Mountain View

অনলাইনে আসক্তি : কুফল ও ভয়াবহতা নিয়ে একটি তাত্ত্বিক গবেষণা

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৩, ২০১৭ at ১:৩২ অপরাহ্ণ

‘আসক্তি’ তা সে যে বিষয়েই হোক না কেন পরবর্তীতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশু-কিশোর, নারী পুরুষ সবারই কোন না কোন শখ থাকে। কোন বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত শখ আস্তে আস্তে আসক্তিতে পরিণত করে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর থেকে যুবা পর্যন্ত সব থেকে বেশি যে আসক্তিটা দেখা দিচ্ছে সেটা হলো অনলাইন আসক্তি। অনলাইন বা ইন্টারনেট আমাদের জীবনযাপনেরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে এর ব্যবহার যেমন অনেক সহজলভ্য হয়েছে আবার বেড়েছে এর ব্যবহার গতিও। ডিজিটাল এ সময়ে ব্রড ব্যান্ড সংযোগ চালু হওয়ায় এটির প্রশস্ততা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ব্রড ব্যান্ড সংযোগ হওয়ায় আনলিমিটেডভাবে ব্যবহার করা যায় ইন্টারনেট। বাসা-বাড়িতে এই সুযোগ থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তাই আজকের শিশু-কিশোরদের বেড়ে উঠার মাঝে অনেকটা অপূর্ণতা দেখা যায়। তারা বাস্তবিক জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এর প্রভাবে তাঁদের চলাফেলায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

আবার অনেকেই বন্ধুদের আড্ডায় বা কোথাও কোন রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে সেখানেও ইন্টারনেটে প্রবেশ করছে। এভাবে প্রবেশ করা কোন দোষের কিছু না। কিন্তু এভাবে অবচেতন মনে করতে থাকলে একটা সময় এটা আসক্তিতে পরিণত হয়ে যাবে। এর ফলে তাঁদের স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠতে পারে অস্বাভাবিক। কেননা অনলাইন আসক্তির পেছনে অবসাদ, অ্যাংজাইটি, সোস্যাল প্রবলেম, বন্ধুবান্ধবদের অনুকরণ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব অনেক সময় কাজ করে।

মনোবিদরা বলছেন অন্য কথা তাঁদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে এই আসক্তিটা কাজ করে দলছুট হয়ে পড়ার ভয় থেকে। কোনো আপডেট মিস করে ফেললো কিনা সেই ভয় থেকেই মূলত আসে অনলাইনের উপর নির্ভরশীলতা। আর সেটাই একসময় হয়ে পড়ছে আসক্তি। কিন্তু এই আসক্তি থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? একটু সচেতন হলেই সেটা সম্ভব। সে জন্য শুধু নিজেকে একটু বাড়তি সময় দিতে হবে। সেটা হতে পারে বই পড়া বা শখের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখা। তাই বলে একটা আসক্তি থেকে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য আসক্তিতে যাতে জড়িয়ে না পড়ি সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। অনেকে অনলাইন আসক্তি থেকে বাঁচতে মোবাইলে গেইম খেলে। এটি বেশি দেখা যাই শিশু-কিশোরদের মাঝে। এর জন্য তাঁদের অভিভাবকরাই বেশি দায়ী। তারা তাঁদের সন্তানদের কে একটা আসক্তি থেকে বাঁচাতে আরেকটা আসক্তি প্রতি আসক্ত করে তুলছেন।

Image result for facebook addiction

সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, মানুষ গড়ে ৫ ঘন্টা কম্পিউটার আর ২ ঘন্টা মোবাইলের পেছনে সময় ব্যয় করেন। একটানা দীর্ঘসময় মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে একদিকে চোখের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে মানসিক বিভিন্ন সমস্যা। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি কতটা খারাপ সংবাদ সেটি সাদা কাগজে না বললেও বুঝার কথা।

