Mountain View

গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলীঃ পরপারে ভালো থাকবেন স্যার

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৭, ২০১৭ at ১০:০০ অপরাহ্ণ

চাণক্য শ্লোকে রয়েছে, ” শিক্ষককে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। সৃষ্টি ও ধ্বংস দু’য়েরই বীজ লুকিয়ে রয়েছে শিক্ষকের মধ্যে।” একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পদার্পণ করার মাধ্যমে শুরু হয় নতুন জীবন।সে জীবনের সাথে যুক্ত হয় অনেক নতুন মুখ।শুরু হয় নতুন করে পথ চলা।আর এই নতুন পথচলার দিশারী আমাদের শিক্ষকগণ।শিক্ষকরা হন শিক্ষার্থীদের প্রেরণার ক্ষেত্র।তাই শিক্ষক মাত্রই ছাত্র-ছাত্রীর কাছে সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র।

সার্বিক অর্থে একজন শিক্ষক একটি সমাজের বাতিঘর। যে সমাজে যত গুণী শিক্ষকের আবির্ভাব, সে সমাজে তত বেশি অগ্রসরমান। অনেকে অত্যুক্তি করে শিক্ষককে ঈশ্বরের পরবর্তী স্থানে রাখতে কৃপণতাবোধ করেন না। কেননা ঈশ্বর চেনার মহান কাজ যে এ শিক্ষক দ্বারা আরম্ভ হয়। চাণক্য শ্লোকে ‘সৃষ্টি’ ও ‘ধ্বংসের’ কথা স্বরণ করা হয়েছে, এই সৃষ্টি বা ছাত্রকে গড়ে তোলার অসামান্য দক্ষতা দেখেছি আমাদের প্রিয় নূর হোসেন বিএসসি স্যারের মাঝে। সবাই ‘বিএসসি’ স্যার বলে ডাকাডাকিতে একটা সময় স্যারের প্রকৃত নামটাই ঢাকা পড়ে যায়।

পেশা হিসেবে স্যার একজন শিক্ষক হলেও সারা দিন ছাত্রদের নিয়ে পড়ে থাকায় ছিল স্যারের নেশা। এ নেশায় হয়তো স্যার কে এতদিন স্বরণীয় করে রেখেছে। একজন ভাল শিক্ষকের যেসব গুণাবলী থাকা বাঞ্চনীয় তার সবটাই বর্তমান ছিল স্যারের মধ্যে। আমি সৌভাগ্যবান এ কারণে যে, আমার শিক্ষাজীবনে বেশ কিছু ভাল শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করতে পেরেছি। সকল শিক্ষকের প্রতি আমি সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল। আলাদা করে একজন শিক্ষককে বাছাই করা আসলেই কঠিন।

তবে আমার জীবনে যে সকল শিক্ষকের আদর্শ ও শিক্ষা গভীরভাবে ছাপ ফেলেছে; তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন এই ‘বিএসসি’ স্যার। স্যার আমাদের গণিত পড়াতেন। তবে একটু-আধটু বাংলা সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল। গণিতের শিক্ষকের কথা ভাবতেই অনেকের মাথায় যে রাগী ও বেত হাতে দাঁড়ানো একজন শিক্ষকের চিত্র ভেসে ওঠে স্যার কিন্তু মোটেও এ রকম ছিলেন না। গণিতের শিক্ষক হিসেবে স্যার আসলেই তুলনাহীন।

গণিতের মত কঠিন বিষয়, যা অনেকের কাছে আতঙ্কের; এমন একটা বিষয় স্যার আমাদেরকে এতো সহজ, সাবলিল এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে এমনভাবে পড়িয়েছেন সকল ছাত্রই তার কাছে চিরকাল ঋণী হয়ে থাকবে। প্রাইভেট পড়ার সময়কার টা আমার আজও বিস্মৃতি নয় যখন স্যার বলতেন, ” অমুক পৃষ্ঠার তমুক অংক টা খুলে করার চেষ্টা কর।” স্যার পারছি না বলতেই মুখের উপর একটা ভেটকি মেরে বলত, ” এমন পানির মত সহজ অংক টা করতে পারতেছিস না।” হয়তো এক দশকের অধিক সময় ধরে গণিতের শিক্ষক ছিলেন বলে এত সহজে অংক বুঝিয়ে দিতে পারতেন। আজকাল প্রাইভেট, কোচিং এর যুগে স্যারের এসব নিয়ে ন্যূনতম মাথাব্যথাও ছিল না।

কখনও কোন ছাত্রকে প্রাইভেট পড়ার জন্য অন্যায়ভাবে চাপ প্রয়োগ করতেন না। মাদ্রাসার প্রতিটি কালচারাল অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্যার ছিলেন নিবেদিত পুরুষ। খেলাধুলার প্রতি স্যারের দূর্বলতা কাজ করত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্যার হয় আম্পায়ার হিসেবে কাজ করতেন, না হয় স্যারকে পাশ থেকে ম্যাচ রেফারির ভূমিকায় দেখা যেত। স্যার যে কোন পরিস্থিতিতে সবাই কে মাতিয়ে রাখার অপরিসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মিয়েছেন। স্যার খুবই সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। অতি সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছেদ পড়তেন। বিলাসিতার কোন ছাপ স্যারের জীবনে দেখিনি।

তিনি সমাজের অসমতা নিয়ে সচেতন ছিলেন; বস্তুবাদ ও ভোগবাদের জীবনযাপন থেকে নিজেকে দুরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিগত দুই বছর স্যারের কোনো খোঁজ খবর পাইনি। হটাৎ শুনলাম স্যারের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এ উপসর্গ প্রায় দেড় বছরের মত ছিল। আস্তে আস্তে বাঁচার আশা যখন ক্ষীণ হয়ে আসছিল, তখনি শুনলাম স্যারের মৃত্যুর সংবাদ। স্যার ৯ই অক্টোবর এ চির সবুজ ধরণীর মায়া ছিন্ন করে চির গন্তব্যে পাড়ি জমান।

প্রথমে স্যারের মৃত্যুর খবরটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মত মনে হয়ে ছিল; পরে মেনে নিয়েছি। যাওয়া আসার প্রকৃতির এ অমোঘ নিয়ম তো আর অস্বীকার করা যায় না। এত বড় দুঃসংবাদ আর স্যার কে হারিয়ে যে বেদনা ও শুণ্যতার মধ্যে পড়েছি, সেই অবস্থায় ভালভাবে কিছু গুছিয়ে লেখা প্রায় অসম্ভব । তবু স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করেছি। স্যার আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন ওই প্রদীপ শিখার মত যা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসার আগেই তার চারপাশের অসংখ্য প্রদীপ শিখাকে আলো বিতরণ করে আলোকিত করেছেন।

এ সম্পর্কিত আরও

no posts found
Mountain View