Mountain View

শোকের ছায়া টেলি-দুনিয়ায়! ‘রীতাদি’-র স্মৃতিচারণায় তারকারা!

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২০, ২০১৭ at ১০:১১ অপরাহ্ণ

বাংলা টেলিজগতে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীর অনুপ্রেরণা ছিলেন প্রয়াত রীতা কয়রাল। সৌরভ, মধুমিতা, অভিজিৎ, রিজওয়ান, রাজ আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন তাঁদের কিছু স্মৃতি।

Abhijeet, Sourav, Madhumita, Rezwan and Raj
বাঁদিক থেকে অভিজিৎ ভট্টাচার্য, সৌরভ চক্রবর্তী, মধুমিতা চক্রবর্তী, রিজওয়ান রব্বানি শেখ ও রাজ ভট্টচার্য। ছবি: ফেসবুক পেজ থেকে

সাম্প্রতিক সময়ের টেলি-তারকাদের কাছে তিনি ছিলেন একজন আইডল। তাঁর অভিনয়ক্ষমতা, তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল এই প্রজন্মের তারকাদের অনুপ্রেরণা। টেলিভিশনে তাঁর শেষ কাজ ‘রাখিবন্ধন’ এবং ‘স্ত্রী’।

অভিনেতা অভিজিৎ ভট্টাচার্য ‘স্ত্রী’ ধারাবাহিকেই প্রয়াত অভিনেত্রীর সঙ্গে প্রথম শ্যুটিং করেন। এবেলা ওয়েবসাইটকে জানালেন— ‘‘শি ওয়াজ আ ভেরি ন্যাচারাল অ্যাকট্রেস। খুব এফর্টলেসলি অভিনয় করতেন। আমরা সবাই জানতাম যে ক্যানসার হয়েছে। কিন্তু ওঁকে দেখে কখনও বোঝাই যেত না বাইরে থেকে। সব সময় খুব সুন্দর হাসিখুশি থাকতেন। আমি ভাবতেই পারছি না… দু’সপ্তাহ আগেও সিন করেছি ওঁর সঙ্গে— আমি, নেহা মানে নিরুপমা আর রীতাদি। তখনই বলেছিলেন যে আমার শরীরটা একটু খারাপ… এই সিরিয়াল থেকেই তো ওঁকে চেনা, ওঁর সঙ্গে আলাপ। তার আগে তো ওঁর অভিনয় দেখেছি। শি ওয়াজ ভেরি হেল্পফুল। আর ওঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল কখনও ওভারডু করতেন না। টিভি সিরিয়াল মানেই যে মেলোড্রামা নয়, সেটা ওঁর থেকে শেখার ছিল। আরও অনেক কিছু শিখেছি ওঁর থেকে। উনি এমন একজন অভিনেত্রী, যাঁকে আমরা অনেকেই লুক আপ টু করতাম। আজ সকালে খবরটা পেয়ে খুব আপসেট লাগছে।’’

প্রায় তিন দশকের অভিনয় জীবন তাঁর। টেলিভিশনের অসংখ্য ধারাবাহিকে অগণিত চরিত্রে দর্শক তাঁকে দেখেছেন। ২০১১ সালে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র ছিল সানন্দা টিভি-র ‘সবিনয় নিবেদন’ ধারাবাহিকে। ওই ধারাবাহিকেই প্রথম নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌরভ চক্রবর্তী এবং ওইটিই ছিল মধুমিতা চক্রবর্তীর টেলিভিশন ডেবিউ। ‘‘রীতাদির সঙ্গে আমার দেখা ‘সবিনয় নিবেদন’ করার সময়। খুব মিষ্টি একটা সম্পর্ক ছিল ওঁর সঙ্গে। উনি বাড়ি থেকে নানা রকম খাবার আনতেন, আমাদের খাওয়াতেন। ভীষণ ভাল রান্না করতেন উনি। এমনকী সেটেও রাঁধতেন,’’ বললেন মধুমিতা, ‘‘ওখানে বেশ অনেকগুলো কিচেনের সিন থাকত। রীতাদি বলতেন, আমাকে একটু সময় দাও। আর উনি মন দিয়ে রান্না করতেন। মনিটর হচ্ছে, এসপি হচ্ছে… উনি তার মধ্যে পার্টটাও করছেন আবার রান্নাও করছেন। আর রান্না শেষ হয়ে গেলে উনি নিজে সার্ভ করে খাওয়াতেন আমাদের। আর কী অসাধারণ রান্না…! আর একটা জিনিস নোটিস করতাম। উনি তো প্রচুর কাজ করতেন। আমি দেখতাম ব্যস্ত হয়ে আসছেন হয়তো অন্য একটা শ্যুটিং থেকে। তার পরে জাস্ট ৫ মিনিট থেকে ১০ মিনিট সময় নিতেন। তার মধ্যেই একেবারে নিজেকে এই ধারাবাহিকের চরিত্রটার জন্য বদলে নিতেন। আর কী অসম্ভব মেমরি ছিল ওঁর। খুব বেশি পার্সোনাল রিলেশন আমাদের কোনওদিনই ছিল না। কিন্তু আমি ওঁকে খুব অবজার্ভ করতাম, ভাল লাগত, কম কথাবার্তার মধ্যেও একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। অদ্ভুত ভাবে ‘সবিনয় নিবেদন’ শেষ হওয়ার পরে রীতাদির সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। সম্প্রতি ‘দাসানি’-তে দেখা হয়েছিল কারণ ওখানেই ‘রাখিবন্ধন’ ও ‘কুসুমদোলা’-র শ্যুটিং হয়। আমাকে দেখেই বললেন কেমন আছিস। সেই ২০১১ থেকে ২০১৭… রীতাদিকে একটুও আলাদা লাগেনি। একই রকম রয়ে গিয়েছেন। ওঁর চলে যাওয়ার খবরটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না!’’

