Mountain View

ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের শিকার উত্তরা গণভবন, নেপথ্যে গাছ আর মাছ!

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ২০, ২০১৭ at ১১:৩৮ অপরাহ্ণ

নাটোরের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে শত বছরের ইতিহাসের স্মারক উত্তরা গণভবন। সপ্তাহব্যপী এই ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে তৈরী হওয়া বিতর্ক-আলোচনা-সমালোচনা যেন থামছেই না। শতবর্ষী গাছ কাটার ঘটনায় প্রশাসনের সাথে সরকারী দপ্তরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ হবার পর এবার স্থানীয় রাজনীতির সাথে প্রশাসনের তৈরী হয়েছে বৈরীতা। জেলা প্রশাসন, সরকারী দফতর ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ত্রিমুখি দ্বন্দ্বের বিতর্কে এখন প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় বাসভবন নাটোরের উত্তরা গণভবন। তদন্ত কমিটি কাজ শুরুর আগেই গণপূর্ত বিভাগের চার কর্মকর্তার নামে মামলার সিদ্ধান্তও সমালোচিত হচ্ছে জেলাজুড়ে।

‘ল্যান্ড অব কুইন’ খ্যাত নাটোরের সাধারণ জনগন এই দ্বন্দ্বকে দেখছেন অন্যভাবে। গণভবনকে ঘিরে শহরজুড়ে এখন চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, সর্বসাধারণের জন্য ঐতিহাসিক এ স্থাপনা উন্মুক্ত করে দেওয়াই কাল হল গণভবনের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দেশের যেখানেই হোক না কেন তা উন্মুক্ত করে মূলত এর আবেদনকেই কমানো হয়েছে। কারো মতে, গণভবনের শতবর্ষী বৃক্ষই এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ। কারো মতে, জেলা প্রশাসন গণভবনের কর্তৃত্ব গণপূর্ত বিভাগ থেকে নিজ আয়ত্ত্বে নেয়ার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন উঠেছে গণভবনে গণপুর্ত বিভাগের কর্মচারীদের আবাসন প্রশ্নে এতদিন জেলা প্রশাসন নীরব থাকলেও এখন কেন গাছ কাটার ঘটনাতেই ওই কর্মচারীদের জড়িত থাকার বিষয়টি তোলা হচ্ছে।

এই উত্তরা গণভবনের চারপাশের লেকের ধারে শতবছরের অন্তত ৩০০ প্রজাতির আমগাছ আছে। এছাড়া মেহগনি, নারিকেল, কাঠ বাদামসহ আরো পাঁচ শতাধিক গাছ রয়েছে। আবার অনেকের ধারণা, গণভবনের মত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার কর্তৃত্ব জেলা প্রশাসনের আয়ত্বে থাকলে বিভিন্ন সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তোলা বির্তকের অবসান হবে। কেউ ভাবছেন, গণভবনের শতবর্ষী গাছ ও দীঘির (গণভবনের ভিতরের চারিদিকের লেক) মাছকে টার্গেট করে এগোচ্ছিলেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। আর গাছ কাটার ঘটনা একটা টেস্ট কেস ছিলো তাদের জন্য।

 

গত কয়েকদিনের সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, কয়েক দশক ধরে দূর্লভ বৃক্ষরাজী ও সুবিশাল দিঘীর মাছের রক্ষণাবেক্ষণ ও চাষ করে আসছে গণপূর্ত বিভাগ। তাদের নিয়োজিত তত্বাবধায়করা মূলত গণভবনে সর্বসাধারণের প্রবেশ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। সাথে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে আনসার ও পুলিশ। কয়েক দশক ধরে গণভবনের ভেতরেই অবস্থান করছে তত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মীরা। এতোদিন বিতর্ক না থাকলেও সম্প্রতি গাছ কাটার ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে এ নিয়ে। বাদ যায়নি জেলা প্রশাসনের নীরব ভূমিকা বিষয়টিও। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানাযায়,গণভবনের ভিতরের লেকে ২০০৫ সাল থেকে আর কোন ইজারা প্রদান করেনি গণপুর্ত বিভাগ। ওই বছরের পর থেকে মংস্য বিভাগ মৌসুমে কিছু দেশী মাছের পোনা ছেড়েছেন। ওই মাছের হদিস জানা নেই কারো। এদিকে গাছ কাটার ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পর নড়েচড়ে বসা প্রশাসন চাপের মুখে গঠন করেন তদন্ত কমিটি। গত ১৭ই অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে গণভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় স্থানীয় সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুলের তোপের মুখে পড়েন জেলা প্রশাসন, গণপূর্ত বিভাগ ও বন বিভাগের কর্তারা। সভায় তিনি গাছ কাটার সাথে জড়িতদের বের করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসককে।

