Mountain View

হল রিভিউ : শহীদ সার্জেন্ট জহুুরুল হক হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭ at ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

প্রিন্স আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ।  বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমসের পাঠকদের জন্য আমাদের এবারের আয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  আবাসিক হলগুলো নিয়ে। ধারাবাহিকভাবে আমরা সবগুলো হল ও হলে থাকা শিক্ষার্থীদের জীবন যাপন ও লাইফস্টাইল তুলে ধরার চেষ্টা করব। আজকে থাকছে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল এর বর্ণনা-

আমরা হাতির যে দু’টি দাঁত দেখি, ও দু’টি তার শোভা, যে দাঁত দিয়ে হাতি চিবিয়ে খায়, সেগুলো দেখা যায় না। সেগুলো থাকে চোয়ালের ভেতরে লুকানো।” লেখাটা অদ্ভুতভাবে শুরু করলেও লেখার শেষ অবধি পড়তে পারা গেলে এর মর্মার্থ কিছুটা হলেও বুঝতে পারার কথা। তাই এখনি ব্যাখ্যা করার দরকার পড়ে না।

এক রাজ্যের স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হতে আসি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই শহরে এসে মনে হলো পুরো শহরটা অপরিচিত। কাউকে চিনি না, জানি না। রাতে পিঠ গুজার মতো এমন কোন আত্মীয়ও এ শহরের বুকে নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেয়া প্রিয় জহু হলে ওঠে পড়লাম। আশেপাশের ইট-সিমেন্ট-পাথরের উঁচু-নিচু ইমারত গুলো দেখতে দেখতে আর গাড়ির বিকট শব্দ শুনতে শুনতে আমিও কেমন জানি যান্ত্রিক হয়ে পড়ছিলাম। এ নিষ্ঠুর শহরে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম।এলোমেলো গাছপালা, বিশাল পুকুর, খেলাধুলার মাঠ, বাতাসে ঘাসফুল দোলা, হলের এক কোণে জাদুঘর, নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলী এবং সন্ধায় আড্ডার পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ইত্যাদি এসবের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয় । হলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যগুলো প্রতি সন্ধার পর প্রকৃতির সাথে ঘুমিয়ে পড়ে আবার ভোরে জেগে উঠে। এ যেন ঢাকার বুকে একখন্ড গ্রাম।

কিন্তু বিধি বাম! মানুষ হিসেবে সবারই খেয়ে-ধেয়ে বাঁচতে হয়। আমরাও এর ব্যতিক্রম নয়। সারাদিন ক্লাস করা, প্রেজেন্টেশন তৈরির জন্য খাটুনি করে রাত জাগা, ভালবাসার টানে মধুর ক্যান্টিনে যাওয়া এবং ল্যাবে প্রাকটিক্যালের জন্য পারীক্ষ খোঁজাখুঁজি করা এসবের পর একজন ছাত্র যখন ক্লান্ত মনে হল ক্যান্টিনে খাবার খেতে যায়, অগত্যা তাঁকে পিছনে ফেরত আসতে হয়। খাবারের মান নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। গত বছর ছাত্ররা ক্ষেপে ক্যান্টিনে তালা ঝুলিয়েছিল। এবছরও ১ম বর্ষের ছাত্ররা নাকি তাদের কে বুঝিয়েছে। এভাবে প্রতি বছর তাদের কে বুঝানো হয় কিন্তু খাবারের মান কোনোভাবে উন্নতি হচ্ছে না। ক্যান্টিন থেকে ছোট ছোট দোকান গুলোতে খাবারের রেট একটু বেশি হলেও ছাত্ররা ওইসব দোকানের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।

শুধু ক্যান্টিনের খাবার নয়, হলের টয়লেট গুলোর অবস্থাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বাইরে থেকে কোন মানুষ যদি টিনশেডের ওয়াশরুমে আসে তবে ছিঃছিঃ করে চলে যায়। ওয়াশরুম রিডিং রুমের পাশে হবার কারণে অনেক সময় দুর্গন্ধে পড়া যায় না। রিডিং রুমে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ। বেসিন গুলো মধ্য যুগীয়। এসব চেঞ্জ করার নাম গন্ধও নেই। এসবের প্রতিকার চেয়ে গত বছর টিনশেডের কয়েকজন বড় ভাই গণসাক্ষরিত(যারা স্বেচ্ছায় করেছে) একটি অভিযোগনামা সে সময়ের প্রভোস্ট মহোদয়ের নিকট দাখিল করেন। তিনি প্রতিনিধিদল কে আশ্বস্ত করার বদলে এমন একটি অভিযোগ এনেছেন যেটি এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। অথচ এ টিনশেডের ছাত্ররাই সব থেকে বেশি সংগ্রামী। এঁদের থেকে ক্যাডার হয়, সার্জেন্ট হয়, ব্যাংক অফিসার হয় আবার এরা হল নেতৃত্বও দেয়। বর্তমানে হলের ছাত্রলীগের সংগ্রামী সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক দু’জনেই টিনশেডের সোনালী অর্জন।

খেলার মাঠ থাকলেও প্রায় দুই মাস ধরে সেটিও খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিচর্যাহীনতার অভাবে ঘাস অর্ধহাঁটু অবধি লম্বা হয়েছে। পুকুরপাড়ের ল্যাম্পপোস্ট গুলো যদি সন্ধায় জ্বলজ্বল করত তবে আরেকটা মিনি হাতিরঝিল জহু হলের বুকে উদয় হতো। আমরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমাদের সৌন্দর্য গুলো নষ্ট করে ফেলছি। আমরা সুন্দর এবং সৌন্দর্যের পূজারি কেন হতে পারি না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো আবাসিক হল আছে, তম্মধ্যে সব থেকে বেশি উপেক্ষিত ‘হল’ হলো ‘জহু হল’। অথচ এ হলের ঐতিহ্য আর অর্জন কোনটাই খাটো করে দেখা অবকাশ নেই। ১৯৭১ সালের দুসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে যে লাল-সবুজের রক্তখচিত পতাকা উড্ডীন করা হয়, তার নকশা এ হল থেকে করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ‘ স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ ‘ কে কেন্দ্র করেই মূলত অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময় থেকে এই হলটি স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সদর দপ্তর বিশেষ। তাই পাক বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট এর অন্যতম লক্ষ্যস্থল ছিল এ হলটি। তোফায়েল আহমদের মতো প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিও এ হলের সোনালী অর্জন। এতগুলো অর্জন জহুরুল হক হলের নামের পাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। অথচ খাবারের মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে এখন ভাবতে হয়।

আমাদের বর্তমান হল প্রভোস্ট স্যার যদি একবার খাবার আর ওয়াশরুমের দিকে সুদৃষ্টি দেন তবে সব সমস্যার সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করি আমরা। আমরা দারুণ আশাবাদী। কেননা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে একজন ছাত্র বান্ধব ভিসি আর জহুরুল হক হল পেয়েছে একজন ছাত্র বান্ধব প্রভোস্ট।

পরিশেষে, জহু হল হলো একটা পরিবার। যেখানে আমরা একেক জন একেক জায়গার, একেক জন একেক রংয়ের । কিন্তু এখানে শত নদী শত ধারায় প্রবাহিত হয়ে এসে মিশে গেছে একটি মোহনায়, যেন পরিবারের মতই আরেকটি পরিবার। প্রিয় জহু হল পরিবার; ভালবাসি অনেক ।

এ সম্পর্কিত আরও

no posts found
Mountain View