সৌরভ চক্রবর্তীর মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ‘সবিনয় নিবেদন’ ধারাবাহিকে। সৌরভ জানালেন, ‘‘আমার মানতেই অসুবিধা লাগছে। দুম করে ফেসবুক খুলে দেখছি এরকম একটা খবর… খুবই খারাপ লাগছে। ‘সবিনয় নিবেদন’ আমার প্রথম বড় কাজ। ওখানে আমি তখন টেলিভিশন অভিনয়ের স্ট্রাকচারটা শিখছি। আমি তো খুব অসহায় বোধ করতাম প্রথমদিকে। আর ওঁকে একটু রাগী রাগী মনে হতো। ওই রকমই একটা সময় একদিন মেকআপ রুমে বললেন— এই শোনো, তুমি ভাল অ্যাক্টিং করো— ওটা আমার কাছে একটা বড় প্রাপ্তি ছিল ওই সময়ে। কিন্তু ওঁর মধ্যে যেটা সবচেয়ে ভাল লাগত সেটা হল উনি প্রচণ্ড স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। খারাপ লাগলে বলে দিতেন। এটা খুব কম পাওয়া যায়। আর বাড়তি আবেগ দেখানো একদম পছন্দ করতেন না। অদ্ভুতভাবে আমার নিজের মা-ও সেই রকম। কাজ করতে গিয়ে যখন ধারাবাহিকে ওঁকে মা বলতাম, আমার একটুও আড়ষ্ট লাগত না। আমার প্রযোজনা সংস্থা ‘ট্রিকস্টার’-এর কোনও প্রজেক্টে ওঁর সঙ্গে কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল। এই নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। সেই সুযোগটা আর পেলাম না। ওঁর চলে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রির বিগেস্ট লস। কোনও রকম ম্যানারিজম ছাড়া এমন নিপাট অভিনয় খুব কমই দেখা যায়।’’

টেলিজগতে এমন বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন যাঁরা হয়তো চেয়েছেন কিন্তু রীতা কয়রালের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাননি। আবার অনেকেই একবারই সুযোগ পেয়েছিলেন কাজ করার। রিজওয়ান রব্বানি শেখ ছিলেন ‘ষোলোআনা’ ধারাবাহিকের নায়ক। সেখানেই রীতা কয়রালের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয় রিজওয়ানের— ‘‘রীতাদির সঙ্গে সিন শুনে খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। তখন উনি তো খুবই রিনাউনড অভিনেত্রী আর আমাকে অনেকেই খুব ভয় দেখিয়েছিল। আর খুব সিরিয়াস একটা সিন ছিল। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখলাম শি ওয়াজ ভেরি নর্মাল,’’ স্মৃতিচারণা করলেন রিজওয়ান, ‘‘ফ্লোরে শি ওয়াজ ভেরি হাম্বল। আমার ভয় কেটে গেল, হয়তো ইচ্ছে করেই লোকে ভয় দেখিয়েছিল। অত্যন্ত ভার্সেটাইল অ্যাকট্রেস ছিলেন তিনি। স্ক্রিন প্রেজেন্স অসাধারণ। যে কোনও সিনেই উনি থাকতেন, অডিয়েন্সের ফোকাস ওঁর উপর গিয়ে পড়ত। এক কথায় ‘গিফ্টেড’। এত পাওয়ারফুল অ্যাকট্রেস… বিগ লস ফর ইন্ডাস্ট্রি। কেউই চিরদিন থাকেন না কিন্তু ইটস আ শক ফর মেনি অফ আস।’’

টেলি-কেরিয়ারে প্রথম ধারাবাহিকেই রীতা কয়রালের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল রাজ ভট্টাচার্যের— ‘‘জি বাংলার ‘সুখ’ ধারাবাহিকে রীতাদির সঙ্গে কাজ। রীতাদি তখন মধ্যগগনে। খুব নার্ভাস ছিলাম। কারণ প্রথম সিনটাই ছিল অদ্ভুত। একটা সিডিউসিং সিন। রীতাদির ছেলের বন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম আমি। ছেলের বন্ধুকে সিডিউস করছে চরিত্রটি, এরকম একটা দৃশ্য ছিল… আমি তো অসম্ভব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু রীতাদি খুব কো-অপারেট করেছিলেন। খুব ভাল হয়েছিল সিনটা। যে কোনও চলে যাওয়া মানে তো একটা লস। আমি ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’’   এবেলা।

এ সম্পর্কিত আরও