সেদিন গণভবন ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় গাছ কাটার ঘটনায় অভিযুক্ত গণভবনের দুই তত্বাবধায়ক আবুল কাশেম ও আব্দুস সবুর তালুকদারকে। তারা গণভবন ছাড়ার তিনদিনের মাথায় আবার গণভবনে ফিরে আসায় অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে স্থানীয় সাংসদ শফিকুল ইসলাম শিমুলের দিকে। অভিযোগ উঠে, সাংসদ শিমুলের হস্তক্ষেপে ৭ দিনের জন্য তারা গণভবনে ফিরে আসে। বলা হচ্ছে, বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে সময় দিতে মানবিক কারনে তাদের গণভবনে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তত্বাবধায়ক আবুল কাশেম জানান, ভবন ছাড়ার জন্য বুধবার তিনি তার দাপ্তরিক নির্দেশ পত্র পাওয়ার পর পরই ভবন খালি করতে থাকেন। বৃহস্পতিবার রাতের মধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ তার নিজস্ব মালামাল সরিয়ে নিয়েছেন। জেলা প্রশাসন বা গণপুর্ত বিভাগের নির্দেশ পাওয়ার পর মৌখিকভাবে সময় বৃদ্ধির আবেদন করলেও বুধবার থেকে তিনি বা তার পরিবারের কেউ গ্রান্ড মাদার হাউজ ভবনে ছিলেন না। বিষয়টি স্বীকারও করেন সাংসদের প্রিয়ভাজন জেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক দীলিপ কুমার দাস। তিনি জানান, মানবিক কারনেই তাদেরকে অন্তত ৭টা দিন তাদের গণভবনে রাখার জন্য জেলা প্রশাসককে বলা হয়। কিন্তু তারা কেউ থাকেননি। অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করে মিথ্যাচার করা হয়েছে।

 

তবে সাংসদ শিমুলের এ পদক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন মনে করছে, গাছ কাটার সাথে জড়িত থাকার পরও একজন এমপির এহেন তৎপরতা দুঃখজনক। এদিকে গণভবনের গাছ কাটার ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবীতে সোচ্চার একাত্তর পরিষদ। পরিষদের সভাপতি কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার জানান, উত্তরা গণভবন একটি সংরক্ষিত এলাকা। তাই সেখানে কী ঘটছে তা মানুষ সহজে জানতে পারে না।

এই অবৈধ গাছ কাটা চলছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি সবে। এই অপকর্মের দায়ভার বেশ কয়েকটি বিভাগ এবং ব্যক্তির। তাদের মধ্যে আছে গণপূর্ত বিভাগ, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন, ঠিকাদার, এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তিনি অভিযোগ করে বলেন ,অমূল্য গাছগুলো কাটার সাথে জড়িত রাঘব বোয়ালদের বাচানোর চেষ্টা করছে জেলা প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুয়ীদ ও কলেজ শিক্ষক সাজেদুর রহমান সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,এখন গণভবনের তত্বাবধায়ক কাসেমসহ আরো তিন চুনোপুঁটির নামে মামলা দিয়ে ঘটনার মূল হোতা রাঘব বোয়ালরা নিজেদের পরিষ্কার দেখাতে চাইছেন। এই ঘটনার যদি বিচার না হয় তবে, নাটোরের ইতিহাসে তা কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। তারা জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন উত্তরা গণভবন রক্ষায় উপযুক্ত পদক্ষেপের দাবী করেন। এদিকে গঠিত তদন্ত টিম তাদের তদন্ত কাজ শুরু করেছে। বৈরি আবহাওয়া সত্বেও শুক্রবার সকাল থেকে তদন্ত দল উত্তরা গণভবনে কর্মরত আনসার সদস্য,নিরাপত্তা রক্ষী, মালি ও গণপুর্ত বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেন। তদন্ত দলের সদস্য এনডিসি অনিন্দ্য মন্ডল তদন্ত কাজ শুরুর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সংসদ সসদ্য শফিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, গণভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক কে না জানিয়ে এই গাছ কাটায় গণপুর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীও জড়িত রয়েছেন বলে প্রমান হয়। তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে গণভবনের কেয়ার টেকার আবুল কাশেম দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর ধরে গণভবনের গ্রান্ড মাদার হাউসে বসবাস করে আসছেন। সেখান থেকে নিজস্ব মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য মানবিক কারনে কয়েকদিন সময় দিতে বলা হয়েছিল। বিষয়টি অন্যভাবে নেয়ার কিছুই ছিলনা। শুনেছি দাপ্তরিক নির্দেশ পাওয়ার পরই বৃহস্পতিবারের মধ্যে তারা গ্রান্ড মাদার হাউস ছেড়ে চলে গেছেন। অথচ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই ভবনে তাদের রাখার বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন জানান,তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার সাথে সাথে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম শুরু করা হবে। তদন্তে যার নাম উঠে আসবে তার বিরুদ্ধেই মামলা হবে। সে যেই হোক না কেন। কারো সাথে দ্বন্দ্ব বা বিভাজনের প্রশ্নই ওঠেনা। জেলা প্রশাসক হিসেবে যতদিন নাটোরে থাকতে পারবেন ,ততদিন উত্তরা গণভবন রক্ষায় নিষ্ঠার সাথে কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

এ সম্পর্কিত আরও

Mountain View