Mountain View

লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা: নারীদের চার দেয়ালের বাইরের গল্প

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ২৩, ২০১৭ at ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

আাফরিন জাহান:: বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমস

চারজন নারী; যারা খুব সাহসী, স্বাধীনচেতা এবং ভালোভাবে বাঁচতে চাওয়ার আকুতি যাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। তাদের জীবনের কাহিনী নিয়েই এগিয়েছে ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা’ ছবির গল্প। এই চারজন নারী চান সমাজের বন্ধ দরজাগুলো খুলে ফেলে নিজের মর্জিতে চলতে কিন্তু আসলেই কি তারা এই লড়াইয়ে জিততে পেরেছেন। কখনও মনে হয় জিতেছেন, আবার কখনও মনে হবে পুরুষতান্ত্রিকতার কাছে হার মেনেছেন তারা। পুরো ছবিটি দেখে আমার কাছে তাই মনে হয়েছে, তবে অন্য সবার যে এমন ধারণা হবে তা নয়। প্রতিটি মানুষই হয়তো তাদের মতো করে বিশ্লেষণ করবেন এবং সে অধিকারও তাদের রয়েছে।

তবে সর্বোপরি বলতে হবে এ ছবির পরিচালক অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তব-এর সাহস আছে কারন তিনি দেখিয়েছেন ৫৫ বছর বয়সী এক বিধবা মহিলারও যৌন ইচ্ছা জাগতে পারে এবং তিনি কারও সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে যেতে আগ্রহীও হতে পারেন।

ভারতের এক ছোট্ট শহরে বসবাস করা চার নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছবির কাহিনী। এই চারজনের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেগুলো নিয়েই মূলত গল্প এগিয়ে যায়। এরা সকলেই নিজেদের জীবনে বাঁধা পড়ে গেছেন, কিন্তু মনের ইচ্ছেগুলো মরেনি। ছোট ছোট ঘটনা আর কাজের মধ্য দিয়ে এই চার নারী বেশ সাহসী হয়ে উঠেছেন, কিছুটা বিদ্রোহও করেছেন। ভোপাল শহরের পটভূমিতে এই ছবির গল্পকে চিত্রায়িত করা হয়েছে।

রেহানা (প্লাবিতা বড়ঠাকর) প্রতিদিন একটু একটু করে স্বপ্ন দেখেন গায়িকা মাইলি সাইরাস হওয়ার। তবে তার স্বপ্ন এক-আধটু আশার আলো দেখলেও, তা আবার স্তিমিত হয়ে যায়। স্বপ্নের এই লুকোচুরি অনেকটা বোরখার আড়ালে চলে যাওয়া তার মুখের লুকোচুরির মতো। যে মুখ বোরখা থেকে বেরিয়ে দুচোখে শুষে নেয় গোটা দুনিয়া, আর তার পরক্ষণেই চলে যায় আড়ালে। অতি রক্ষণশীল বাবার মেয়ে রেহানা তাই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নাইট ক্লাবে যায়। সেখানে সে ‘হার্ড ড্রিংক’ করে এবং ভালো লাগা তৈরি হয় এক ছেলের সাথে। যদিও শেষ পর্যন্ত তার বিপদে ছেলেটি তাকে না চেনার ভান করে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে শিরিন (কঙ্কনা সেন শর্মা) নিজের হাজব্যান্ডকে নিয়ে ভীষণভাবে অখুশি। কারণ তার হাজব্যান্ডের কাছে সে কেবল একটা যৌনসুখের মাংসল বস্তু, এ ছাড়া আর কিছুই নয়। সে চায় তার স্ত্রী থাকবে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী। কাজ বলতে সাংসারিক ফরমায়েশ খাটা আর রাতে যৌন সুখের বস্তু হওয়া সেটা স্ত্রীর ইচ্ছে হোক বা না হোক। পতি ভাবেন সে তো নারী তার আবার স্বাধীনতার প্রয়োজন কি? কিন্তু শিরিনও কিছু করে দেখিয়েছেন, তিনি একটি কোম্পানির বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে সেরা বিক্রয়কর্মীর স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। এই অর্জনের কথাও সে হাজব্যান্ডকে বলতে গিয়ে বলতে পারেনি। এই চিত্র আমাদের সমাজেও আছে। আমার পরিচিত একজন যিনি নিজের সঞ্চয়ের পুরো টাকা দিয়ে মেয়েকে বেসরকারি মেডিকেলে পড়িয়েছেন ডাক্তার বানানোর আশায়। ইন্টার্নি শেষে মেয়ের যখন বিয়ে হলো তখন তার হাজব্যান্ড ঘোষণা দিলেন ‘আমার সংসারে এলে চাকরি করা যাবে না’। যদিও এটা ছিল তাদের ভালোবাসার পরিণয়। আমি সেই মেয়ের বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার মেয়ে না ওই ছেলেকে পছন্দ করে বিয়ে করেছে? তাহলে সেই ছেলেটা যে এমন, এটা আপনার মেয়ে বুঝতে পারেনি কিংবা আপনার মেয়ে এসব মেনে নিল? আপনার স্বপ্নকে মিথ্যে করে দিলো? এই অধিকার কি তার আছে?’ আমার এত সব প্রশ্নের একটাই উত্তর পেলাম মেয়েটির বাবার কাছে আর তা হলো বুক ভাঙা দীর্ঘ্শ্বাস। চোখের কোনায় জমে যাওয়া জলও হয়তো তাকে আজ উপহাস করছে। বললেন, ‘আমার মেয়ে তো এটা মেনে নিয়েছে। সে তো চায় না প্রাকটিস করতে।’ আবারও ফিরে আসি শিরিনের কাছে। তার হাজব্যান্ড কিন্তু স্ত্রীকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দী রেখে দিব্যি প্রেম করে বেড়াচ্ছেন এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে। রেস্টুরেন্টের মতো খোলা জায়গায় কোলে বসিয়ে তাকে আদরে লেপ্টে দিচ্ছেন! তাহলে একই পুরুষের দু’জন নারীর প্রতি দু’ধরনের মানসিকতা থাকবে কেন? কিংবা সেই নারীই বা অন্যের হাজব্যান্ডকে স্ত্রী থাকা অবস্থায় নিজের করে চাইছেন কেন? এর উত্তর বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে শিরিন নিজেই দিয়েছেন হাজব্যান্ডের সাথে পরকীয়ায় আসক্ত সেই নারীকে।

