Mountain View

কবি অসীম সাহার সাথে বর্তমান সাহিত্য নিয়ে কথোপকথন

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ২৪, ২০১৭ at ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

কবি অসীম সাহা

(ষাটের দশকের অন্যতম কবি অসীম সাহার সাথে বর্তমান সাহিত্য নিয়ে রকিব রুবাইয়্যত রহমানের কথোপকথন)

রুবাইয়্যাতঃ  বর্তমান সময়ে অনেক ভালো ভালো লেখকের বই থাকার পরও আমরা কেন শুধু মুষ্ঠিমেয় কিছু লেখকের বই বা লেখায় সীমাবদ্ধ থাকছি?

কবিঃ এই জন্য তুমি পাঠকে দায়ী করতে পার না। এটা একটা নেশা।এই ধরো ইয়াবা। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী লোক আমাদের সমাজের মাঝে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তো এই যে ইয়াবার মত নেশা, এটাকে প্রটেক্ট করার জন্য তোমাদের ই এগিয়ে আসতে হবে।
আমি তোমাকে বলি, যারা সিনিয়র কবি সাহিত্যিক তারা করবে না। কারণ তারা রাষ্ট্রের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। অতএব তারা তোমাদের সাথে আসবে না। তোমাদেরকে উদ্যোগ নিয়েই সব করতে হবে। জনে জনে বোঝানো, সেমিনার করা, ট্রেনিং করা, বক্তব্য দেওয়া এই ধরনের কাজগুলো তোমাদের ই করতে হবে।
কেন আমরা সিরিয়াস লেখা বা আকর্ষণীয় লেখা না পড়ে শুধু স্বস্তা লেখা পড়ে সময় নষ্ট করছি। তোমাদেরকেই পাঠকদের কাছে পৌছাতে হবে।
এই যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো, এগুলোত মূলত কী হয় আমাকে বলতো?
ব্যক্তিগত বিরোধ, ক্ষোভ, গালাগালি, অশ্লীলতা কি হয় এগুলো ছাড়া। গভীরভাবে উপলব্ধি করলে দেখা যাবে এখানে ইতরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।

রুবাইয়্যাতঃ  যেখানে সামনাসামনি কোন কথা বলতে গেলে একটু চিন্তা করতে হয়। সেখানে এই যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে যে যারা মত যা ইচ্ছে তাই বলে ফেলছে।

কবিঃ যা মনে আসছে তাই লিখছে। ফলে হচ্ছে কী! এই যোগাযোগের মাধ্যমকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।
তোমরা একটা গ্রুপ গঠন করতে পার।যারা যে কোন অবস্থাতেই গঠনমূলক আলোচনা করবে।আর ফেইসবুকটা তো অনেক বড় মাধ্যম। এর মাধ্যমেই গঠনমূলক আলোচনা তোমরা করতে পার।ধর, তুমি একটি স্ট্যাটাস দিলে। এবং তোমার স্ট্যাটাসের স্বপক্ষে আর ৫০জন স্ট্যটাস দিলে এর একটা ইমপেক্ট পরতে বাধ্য।

রুবাইয়্যাতঃ বাইরের দেশগুলোতে বই নিয়ে যেই গ্রুপ বা পেইজগুলো আছে। সেখানে যেটা দেখা যায়। রিভিউ বা বই নিয়ে কোন পোস্টে, তাদের কমেন্টসগুলো এমন যে, আমি কোন বই নিয়ে যতটুকু বললাম। তার সাথে তারা নতুন কিছু যুক্ত করছে। বা আমি হয়তো কোন বিষয় বাদ দিয়েছি। অন্য কেউ তা গঠনমূলক কমেন্ট করে জানাচ্ছে।
আর আমাদের দেশে, এই ধরুন আমি একটা বই পড়লাম লেখক “কাজী সাইফুল ইসলাম” এর “বায়ান্নর একুশ”এবং আমি একটা রিভিউ লিখলাম। আমাদের পাঠকদের কমেন্টগুলো থাকে এ রকম… ভালো হয়েছে, সুন্দর হয়েছে, বইট পড়া দরকার…

কবিঃ এটার কারণ কী জানো? যারা এগুলো লিখছে তারা গ্রুপে থাকার জন্য লিখছে।তাদের এইগুলি বুঝার ক্ষমতাও নেই। আর বুঝিয়ে বলার মতো বুদ্ধি ও নেই।

রুবাইয়্যাতঃ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে যে পাবলিক লেকচার এবং সেমিনারগুলো হয়। তার মধ্যে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম ও রিডিং ক্লাবের নাম উঠে আসে। আর বর্তমান সময়ে নবীন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদ” এদের আয়োজনগুলো খুব সাজানো গুছানো হলেও খুব বেশি একটা পার্টিসিপেন্ট থাকে না বা অাশা ব্যঞ্জক নয়…

