসব মানুষ বাড়িছাড়া হয়েছেন তাদেরকে নিরাপদে বাড়ি ফেরায় সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নিরাপত্তার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে। কিন্তু তাদের অভিযানের বিষয়ে কোনোই মন্তব্য করেননি সুচি।

তিনি বলেছেন, সীমান্ত অতিক্রম করে বিপুল সংখ্যক মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে- এটা শুনে আমরা উদ্বিগ্ন। কেন তারা দেশ ছাড়ছে তার কারণ অনুসন্ধান করতে চাই আমরা।

এ সম্পর্কিত আরও