নিজের যাবতীয় মুক্তি ভাবনা নিয়ে বাঁচেন ৫৫ বছরের উষা পরমার (রত্না পাঠক শাহ)। কমবয়সী সুইমিং ট্রেইনারকে ভালো লেগে যায় তার। পাকা চুলে কলপ লাগিয়ে সুইমস্যুট পরে সে তরুণ ট্রেইনারের হাতে ভর করে উদ্দাম পানিতে ডানা ঝাপটায়। কিন্তু সেও কি পেরেছে নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে? বরং তিরষ্কৃত হয়েছে নিজ পরিবারের কাছে। যে বাড়ির মালিক তিনি সেখান থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অসম এই সম্পর্কের কারণে। এখানে উষা পারেমারের চরিত্রে রত্না পাঠক শাহ যে বোল্ড অভিনয় করেছেন, তা তার নিন্দুকেরাও স্বীকার করবেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে চরিত্রের ভিতরে ঢুকে এর রস আস্বাদন করতে হয়। আমাদের দেশে এই বয়সী কোনো নারী যদি সুইমস্যুট পরে এমন অভিনয় করতেন তাহলে হয়তো তাকে এর অপরাধে দেশ থেকে বিতাড়িত করার আন্দোলন হতো। কয়েকদিন আগে যেমন একটি ম্যাগাজিনে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী দিলারা জামানের ইয়াং লুক দেখে আমার ফেসবুকে যুক্ত কয়েকজন তারকা অভিনেতা নাক সিটকে বলেছেন, এটা করা নাকি দিলারা জামানের উচিত হয়নি। বয়স হলে কি মানুষকে ভীমরতিতে পায় ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, পারলে এই মুভি দেখেন আর নিচু মানসিকতাকে উন্নত করেন।

লীলা (অহনা কুমার) নামের আরেক চরিত্রও ডানা মেলতে চায় নিজের বহু দমিয়ে রাখা কামনা-বাসনার দুনিয়ায়। তবে তা সবই এসে আটকে যায়। তাই তো নিজের বাগদত্তাকে উপেক্ষা করে ঘর বাঁধতে চায় ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে। কিন্তু যাকে বিশ্বাস করেছে, শরীরের ভাগ দিয়েছে, সে কি চায় লীলার সঙ্গে সংসার বাঁধতে নাকি এটিই তার নেশা যে নিত্য নতুন মেয়েদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াবে?

এই ৪ চরিত্রের লড়াই নিয়েই চলচ্চিত্রটি এগিয়ে গেছে।

তবে দিন শেষে এ কথাই সত্যি যে, তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত পুরুষেরা কখনও তাদের ধারণ করেননি, বরং ব্যবহার করে গেছে দিনের পর দিন। আর বয়সের ফারাক গলে তারা দাঁড়িয়েছেন একই সমান্তরালে। এটা শুধু একটি সিনেমা নয় বরং আমাদের সমাজের কোনো কোনো দিকের সত্যিকারের চিত্র যা পাল্টায়নি এক বিন্দুও।

শুরুতে ভারতের সেন্সর বোর্ড ছবিটিকে মুক্তি দিতে চায়নি, কিন্তু দীর্ঘ ছয় মাস আইনি লড়াইয়ের পর ছবিটি মুক্তি পায়। ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছর জুলাই মাসে মুক্তি পায় এই হিন্দি ছবিটি। এরই মধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে এবং জিতে নিয়েছে বেশ কিছু পুরষ্কার ছবিটি।

(প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বিডি টোয়েন্টিফোর টাইমস লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।)

এ সম্পর্কিত আরও

no posts found
Mountain View