কবিঃ এমন তো হবেই।আমি যখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ছিলাম। আমি ফাল্গুনী পড়েছি, নিহাররঞ্জন পড়েছি, শীর্ষেন্দু পড়েছি, শরৎচন্দ্র পড়েছি। আমি কিন্তু কোন দিন সেবা প্রকাশনীর কোন বই পড়ি নি।গল্প দু’একটা পড়েছি।
এই ধরো ভূত নিয়ে লেখা বা পেত্নী নিয়ে লেখা। আমি বলি ভূতা বা পেত্নী নিয়ে লেখা কোন বই কেনা হবে না। একটি ভূতের বইও আমি বই মেলায় উৎসাহিত করবো না। একটি ভূতের বই ও আমি স্টলে রাখতে দিবো না। এই ভূত কেন থাকবে! এই ভূত বাচ্চাদের জন্য ভূয়া একটা ইমপেক্ট ফেলে। তুমি যদি বিজ্ঞান মনস্ক হও। তাহলে তুমি ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করবে কেন! অনেকেই আছে বলে ভূত আছে। আমি তো এই দেখেছি ওই দেখেছি ইত্যাদি…

রুবাইয়্যাতঃ  তাহলে বই পড়ার ক্ষেত্রে বাচ্চাদের শুরুতেই আমরা নেগেটিভ এবং ভূয়া বিষয় পড়তে শেখাচ্ছি।

কবিঃ ডেফিনেটলি। তাকে আমরা একটা অজানা রহস্যময় ভীতির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছি। আমাকে বল ভূতের বই কেন পড়বে! কেননা, এটা তো ভূয়া বানানো। এই জায়গাটায় একটা পেইজ খুলা দরকার।আর যারা এই জাগাটায় থাকবে। তাদেরকে তোমাকে বুঝেই নিতে হবে। যে কেউ চাইলেই তাকে নিয়ে নেওয়া যাবেন না। আমাকে অনেকেই অনেক গ্রুপে যুক্ত করে আমি পরিষ্কার লিখে দেই আমি গ্রুপে থাকবো না।

রুবাইয়্যাতঃ  বর্তমান সময়ে বই নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটি বা গ্রুপ আছে। যারা বই নিয়ে তাদের স্বার্থটুকুর কথাই বলছে, রিভিউ, বিক্ষিপ্ত কিছু পোস্ট, আর আবেগের বসে কিছু কাজ করছে। যখন যার কাছ থেকে পারছে বা যাকে ব্যবহার করা যাচ্ছে তাকে দিয়েই সময় পার করছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তারা কিন্তু সাহিত্যটাকে ধারন করছে না। লাইক, কমেন্টস বা শুভকামনা বা পাশে থেকে হাতে তালি দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সাহিত্যের ব্যানার নিয়ে সরব থাকলেও বর্তমান সময়ে সাহিত্য নিয়ে ঠিক যেভাবে ফাইটটা দেওয়া দরকার। এরা কিন্তু সেভাবে ফাইটটা দিচ্ছে না বলেই আমার কাছে মনে হয়।

কবিঃ এই জাতীয় লোক থেকেই তোমাকে কিছু বাছাই করতে হবে।

রুবাইয়্যাতঃ  যারা আছে তারা সংখ্যায় খুবি কম। আমি তো একেবারেই নতুন। আর আমি তো কোন লেখক বা প্রকাশক কেউ ই না…

কবিঃ এই ধরো বিন্দু থেকেই কিন্তু সিন্দু হয়। ধরো প্রথমে ১০ জন পেলে, পরে ২০জন পেলে। আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ যে, তিনি একা একাই কিন্তু শুরু করেছিলেন। আজকে তার বিশাল জায়গা। তারও অনেক সীমাবদ্ধতা বা লিমিটেশনস আছে।

রুবাইয়্যাতঃ  আবার আমরা যখন বিভিন্ন আয়োজন করছি বা মুভ করছি। যাকে বা যাদেরকে নিয়ে করেছি। তাদের মধ্যে যেই জিনিসটি বেশি দেখা যায়। তা হলো কাজের সময় না থাকলেও ক্রেডিট নেবার সময় নামটা আগে চায়। কোন আয়োজনের টাইটেল বা শিরোনাম বা আয়োজনের ক্রেডিটটাই নিতে চায়। কখনো মানুষকে মিথ্যে বলেও ক্রেডিট নিতে ব্যস্ত থাকে। কোন আয়োজন শেষ হবার পর এদের বিভিন্ন পোস্ট পরিষ্কার বুঝা যায় এরা শুধু স্বার্থের জন্যেই আসছে এবং যতটা ফ্রিতেই নেওয়া যায়।নতুন লেখক, প্রকাশক, সংগঠন প্রায় অনেকের ই এমন চিত্র। আয়োজন করার পর সামাজিক যোগাযোগোর মাধ্যমগুলোতে ধরা পড়ে। কিন্তু আমরা তো সামগ্রিক চিন্তা করেই আয়োজনগুলো করছি…