আবার অনেকে অনলাইনের সহজলভ্যতার কারণে জড়িয়ে পড়ছে প্রেমের সম্পর্কে। অনলাইনে একবার প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে তা হতে ফেরত আসা মুশকিল হয়ে পড়ে। যা এক সময় আসক্তিতে পরিণত হয়।  বৃটেনের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আন্ড্রেয়াস ভোসলার ও নাওমি মোলার এই গবেষণার জন্য নিজেই বা তার সঙ্গী ইন্টারনেটে প্রতারণার শিকার হয়েছেন এমন ভুক্তভোগীদের নিয়োগ করেন। অংশগ্রহণকারীদের একজন বলেন, “আমি এসব বন্ধ করার চেষ্টা করেছি, তবে পারিনি।

বন্ধ করার কিছু দিনের মধ্যেই পুনরায় শুরু করতে হয়। আর দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রযুক্তি পণ্যের কারণে এসব অত্যন্ত সহজ, আশ্চর্যজনকভাবে স্বস্তিদায়ক এবং আকর্ষণীয়।” ভোসলার আরো বলেন, “ইন্টারনেট প্রতারণা নারী এবং পুরুষের চোখে ভিন্ন। তবে এটি শুধু লিঙ্গভেদ নয়, ইন্টারনেট প্রতারণার অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকম।” [দ্য সুইসাইডাল ম্যাগাজিন ]
ইন্টারনেটে প্রতারিত হওয়া বাস্তব জীবনে খপ্পরের হাতে পড়ার মত বেদনাদায়ক। প্রতারিত হয়ে অনেকে হতাশায় ভোগে। আর এই হতাশা দূর করার জন্য ঢুকে পড়ে ভিন্ন এক জগতে। পরবর্তীতে ওই জগত হতে ফিরে আসতে পারে না। এভাবে অপরাধ জগতের সাথে যুগসন্ধি গড়ে উঠে। বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ের কারণটা হলো নতুন প্রজন্মকে ঘিরে।

যেদিকে হাওয়া, সেদিকে পাল তুলে। তাই তারাও সমানে পাল্লা দিয়ে ঘোড়ার দৌড়ে ছুটছে। পিছিয়ে নেই অনলাইন আসক্তিতে । বাংলাদেশ সরকারের প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের কারণে এর দ্বার সকলের জন্য উম্মোচিত হয়। ফলে শিশু-কিশোরদের একটি ‘গিন্নিপিগ প্রজন্ম’ জন্ম নিচ্ছে যারা অতিমাত্রায় ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর হয়তো কিছু ভাল দিক থাকতে পারে। যেমন, ই-বুকের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। কিন্তু ভালো যতটুকু হচ্ছে তার চেয়ে খারাপ হচ্ছে বেশি। তবে আশংকার বিষয় হলো, এদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় তথ্যপূর্ণ ওয়েবসাইট বাদ দিয়ে পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে।

সম্প্রতি বৃটিশ এমপিদের উদ্যোগে করা এক জরিপে দেখা যায়, ব্রিটেনে ১৬ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৪ জন এবং ১০ বছর বয়সী প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন নিয়মিত পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইট দেখছে। ফলাফলে আরো দেখা যায়, আসক্তির সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থার সংযোগও লক্ষ্য করা গেছে। ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির প্রতি সবথেকে বেশি আসক্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা।

উপরোক্ত ব্রিটেনের অবস্থানের স্থান কাল পাত্র একটু ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশেও এর চিত্র প্রায় একই ধরণের। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে আশংকাজনকভাবে তা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের থেকে শুরু করে বখাটেদের হাতে থাকা মোবাইল ফোনে। ফলশ্রুতিতে এর কুফল পড়ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার উপর। যৌন নির্যাতন, নিপিড়ন, ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে হর হামেশায়। সুতরাং, এইসব পর্নোগ্রাফির সাইটগুলো বন্ধ করা না গেলে এর কুফল ভোগ করতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও।

অন্যদিকে অনলাইন আসক্তির কুপ্রভাবে শিশুদের কল্পনাশক্তি, চিন্তা শক্তিও কমে যাচ্ছে। নগরে খেলার মাঠ, বেড়ানোর নিরাপদ জায়গার অভাবও একটি কারণ। শিশুদেরকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় এমন খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখা গেলে, প্রযুক্তি ও অনলাইনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সেই সাথে অভিভাবক কে তাঁদের সন্তানদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তা না হলে সন্তানদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

প্রিন্স আল মামুন, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও

no posts found
Mountain View