Mountain View

“সিলেট নগরী আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে টিলাগড় “

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৯, ২০১৭ at ৮:২৩ অপরাহ্ণ

মুফিজুর রহমান নাহিদ জেলা প্রতিনিধি সিলেটঃ সিলেট নগরীর টিলাগড় এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।কারণ বিগত একমাসের ব্যবধানে এই টিলাগড়ে নিভে গেছে দু’টি জীবন প্রদীপ। এর আগেও বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে টিলাগড়কে। কিন্তু তারপরও শান্ত হচ্ছে না এলাকাটি। টিলাগড়ে সিলেট এমসি কলেজ, সিলেট সরকারী কলেজের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ থাকার পরও এখানে নেই কোন সিসিক্যামেরা। তাই এখানে অপরাধ সংঘটন কারীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকাতে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপনকৃত সিসি ক্যামেরার সুফল নগরবাসী পাচ্ছেন। অনেকের মতে টিলাগড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসিক্যামেরা লাগানো হলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। শতবছরের ঐতিহ্যরে স্মারক এমসি কলেজ হোস্টেলে আগুন, ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যেই অস্ত্রের ঝনঝনানি, হোস্টেলের জায়গা দখল করে ক্লাবঘর নির্মাণ, গ্রপিং কোন্দল, নিজেদের মধ্যে মারামারি- সবকিছুতেই জড়িয়ে রয়েছে ছাত্রলীগের নাম। গ্রুপিং প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র আর রামদা নিয়ে মহড়া এসবই টিলাগড়ে হয়ে গেছে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এখানে কথায় কথায় চলে দোকানপাট ভাংচুর, রেস্টুরেন্টে হামলা, সড়ক অবরোধের মতো নৈরাজ্যকর ঘটনা। এরকম ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষকে মামলা পর্যন্ত করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও কান্ত হননি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা যেনো ক্রমশ আরোও অস্থির হয়ে ওঠছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় টিলাগড়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সোমবার নিভলো আরোও এক মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন প্রদীপ। সে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলো। আর তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে নিজের সংগঠনেরই নেতাকর্মীদের হাতে। কিন্তু এসব ঘটনায় জড়িত আসল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। তারা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমসি কলেজ হোস্টেল, মহিলা হোস্টেল, এমসি কলেজের অধ্যক্ষের বাংলো, এমসি কলেজ ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক, টিলাগড় পয়েন্ট এসব এলাকার কোথায় নেই সিসি ক্যামেরা।

তাই চিহ্নিত করা যাচ্ছেনা মূল অপরাধীদের। আর অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে চাননা। তারা প্রকাশ্যে সবকিছু দেখলেও মুখ বুঁজে সহ্য করে যান। এমনকি অনেক দোকানদার বা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী হামলা-ভাংচুরের শিকার হওয়ার পর তাকে হাসিমুখে বলতে দেখা গেছে ‘কিছুই হয়নি’- এমন অভিযোগ কলেজ ছাত্রদলের একাধিক নেতার। তাদের দাবি টিলাগড়কে এক আতঙ্কের নাম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এখানকার ছাত্রলীগের গ্রুপিং।

এমসি কলেজ হোস্টেল, মহিলা হোস্টেলে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্র-ছাত্রী বলেন, আজ যদি ক্যাম্পাস ও হোস্টেল এলাকাতে সিসি ক্যামেরা থাকতো তবে বিগত দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া বড় বড় ঘটনার পিছনে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো। পাশাপাশি এ রোডে ছিনতাইকারীদেরও নিয়ন্ত্রণ করা যেতো। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী এবার উন্নত প্রযুক্তির আরও ৭০টি সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে সিলেট নগরীতে। আগের ২২টির পাশাপাশি নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার জন্য সিলেট সিটি করপোরেশনকে (সিসিক) অনুরোধ করেছে সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। নগরীর ৯২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের ফলে পুরো নিয়ন্ত্রণে আসছে নগরী।

এর ফলে সিসি ক্যামরায় আওতায় আসছে পুরো সিলেট মহানগরী। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এসব সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন সিসিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, নাইওরপুল, আম্বরখানা ও তালতলায় সিসিক ২২টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। সেগুলো স্থাপনের পর ওইসব এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ নানান ধরনের অপরাধ কমে আসে। এমনকি অপরাধীদের চিহ্নিত করতেও এসব সিসি ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখন নগরীর দক্ষিণ সুরমা, আম্বরখানা বিমানবন্দর সড়ক ও সিলেট জজ আদালত এলাকায় মোট ৭০টি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য এসএমপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

এর মধ্যে দক্ষিণ সুরমায় ২২টি, আম্বরখানা বিমানবন্দর সড়ক এলাকায় ২২টি এবং সিলেট জজ আদালত এলাকায় আরও ২৬টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিসিক। দক্ষিণ সুরমায় ২২টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের টেন্ডারও হয়ে গেছে। কিন্তু এই তালিকাতে টিলাগড় এলাকা নেই। সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা বলেন, ‘নগরীর নিরাপত্তা জোরদারে আরও ৭০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন স্বল্প সময়ের মধ্যে এগুলো লাগানোর আশ্বাস দিয়েছেন আমাদের। এর আগেও তারা নগরীতে ২২টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেন।

ওই ২২টি ক্যামেরার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এসএমপি’র কোতোয়ালী থানাকে। তারা ওই ক্যামেরাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।’ প্রসঙ্গত, টিলাগড় এলাকার অপরাধ চিত্রগুলোর মধ্যে যদি শুধু খুনের কথা বলি তবে ছাত্রলীগের ‘গ্রুপিং’ দ্বন্দ্বে সোমবার প্রাণ হারানো হিরন মাহমুদ নিপু গ্রুপের কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদসহ গত ৭ বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন বিরোধের জের ধরে নিহহ হয়েছেন ৮ জন। এরমধ্যে শুধুমাত্র টিলাগড় কেন্দ্রিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ৩টি।

সর্বশেষ গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে শিবগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতা জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমের উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের অপর একটি পক্ষ। উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে আহত মাসুম সেদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। এরআগে ২০১০ সালের ১২ জুলাই নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। এই খুনেরও কারণ ছিল ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীন কোন্দল।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View