কবিঃ এরা লোভি। যদি তুমি সমুদ্রে ১০ জনকে ফেলে দাও। ই ১০ জনই কিন্তু সাতরে উঠতে পারবে না। হয়তো দু’একজন সাতরে উঠতে পারবে। বাকীরা ডুববে। তুমি দেখবে যারা চালাকি করছে তারা ডুববে।
আমি তোমাকে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। ষাট দশকের যেই ১০০ মতো কবি ছিলেন। তাদের মধ্যে তুমি ক’জনকে দেখতে পাও? হাতে গুণা ৪/৫ জনকে। এরাই টিকে আছে। অতএব শিল্প সাহিত্যে এসব চালাকি করে কেউ টিকতে পারবে না।

রুবাইয়্যাতঃ  প্রথমে নতুন যারা আয়োজনে আসে তারা দেখাতে এবং বুঝাতে চেষ্টা করে যে তারা খুব ই ডেডিকেটেড। কিন্তু কোন কাজের প্রিপ্লান, ফাইনালাইজিং এবং ফিনানসিং এর বিষয় যখন সামনে আসে। তখন তারা নানা রকম অযুহাত দেখায়। আবার কেউ কেউ নিজের দাম্ভিকতা বা গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজের পকেটে ভরে আয়োজন করতে চায়।নিজের জানা বা বোঝাটাকেই জাহির করে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতো কিছুর পরো আমরা চেষ্টাটা ধরে রাখছি…

কবিঃ ভালো কাজে এমন বাধা থাকবেই। চেষ্টা ধরে রাখতে হবে। কবি বা সাহিত্যিকরা নিজেরাই একটি সংগঠন। যে নিজেই নিজেকে নিয়ে যেতে পারে না। সে কোন সংগঠনকেই কিছু দিতে পারে না। কুক্ষিগত করার কথা বললে না। এই ধরো, আমরা ৩জন আর শিল্প সাহিত্য জৎগতের আরো ১জন নিয়ে একটি সংগঠন করেছিলাম। তিনি কিন্তু ভালো সংগঠক ছিলেন। কিন্তু একটা সময় দেখা গেল। সে সংগঠন নিয়ে এমন কিছু করছে। যা আমাদের সাথে যায় না। পরে আমরা ৩জন ই সেখান থেকে পদত্যাগ করি।

রুবাইয়্যাতঃ  কখনো দেখা যাচ্ছে যিনি যেই কাজ যেভাবে করে অভ্যস্ত। নিজের প্রয়োজনে কখনো তাল ছেড়ে দিয়ে। এমন কাজ করছে যে, তার সাথে আগের পরের এতো আলোচনার কোন মূল্য ই থাকছে না এবং প্রশ্ন করলে বরং ভিন্ন প্রসঙ্গ টানছে?

কবিঃ ও তো বিশ্বাস ঘাতক!

রুবাইয়্যাতঃ  আমি চাচ্ছিলাম এই কাজটি করার পরো তাদের সাথে রাখতে। ধরে রাখতে চেষ্টা করছিলাম।কিন্তু এরকম হলে কিভাবে কী করবো!?

কবিঃ তোমাকে একটা সাজেশন দেই।এই রকম মানুষদের কখনো সাথে রাখার দরকার নেই।

রুবাইয়্যাতঃ এ রকম সমস্যায় পড়লে আমি পরিচিত সিনিয়দের সাথে কথা বলি ও পরামর্শ নেই।

কবিঃ হ্যাঁ, এই ধরনের লোকজনদের তুমি প্রথমেই চিনে নিবে। যারা লোভী না, তাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটবেই ঘটবে। তাকে  কোন অবস্থাতেই রাখতে পারবে না। এদের কারণেই আমাদের সাহিত্য জগতটা একবারেই কলূষিত হয়ে গেছে। এই জাতীয় লোভী লোকেরা কখনো তোমাকে বুঝবে না। তারা তোমাকে ব্যবহার করবে।

রুবাইয়্যাতঃ দাদা আপনার সাথে যদি মাঝে মাঝে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যেত।

কবিঃ শিওর, অবশ্যই। ফোন দিয়ে আমার অফিসে চলে আসবে।

এ সম্পর্কিত আরও